দ্য ওয়াল ব্যুরো: এক বছর ধরে লড়াই করেছে সর্বশক্তি দিয়ে। অনেক কিছুর সঙ্গে আপস করেছে, অনেক বেশি সাহসের পরিচয় দিয়েছে। গোটা একটা বছর স্কুলেই যাওয়া হয়নি তার। না, কোনও বাধ্যতায় নয়। স্বেচ্ছায়। পৃথিবীর প্রয়োজনে এবং পরবর্তী প্রজন্মকে সুস্থ পরিবেশ দেওয়ার স্বার্থে জলবায়ু রক্ষার আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সুইডিশ কিশোরী গ্রেটা থুনবার্গ। এক বছর ধরে প্রচার ও সচেতনতা চালিয়েছে, বিশ্বজুড়ে আয়োজন করেছে মিছিলের। কথা বলেছে রাষ্ট্রনেতাদের চোখে চোখ রেখে। মনোনীত হয়েছে নোবেল পুরস্কারের জন্যও। সোমবার থেকে ফের স্কুলে যাওয়া শুরু করল গ্রেটা।
১৭ বছরের গ্রেটা নিজেই টুইট করেছে স্কুলব্যাগ পিঠে নিয়ে, সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে একটি হাসিমুখের ছবি। সেই সঙ্গে লিখেছে, "আমার স্কুল না যাওয়ার একটা বছর হয়ে গেল। আবার স্কুলে ফিরছি, খুব ভাল লাগছে।"
https://twitter.com/GretaThunberg/status/1297921014031163392
গত বছর জুন মাসে লাস্ট স্কুলে গেছিল গ্রেটা। তার পর থেকেই বিশ্বের নানা প্রান্তে জলবায়ু সামিটে ডাক পেতে থাকে সে। বক্তব্য রাখে পরিবেশ রক্ষায়। সারা বিশ্বের নানা দেশে যেতে গিয়ে স্কুলের পড়াশোনায় বাধা পড়ে। এমনিতেই সে প্রতি শুক্রবার করে স্কুলে না গিয়ে সুইডিশ পার্লামেন্টের সামনে বসে থেকেই তার আন্দোলন শুরু করেছিল, কিন্তু তখন স্কুলে যাওয়ায় এমন টানা বাধা পড়েনি। গত বছর থেকে তার কাজেও ও চলাচলের পরিধি বাড়ায় স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়।
এ বছরে তার খুব বড় একটা লক্ষ্য ছিল। চিলির রাজধানী সান্তিয়াগোয় রাষ্ট্রপুঞ্জ আয়োজিত কপ২৫ ক্লাইমেট কনফারেন্সে যোগ দেওয়া। এই জন্য আমেরিকাতেই ছিল সে। কিন্তু নানা রকম সমস্যার জন্য এই কনফারেন্স হবে মাদ্রিদে। ফলে তাকে ফের ইউরোপে যেতে হবে জলপথে। কার্বন এমিশন বন্ধ করার দাবিতে পারতপক্ষে প্লেনে চলাফেরা করে না গ্রেটা।
এই পরিস্থিতিতে নিজের দেশে ফিরে স্কুলে যোগ দেওয়াই মনস্থির করে সে।
২০১১ সালে, মাত্র ৮ বছর বয়সে প্রথম জলবায়ু বদলে যাওয়ার কথা অর্থাৎ ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ’-এর কথা জানতে পেরেছিল ছোট্ট গ্রেটা। তার পর থেকেই হতাশায় ডুবে যেতে শুরু করেছিল সে। প্রথমে স্বাভাবিক ভাবেই বোঝা যায়নি, এতটুকু মেয়ের এই অবসাদের কারণ। কিন্তু যত দিন যায়, সমস্যা বাড়তে থাকে। এক সময়ে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিতে থাকে সে।

উদ্বিগ্ন বাবা-মা মেয়েকে নিয়ে যান চিকিৎসকের কাছে। এবং তাঁদের বিস্মিত করে দিয়ে চিকিৎসকেরা জানান, ‘অ্যাস্পারগারস সিনড্রোম’-এ ভুগছে গ্রেটা। কোনও এক নির্দিষ্ট কারণে, সমাজ-পরিবার থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে। তার মনে হচ্ছে, তার চার পাশে যা কিছু হচ্ছে, তা ঠিক নয়। সে খাপ খাওয়াতে পারছে না।
