
মেশিন নেই, হাতের কাছে যা আছে সেই নিয়েই উদ্ধারকাজ চলছে পাপুয়া নিউ গিনিতে।
শেষ আপডেট: 27 May 2024 20:32
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মাত্র কয়েকটা মুহূর্ত! যেন একটা বিস্ফোরণের আওয়াজ! নিমেষের মধ্যে যেন আস্ত পাহাড়টা ধসে পড়ল নিচে! প্রাণ হারালেন হাজার দুয়েকের বেশি। এমনই নজিরবিহীন ঘটনা ঘটল পাপুয়া নিউ গিনিতে।
প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম দ্বীপ নিউ গিনি। বিষুবরেখার একেবারে ওপরে অবস্থিত, ঘন জঙ্গল ও পাহাড়ে ঢাকা এই দ্বীপে রয়েছে অসংখ্য নানা উপজাতি। দ্বীপের দুটো অংশ, পশ্চিম ভাগ ইন্দোনেশিয়ার, পূর্ব ভাগে স্বাধীন দ্বীপরাষ্ট্র পাপুয়া নিউ গিনি। মাঝখানে প্রায় সোজা সরলরেখার মত আড়াআড়ি সীমান্ত টানা। সেই পাপুয়া নিউ গিনির একেবারে উত্তর প্রান্তে, রাজধানী পোর্ট মোরেসবি থেকে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার দূরে এনগা প্রদেশের কাওকালাম বলে একটি গ্রামে শুক্রবার গভীর রাতে হঠাৎই ধস নামে। জায়গাটা পাহাড়ি ও জঙ্গলে ঢাকা। এমনিতেই পাপুয়া নিউ গিনিতে রয়েছে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ রেনফরেস্ট বা বর্ষণ অরণ্য। তারই মাঝে রয়েছে অসংখ্য গ্রাম। সেরকমই একটা গ্রাম কাওকালাম রাতারাতি চলে গিয়েছে পাহার-প্রমাণ ধসের তলায়!
সংবাদসংস্থা এএফপি সূত্রের খবর, স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ওখানে কয়েকদিন আগে একটি ভূমিকম্প হয়েছিল। তাতেই বোধ হয় আলগা হয়ে যায় পাহাড়ের শিলাস্তর। তার ওপর ওখানে বৃষ্টি হয়েছে কয়েক পশলা। গত শুক্রবার রাত প্রায় তিনটের সময় আচমকা একটা গোটা পাহাড় ধসে পড়ে। চাপা পড়ে যায় আস্ত একটা গ্রাম। গ্রামটির সঙ্গে সংযোগকারী একমাত্র পাকা রাস্তাটাও চলে যায় মাটির তলায়।
এমনিতে পাপুয়া নিউ গিনি অন্যতম দরিদ্র দেশ। তার ওপর ঘটনাস্থল এতটাই দুর্গম জায়গায় যে, সেখানে চট করে কোনও ত্রাণ বা উদ্ধারকারী দল পাঠানোও সম্ভব নয়। তার ওপর বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। অসহায়ভাবে অন্ধকারে হাতড়ানো শুরু করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। আলো ফোটার অপেক্ষায় উদ্ধারকাজ শুরু হতেই দেরি হয়। তার ওপর অত বড় মাপের ধস সরানোর মত প্রায় কোনও যান্ত্রিক ব্যবস্থা নেই সেখানে। স্থানীয়রা হাতের কাছে শাবল-কোদাল যা পান সেই দিয়েই কাজে নেমে পড়েন।
