
শেষ আপডেট: 8 September 2019 20:15
জানা যায়, ডাক্তারি পড়তে পড়তেই তিনি নাকি ঈশ্বরের ডাক পেয়েছিলেন। তাই তিনি নিজেকে ঈশ্বরের জন্য নিবেদিত করতে চেয়েছিলেন। চিকিৎসকের পাশাপাশি তাই তিনি নিজেকে গড়ে তোলেন এক জন নান হিসেবেও। যোগ দেন ক্যাথলিক খ্রিস্টান মহিলাদের সংঘে। সেই সংঘই ১৯৬০ সালে তাঁকে দক্ষিণ ভারতে পাঠায় কাজের জন্য, কিন্তু তিনি আটকা পড়েন করাচিতে।
করাচিতে থাকার সময়ে, হঠাৎই এক দিন তিনি পৌঁছে যান তখনকার ম্যাকলয়েড রোডে, কুষ্ঠরোগীদের একটি কলোনিতে। সমাজ থেকে বহিষ্কৃত মানুষগুলিকে রীতিমতো অমানবিক এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বাস করতে দেখেন। ঘরের গা দিয়ে বয়ে গেছে নালা, সেখানে ছুটছে ইঁদুর। কখনও কখনও ইঁদুরে কামড়ে নিয়ে চলে যেত কুষ্ঠরোগীদের আঙুল, সাড় না থাকার কারণে বুঝতেও পারতেন না তাঁরা। এ সব দেখে তীব্র ভাবে বিচলিত হন তিনি। ঠিক করেন, এখানেই থেকে যাবেন তিনি, এই মানুষগুলির সেবা করবেন।
পরে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে রুথ ফাউ জানিয়েছিলেন, ১৯৬০ সালে দেখা কুষ্ঠ রোগীদের সেই কলোনি-ই তাঁকে তাঁর জীবনের সব চেয়ে বড় সিদ্ধান্তটি নিতে সাহায্য করেছিল।
এক বছরের মধ্যেই তাঁর উদ্যোগে এবং ক্যাথলিক সংঘের সহায়তায় করাচিতে প্রতিষ্ঠিত হয় একটি কুষ্ঠ-হাসপাতাল। পাকিস্তানের প্রথম এই কুষ্ঠ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পর থেকেই রোগী এবং রোগীর পরিবারকে নানা রকম সাহায্য করতে শুরু করে তারা। পাকিস্তান ছাড়িয়ে পাশের দেশ আফগানিস্তানেও খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে এই হাসপাতালের।
পাকিস্তানের মতো একটি দেশে ছয়ের দশকে তিনি যে খুব সহজে এই সব কাজ করতে পারেননি, তা বলাই বাহুল্য। কুষ্ঠ রোগকে তখন শুধু রোগ হিসেবেই না, বরং বড় কোনও পাপের শাস্তি হিসেবে দেখা হতো সমাজে। তাদের সাহায্য কিংবা চিকিৎসার জন্য এগিয়ে আসত না কেউ। তাদের ছুড়ে ফেলে দেওয়া হতো সমাজ থেকে।
ডক্টর রুথ প্রথম দিকে সব চেয়ে বেশি যে কাজটি করেছেন, তা হলো ঘরে ঘরে গিয়ে মানুষকে সচেতন করা, বোঝানো।তিনি প্রতিটি রোগীর বাড়িতে গিয়ে, তাদের পরিবারের লোকদের সাথে কথা বলেছেন, বুঝিয়েছেন যে কুষ্ঠ রোগ নিরাময়যোগ্য। ঘরে বন্দি করে রাখা রোগীদের নিয়ে এসেছেন তাঁর হাসপাতালে। ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের সহযোগিতা পেতে শুরু করেন তিনি।
ডক্টর রুথ ফাউয়ের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং চেষ্টার ফলে সরকারও তার দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। ১৯৭১ সালে সরকারের সহায়তায় কুষ্ঠ রোগের প্রকোপ থাকা প্রদেশগুলোতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন কুষ্ঠ চিকিৎসা এবং নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র। বালুচিস্তান, সিন্ধ, উত্তর পাকিস্তান, পাক অধিকৃত কাশ্মীর, এমনকী আফগানিস্তান পর্যন্ত গিয়েছেন তিনি কুষ্ঠরোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য। তিনি ঘরে ঘরে গিয়ে রোগীদের তাঁর হাসপাতালে নিয়ে আসতেন। চিকিৎসার পাশাপাশি খাবার, ভালো থাকার জায়গা এবং শিক্ষার ব্যবস্থাও করতেন।
কুষ্ঠ রোগীদের পাশাপাশি মানবতার জন্যও সারা জীবন কাজ করে গেছেন ডক্টর রুথ। ২০০০ সালে বালুচিস্তানের খরা, ২০০৫ সালে কাশ্মীরের ভূমিকম্প কিংবা ২০১০ সালে পাকিস্তানে ভয়াবহ বন্যা-- প্রতিটি ঘটনাতেই দাঁড়িয়েছেন আক্রান্তদের পাশে। ২০১০ সালের বন্যার পর ৮১ বছর বয়সেও নিজে গিয়ে ঘরহারা মানুষের সাথে দেখা করেছেন ডক্টর রুথ, কথা বলেছেন তাদের সাথে, শুনেছেন তাদের প্রয়োজনের কথা।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজেও নানা রকম অসুখে ভুগতে শুরু করেন রুথ। ২০১৭ সালের ১০ অগাস্ট হাসপাতালে মারা যান তিনি। কিন্তু সারা বিশ্বের সামনে রেখে যান সেবা ও মানবতার এক অনন্য নিদর্শন। তাই তাঁর জন্মদিনে বিশেষ ডুডল বানিয়ে সম্মান জানাচ্ছে গুগলও। সারা পৃথিবীতে পৌঁছে দিচ্ছে তাঁর জীবনের কাহিনি।