চলে কাউন্সেলিং। দীর্ঘ দিন ধরে। আর সেখানেই উঠে আসে, পৃথিবীর এই মৃত্যুর মুখে এগিয়ে যাওয়ার ঘটনা তাকে তুমুল ব্যথিত করেছে। স্তব্ধ করে দিয়েছে ভেতর থেকে। সবাই সব জানার এবং বোঝার পরেও যে ভাবে পরিবেশের ক্ষতি বাড়িয়ে যাচ্ছে, তা মেনে নিতে পারছে না গ্রেটা। কাউন্সেলিং-এর সময়ে সে স্বীকারও করেছিল, “পৃথিবীকে বাঁচাতে না পারলে আমায় হয়তো মরে যেতে হবে।”
স্বাভাবিক ভাবেই গ্রেটাকে আগলে রাখতেন মা-বাবা। বোঝাতেন অনেক। কিন্তু গ্রেটার প্রশ্ন ছিল একটাই। “আমরা কেন কিছু করতে পারি না।” কিশোরী গ্রেটা ঠিক করে, পার্লামেন্টে গিয়ে রাষ্ট্রনেতাদের জানাবে তার কনসার্নের কথা। অনুরোধ করবে, প্রকৃতি রক্ষার জন্য উদ্যোগী হতে। এক দিন স্কুলে যাওয়ার পথেই সটান চলে যায় পার্লামেন্টে। কিন্তু স্কুলড্রেস পরা, পিঠে ব্যাগ নেওয়া ছোট্ট কিশোরীকে কে ঢুকতে দেবে পার্লামেন্টে!

গ্রেটার ভেতরের অবসাদ তত দিনে জ্বলে উঠেছে প্রতিবাদ হয়ে। দাঁতে দাঁত চেপে সে ঠিক করে নিয়েছে, বেঁচে থাকলে পৃথিবীকে বাঁচানোর দায়-ও নিতে হবে। কেউ না নিলে একাই। সেই শুরু। প্রত্যেক শুক্রবার স্কুল কামাই করে, সুইডেনের পার্লামেন্টের সামনে এসে বসে থাকত গ্রেটা। একা। কিছু দিন পর থেকে সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের নজর কাড়ে সে। নানা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় খবর হয়, স্কুল-পালানো মেয়ের কথা।
সেই শুরু। গ্রেটার অনুপ্রেরণা প্রথম সাড়া ফেলে অস্ট্রেলিয়ায়। গত ডিসেম্বর মাসে কয়েক হাজার ছাত্র-ছাত্রী পরিবেশ রক্ষার মিছিলে যোগ দিয়েছিল সে দেশে। ক্রমে এই আন্দোলনের স্রোত ছড়িয়ে পড়ে বেলজিয়াম, সুইটজারল্যান্ড, জাপান, আমেরিকা, ব্রিটেন ও কানাডায়। আফ্রিকা ও দক্ষিন আমেরিকার খুদে পড়ুয়ারাও গ্রেটার আন্দোলনে সামিল হয়েছে। বাদ নেই ইউরোপের প্রায় ২৭০টি শহরের ৭০ হাজারের বেশি স্কুল পড়ুয়া। প্রতি শুক্রবার করে স্কুল না গিয়ে পথে নামে তারা। তাদের হাতে পোস্টার, যার ট্যাগলাইন #ফ্রাইডে ফর ফিউচার।
/cdn.vox-cdn.com/uploads/chorus_image/image/65261936/GettyImages_1167860285.0.jpg)
পার্লামেন্টের সামনে একা বসে থাকা স্কুলপালানো মেয়ের এই অগ্নিকন্যা হয়ে ওঠার পথকে কুর্নিশ করছে সারা বিশ্ব। নেট-দুনিয়া জুড়ে আজ উপচে পড়ছে প্রশংসা আর বিস্ময়। এক বছর আগেও যা দেখে অনেকের মনে হয়েছিল এ হয়তো কিশোরবেলার চাপল্য, সেটাই যে আজ আমাদের গ্রহটাকে বাঁচানোর সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লড়াই হয়ে উঠবে, তা কে ভেবেছিল!
এ লড়াইয়ের একটা বছর পেরিয়েছে। এবার স্কুলজীবনে ফিরে পড়াশোনার পাট শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে গ্রেটা।