
গীতা প্রেস (Gita Press) ২০২৩ শে পা রাখল ১০০ বছরে - দ্য ওয়াল ফাইল ।
শেষ আপডেট: 19 April 2024 14:32
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কার্ল মার্ক্স বিশ্বাস করতেন, ধর্ম আসলে আফিমের মত। আফিম যেভাবে ব্যথা উপশম করে, ধর্মও সেভাবে শোষিত, নিপীড়িত মানুষকে তাদের যন্ত্রণা ভুলিয়ে ভুলিয়ে রাখে, বাস্তব থেকে দূরে রাখে। যে কোনও মাদকদ্রব্যই আদতে ক্ষতিকর, কিন্তু সেসবের চাহিদা কখনও কমে না। ধর্মও যুগ যুগ ধরে মানুষের বিশ্বাস, ভরসা, কষ্টের আশ্রয়। এই পৃথিবীর সবচেয়ে বিক্রীত বইটির নাম 'বাইবেল'। আর এই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে বড় হিন্দুধর্ম বিষয়ক বইপত্রের প্রকাশক, গীতা প্রেস (Gita Press) এই বছর পা রাখল ১০০ বছরে ।
শোনা যাচ্ছে, প্রথমবারের জন্য এই প্রেসের (Gita Press) সদর দফতরে আসতে পারেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
১৯২৩ সালে পথ চলা শুরু গীতা প্রেসের। বহু প্রকাশকের চলার পথে বাধা আসে, ওঠা-পড়া থাকে। গীতা প্রেসের চলার পথ ভারতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে তোলপাড় ফেলা অধ্যায়। দেখেছে খিলাফৎ, আইন অমান্য আন্দোলন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের জন্ম, দেশের স্বাধীনতা, নেহরুর আমল, জরুরি অবস্থা, শিখ অস্থিরতা, বাবরি মসজিদ, গুজরাত দাঙ্গা। কিন্তু পাঠক সমাজে, বিশেষ করে উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ হিন্দিভাষি অঞ্চলে গীতা প্রেসের আবেদন অমলিন। কোভিড-১৯ চলাকালীন প্রকাশনা ব্যবসা চরম ধাক্কা খেয়েছিল। কিন্তু গীত প্রেস ওই সময়েও লাভ করেছে প্রায় ৭৭ কোটি টাকা।
'আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে সনাতন ধর্মের শিক্ষাকে সর্বস্তরের সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়া। যাতে দরিদ্র থেকে বিত্তবান সবাই এই শিক্ষার আলোকে নিজেদের চারিত্রিক গঠন গড়ে তুলতে পারে', এক সর্বভারতীয় পত্রিকাকে বলেছেন গীতা প্রেসের ম্যানেজার লালমণি তিওয়ারি।
উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ গীতা প্রেসের দফতরে তিনবার ঘুরে গিয়েছেন। তবে আদিত্যনাথ একা নয়। আর.এস.এস প্রচারক বেশ কয়েকজন 'হাইপ্রোফাইল' নেতা নিয়মিত আসেন গীতা প্রেসে। অতীতে এসেছেন রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্রপ্রসাদ, মেট্রোম্যান শ্রীধরণ, রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ।
গীতা প্রেসের ঐতিহ্য কেবল একটি দলে সীমাবদ্ধ নয়। সাংবাদিক অক্ষয় মুকুল গীতা প্রেসের প্রসার ও প্রচারের ইতিহাস নিয়ে একটি অনবদ্য গবেষণা করেছেন, যা 'গীতা প্রেস অ্যান্ড দ্য মেকিং অফ হিন্দু ইন্ডিয়া' নামে প্রকাশিত হয়েছে। অক্ষয় দেখিয়েছেন, ভরতেন্দু হরিশচন্দ্রের সময় থেকেই সংস্কৃত-নির্ভর হিন্দি ভাষাকে কেন্দ্র করে গোটা উত্তর ভারত জুড়ে যে সাংস্কৃতিক নবজাগরণ দেখা যায়, তাঁকে সুচারুভাবে নেতৃত্ব দিয়েছিল গীতা প্রেস ও তার কর্ণধারগণ—জয়দয়াল গোয়েঙ্কা ও হনুমানপ্রসাদ পোদ্দার। সুদীর্ঘ এক শতাব্দী ধরে গোটা হিন্দি বলয়ের জনমানসে পৌঁছে গিয়েছে গীতা প্রেস ও তাদের নানা প্রকাশনা। যার মধ্যে সর্বপ্রধান ছিল 'গীতা' ও তুলসীদাসের 'রামচরিতমানস'।