সকাল হতেই বোঝা যায়, কী হয়ে গিয়েছে। বাসিন্দারা বিস্ফারিত চোখে দেখেন, তাঁদের চেনা পাহাড়ের একটা অংশই আর নেই! ধসে গিয়েছে একপাশে। তলায় চলে গিয়েছে ঘরবাড়ি, রাস্তা, জঙ্গলের একাংশ। খবর ছড়িয়ে পড়ে। রাজধানী পোর্ট মোরেসবির কর্তারা নড়েচড়ে বসেন। প্রাথমিকভাবে উদ্ধার করতে এসে ত্রাণকর্মীরা জানান, অন্তত একশো জনের বেশি আটকে রয়েছেন ধসের নিচে। প্রধানমন্ত্রী জেমস ম্যারাপে বিবৃতি দিয়ে বলেন, অবিলম্বে বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী, পূর্ত বিভাগ এবং দেশের সেনাবাহিনীকে পাঠানো হচ্ছে ওখানে।
কিন্তু তারপরেই বোঝা যেতে থাকে, অবস্থা যতটা ভয়ানক ভাবা হচ্ছিল, আদতে তার চেয়ে বহুগুণ বেশি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। একশো জন নয়, সংখ্যাটা হবে ছয়শোর বেশি! রাষ্ট্রপুঞ্জের তরফে জানানো হয়, এই বিপর্যয়ে শেষ খবর পাওয়া অবধি ৬৭০ জন মারা গিয়েছেন। কিন্তু পোর্ট মোরেসবি থেকে উদ্ধারকারী দল অকুস্থলে পৌঁছতে দেখা যায়, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ মারাত্মক। দেশের ন্যাশনাল ডিজাস্টার সেন্টারের ভারপ্রাপ্ত অধিকর্তা লুসেতে লাসো মানা রাষ্ট্রপুঞ্জকে জানান, 'ধস নেমে কম করে হলেও ২ হাজার জনের প্রাণ গিয়েছে। এলাকাটি এখনও যথেষ্ট অস্থির এবং অল্প অল্প করে পাহাড় এখনও ধসে পড়ছে। যেটা ওখানকার বাসিন্দা এবং উদ্ধারকারী দল দু'পক্ষের জন্যই চিন্তার।' রাস্তা এখনও পুরোপুরি বন্ধ। ধসের তলায়।
সংবাদসংস্থা সিএনএনকে স্থানীয় বাসিন্দা এভিৎ কাম্বু যেমন বলেছেন, 'আমার পরিবারের আঠারো জন এখন ধসের তলায়। কাউকেই বাঁচাতে পারিনি। গ্রামের কতজন যে এখনও চাপা পড়ে আছেন, হিসেব নেই। আমিই এই জমির মালিক, কিন্তু আমিই জানি না আমার জমির তলায় ক'জন চাপা পড়ে আছেন'। ফ্যালফ্যাল করে অসহায়ের মত তাকিয়ে থাকেন এভিৎ।
তিন দিন হয়ে গিয়েছে। অথচ এখনও সেই অর্থে উদ্ধারকাজ কিছুই এগোয়নি। স্থানীয় এক নেতা যেমন সিএনএনকে জানিয়েছেন, সেই প্রথম দিন থেকে এলাকার লোকজন খোঁড়াখুঁড়ি করে চলেছে। কিন্তু এখনও কোনও দেহ উদ্ধার হয়নি। মেশিন না আনলে হবে না। পাহাড়প্রমাণ উঁচু, পেল্লায় পাথর সরানো কোনওভাবেই মানুষের কাজ নয়। অথচ উন্নতমানের যন্ত্র এখনও পৌঁছতে পারেনি সেখানে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এতে মৃতের সংখ্যা বাড়তেই থাকবে ক্রমশ। এদিকে অস্থির পাহাড়ি জায়গায় আর বাড়তি ঝুঁকি নিতে চায়নি প্রশাসন। সংবাদসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, অন্তত আড়াইশোটি অক্ষত বাড়ি থেকে ১২০০-এর বেশি বাসিন্দাকে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছে প্রশাসন। এখনও পাহাড় ভেঙে ভেঙে পড়ছে। ফলে অতি সন্তপর্ণে এগোতে হচ্ছে উদ্ধারকারীদের।