গীতা প্রেসের সাফল্যের মূলমন্ত্র শুধু সনাতন ধর্ম নয়, আর্থিক চিন্তাভাবনাও। 'হনুমান চালিসা', 'রামায়ণ', 'মহাভারত', 'রামচরিতমানস', 'উপনিষদ', 'বেদান্তদর্শন' ইত্যাদি নানা বই রীতিমতো নামমাত্র মূল্যে প্রকাশ করে গীতাপ্রেস। যার ফলে আক্ষরিক অর্থেই ক্রয়ক্ষমতার তলার দিকে থাকা ক্রেতাও নাগাল পান বইয়ের।
গীতা প্রেসের মূলমন্ত্রই হল সনাতন ধর্ম। ফলে প্রযুক্তি ব্যবহারের দিকে আজও বেজায় খুঁতখুঁতে তারা। প্রায় দুই দশকের বেশি সময় ধরে কর্মরত 'প্রোডাকশন ম্যানেজার' আশুতোষ উপাধ্যায় বলেছেন, 'আমরা কেস মার্কার মেশিন ব্যবহার করি না, কারণ ওতে প্রাণীজ নানা দ্রব্য ব্যবহার করা হয়। ওই কাজটা আমাদের কর্মীরা নিজে হাতেই করেন।'
গীতা প্রেসের উঁচুতলায় আজও চূড়ান্তভাবে জাতের হিসেবে পদমর্যাদা ঠিক করা হয় বলে শোনা যায়। আশুতোষ উপাধ্যায় ওই পত্রিকাকে বলেছেন, বোর্ড অফ ট্রাস্টি বা অছিপরিষদের সকলেই মাড়োয়াড়ি। তার বাইরে অন্য জাত থেকে কখনওই এত উঁচুতলায় নিয়োগ দেওয়া হয় না। ম্যানেজমেন্টে দলিত কেউ নেই, তারা শুধুমাত্র মেশিন চালানো, সাফাইকর্মী এইসব কাজেই আছেন।
'আমরা বর্ণব্যবস্থাতেই বিশ্বাস রাখি। এটা গীতায় লেখা আছে। গীতায় যা লেখা আছে সেটাই একমাত্র সত্যি', বলেন তিওয়ারি।
মুদ্রণবিভাগে গেলে যদিও খানিক উল্টো ছবি চোখে পড়ে। সেখানে একেবারে পেল্লায় নানা ঝাঁ চকচকে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির জাপানি, জার্মান বা ইতালীয় যন্ত্রপাতি রয়েছে। গীতা প্রেসের তরফে বিগত ৪ বছরে প্রায় ২৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭০,০০০ বই ছাপায় গীতা প্রেস। প্রায় ১৮,০০০ বই রয়েছে তাদের তালিকায়। যার জন্য প্রতি মাসে লাগে গড়ে ৫০০ টন কাগজ। গীতা প্রেসের (Gita press) ওয়েবসাইট বলছে, তারা ১৬২১ লাখ ভাগবতগীতা, ১১৭৩ লাখ রামচরিতমানস বিক্রি করেছে। গীতা শুধু হিন্দিতেই নয়, আরও দশটির বেশি ভারতীয় ভাষায় বিক্রি করেছে গীতা প্রেস। রয়েছে বাংলাতেও।
এই এত বিশাল প্রকাশনা, এত বিপুল তার বিক্রি… এই সবকিছুই কিন্তু গীতা প্রেস করে থাকে কার্যত কোনও বিজ্ঞাপন বা প্রচার ছাড়াই। অদ্ভুতভাবে, আজও গীতা প্রেসের বারাণসী প্রকাশনা বিভাগে কড়া নীতি রয়েছে, কোনওরকম বিজ্ঞাপন দেওয়া যাবে না। তাদের মাসিক পত্রিকা 'কল্যাণ'-এর সম্পাদক প্রেমপ্রকাশ লহরী বলেন, গীতা প্রেসের প্রতিষ্ঠাতা হনুমানপ্রসাদ পোদ্দার কোনওরকম প্রচারের বিরোধী ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, তিনি হিন্দুধর্মের জন্য কাজ করছেন। 'আমরা আজও সেই পুরনো ধারণাতেই বিশ্বাস রাখি'।
গীতা প্রেসের বই (book) বিক্রির একটা বড় স্তম্ভ হল রেলের প্ল্যাটফর্মের বইয়ের স্টল। মোটের ওপর যে কোনও স্টেশনে গেলেই দেখা যায়, ছোটোখাটো খাবারের দোকান, জলের দোকানের পাশাপাশি একটা-দুটো বই বা ম্যাগাজিনের দোকান থাকে। তাতে খুব ভারিক্কি চালের বইপত্র থাকে না, থাকে হালকা চালের নানা বই, পত্রিকা বা খবরের কাগজ। যা যাত্রীদের লম্বা সফরের সঙ্গী হয় এক রাত বা একদিনের জন্য! এইসব স্টলে একসময় অবধি তুমুল চাহিদা থাকত গীতা প্রেসের বইয়ের। এখন যদিও সেই চাহিদা খানিক কমেছে। তবে বিক্রি হয়।
স্বাধীনতার আগে থেকেই গীতা প্রেস নানা সামাজিক রাজনৈতিক ইস্যুতে সক্রিয় ভূমিকা নিত। বিজ্ঞাপন বা প্রচার থেকে দূরে থেকেও গীতা প্রেসের ভাঁড়ারে লক্ষ্মী কখনও অচলা হননি, তার একটা বড় কারণ, মাড়োয়াড়ি ব্যবসায়ীদের 'দান'। উত্তর ও পশ্চিম ভারত, এমনকি পূর্ব ভারতেরও বহু সম্ভ্রান্ত মাড়োয়াড়ি ব্যবসাদারদের কাছে গীতা প্রেসে দান করা পবিত্র ধর্মীয় কর্তব্য বলেই ধরা হয়। অক্ষয় মুকুল দেখিয়েছেন, সূচনাপর্ব থেকেই গীতা প্রেস মুসলিম আগ্রাসনের বিরোধিতা করে সবসময় যে কোনও সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামা হলেই মুসলিমদের দায়ী করত। নানা প্রগতিশীল পদক্ষেপের বিরোধিতা করতে গিয়ে গীতা প্রেসের অগ্নিবাণের মুখে পড়েছেন আম্বেদকর থেকে গান্ধী বা নেহরু অনেকেই। শুরুতে যদিও গীতা প্রেসের লেখক-তালিকা নিতান্ত মন্দ ছিল না। রবীন্দ্রনাথ, গান্ধী এমনকি মুনশি প্রেমচন্দকে দিয়েও লিখিয়েছে গীতা প্রেস।

মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে অবশ্য হনুমান প্রসাদ পোদ্দারের সম্পর্ক ভালই ছিল। রীতিমতো দুজনে চিঠি আদানপ্রদান করতেন, গান্ধী গীতা প্রেসের কার্যকলাপকেও উদারভাবে প্রশংসা করেছেন। কিন্তু মন্দিরে দলিতদের প্রবেশাধিকার দেওয়া নিয়ে গান্ধীর সঙ্গে মতান্তর হয় গীতা প্রেসের। হনুমানপ্রসাদ পোদ্দার ছিলেন এসব সংস্কারের ঘোর বিরোধী। বস্তুত, যে কোনও সরকারি বিলই হিন্দুধর্মে কোনো সংস্কার আনার চেষ্টা করলেই পোদ্দার তার বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন।
২০১৬ সালে এসেও গীতা প্রেসের পত্রিকা 'কল্যাণ'-এর আগস্ট সংখ্যায় স্বামী শিবানন্দের লেখা একটি প্রবন্ধ বলছে, মেয়েদের পতিব্রতা ধর্ম পালন করা উচিত। 'ও দেবী, ফ্যাশন বা প্যাশনে নিজের জীবন নষ্ট কোরো না। নয়ন উন্মীলিত করো। ন্যায়ের পথে থাকো। নিজের পতিব্রতা ধর্মকে রক্ষা করো, পতির মধ্যেই পরমেশ্বরের সন্ধান করো'। গীতা প্রেসের তরফে শিশুপাঠ্য নানা পুস্তকও প্রকাশ করা হয়, যাতে শেখানো হয়, গোমাতার রক্ষা এক পবিত্র কর্তব্য।
নরেন্দ্র মোদী বা অমিত শাহদের উত্থানের বহু আগে থেকেই উত্তর ভারত জুড়ে হিন্দুধর্ম, দর্শন ও রক্ষণশীলতাকে সুচারুভাবে সমাজের সর্বস্তরে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করে আসছে গীতা প্রেস। অছিপরিষদের সদস্য দেবীলাল আগরওয়াল বলেন, 'রামমন্দির আন্দোলনের একেবারে ভিত্তি জুড়ে ছিল গীতা প্রেস। কিন্তু জনপ্রিয়তা আমাদের লক্ষ্য নয়। হিন্দুধর্মের একতারক্ষাই আমাদের কাজ।' তাকে সাম্প্রদায়িক মনে করে শুধুমাত্র কোনও দলের সঙ্গে মিশিয়ে দিলে ভুল হবে। গীতা প্রেসের প্রকাশনার পাঠক বহু ও বিচিত্র, সবাই এইসব দাবির সঙ্গে সহমত তাও নয়। কিন্তু পড়েন, কেনেন। মার্ক্সের কথার সুর ধরেই ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বলেছিলেন, 'ধর্ম সাধারণ মানুষকে চুপ করিয়ে রাখার একটা দারুণ উপাদান!' গীতা প্রেস নিশ্চুপে কাজ করে প্রমাণ করেছে, তা মানুষকে সরব করারও উপাদান বটে।