দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিশাখাপত্তনমের রাসায়নিক কারখানায় বিষাক্ত গ্যাস লিক করে মারা গেছেন ১১ জন। এই ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পেরোতেই আজ, শুক্রবার সকালে ফের গ্যাস লিক করা খবর মিলল। তবে কালকের মতো মারাত্মক নয় পরিস্থিতি। অসুস্থ হয়ে পড়েছেন কয়েক জন এলাকাবাসী। তাঁদের উদ্ধার করা হয়েছে।
জেলা দমকলের কর্তা সন্দীপ আনন্দ বলেন, "কাল যে ট্যাঙ্ক থেকে স্টাইরিন গ্যাস লিক করেছিল, আজ সেটি থেকেই ফের গ্যাস বেরোতে শুরু করেছে। দমকলের ১০টি ইঞ্জিন ইতিমধ্যেই ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে। কাজ করছেন ৫০ জন দমকলকর্মী। দু’টি ফোম টেন্ডারও কাজ করছে। কারখানার দু-তিন কিলোমিটার পরিধি পর্যন্ত সমস্ত গ্রামবাসীকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে অন্য জায়গায়। তবু জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত রয়েছে অ্যাম্বুল্যান্স। এখনও কোনও বড় বিপদের খবর মেলেনি।"
ইতিমধ্যেই গতকালের গ্যাস দুর্ঘটনায় যে সমস্ত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাঁদের সকলকেই উদ্ধার করতে পুণে থেকে জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা টিম আনা হয়েছে। তারা এখনও কাজ করছে। তবে এ নিয়ে আর আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশাখাপত্তনম পুলিশ কমিশনার আরকে মিনা। তিনি জানিয়েছেন, কেমিক্যাল প্ল্যান্টের ২ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে যে সমস্ত বাসিন্দা রয়েছেন, তাঁদের বাড়ি থেকে বেরোতে নিষেধ করা হয়েছে।
এর পরে আজ, শুক্রবার ফের গ্যাস লিক করার পরে ঘটনাস্থল থেকে পাঁচ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে থাকা মানুষগুলোকে ইতিমধ্য়েই ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের বাইরে তাঁদের আত্মীয় বা বন্ধুদের বাড়িতে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তবে পরপর দু'দিন গ্যাস লিক করার ঘটনায় স্বাভাবিক ভাবেই আতঙ্ক ছড়িয়েছে এলাকাজুড়ে।
কেন্দ্রীয় সরকার ছাড় দেওয়ায় সবেমাত্র খুলেছিল অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তনমের রাসায়নিক কারখানাটি। এর মধ্যেই ঘটে গেল বড়সড় দুর্ঘটনা। বৃহস্পতিবার ভোর সাড়ে ৩টে নাগাদ বেঙ্কটপুরমের এলজি পলিমার্স ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেড নামক ওই বহুজাতিক রাসায়নিক কারখানা থেকে গ্যাস লিক শুরু হয়।
জানা গেছে, সে সময়ে কারখানায় ছিলেন শুধু নিরাপত্তারক্ষীরা। আচমকা গ্যাস লিক হওয়ায় অচৈতন্য হয়ে পড়েন তাঁরা। ফলে কেউ কিছু জানতেই পারেননি, গ্যাস ছড়িয়ে পড়তে থাকে লোকালয়ে। সাড়ে ৪টের দিকে আশপাশের এলাকার বাসিন্দাদের চোখ জ্বালা করতে থাকে ও শ্বাসকষ্ট শুরু হতে থাকে। অস্বস্তিতে ঘুম ভেঙে যায় অনেকের। তখন খবর যায় পুলিশে। জরুরি ভিত্তিতে উদ্ধারের কাজে নামে জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী।
সকালে গ্যাস লিকের খবর ফ্যাক্টরিতে পৌঁছনো মাত্র গোটা ফ্যাক্টরির সমস্ত কাজ বন্ধ করে লকডাউন করে দেওয়া হয় কারখানা। পুলিশ-প্রশাসনকে জানানো হয়, ক্ষতিকর গ্যাসটি সঙ্গে সঙ্গে লিকুইডে পরিণত করা হয়, যা বাইরে ছড়িয়ে ক্ষতি বাড়াতে পারবে না। কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে। যেটুকু গ্যাস লিক হয়েছে, তাতেই আশপাশের অসংখ্য মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত।
প্রাথমিক এফআইআর দায়ের হয়েছে পুলিশে। বিশাখাপত্তনমের পুলিশ কমিশনার আরকে মীনা জানিয়েছেন, আশপাশের গ্রামগুলি থেকে সকলকে উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন, কারখানার এক থেকে দেড় কিলোমিটার পরিধির মধ্যে যা ক্ষতি হওয়ার হয়েছে। যদিও গ্যাসের গন্ধ পাওয়া গেছে আড়াই কিলোমিটার দূর পর্যন্ত, কিন্তু মানুষের প্রাণের ক্ষতি অত দূর পর্যন্ত হয়নি।
অন্ধ্রের মুখ্যমন্ত্রী জগন্মোহন রেড্ডি জানান, ওই কেমিক্যাল প্লান্টের দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষকে এই ঘটনার দায় নিতে হবে। সরকারকে জবাব দিতে হবে, কী করে এই ঘটনা ঘটল। “কোন কোন নিয়ম মানা হয়েছে আর কোন কোন নিয়ম হয়নি, তা আমাদের এসে বলতে হবে। পুলিশও তদন্ত করছে গোটা ঘটনার। এই গাফিলতির দায় কার, তা খতিয়ে দেখা হবে। তার পরেই কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে যথাযথ ক্রিমিনাল অ্যাকশন নেওয়া হবে। কাউকে ছাড়া হবে না, কোনও কিছুকে রেয়াত করা হবে না।”– বলেন জগন্মোহন রেড্ডি।
এখনও পর্যন্ত ১১ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে বিষাক্ত গ্যাসটি। হাসপাতালে অসুস্থ অবস্থায় ভর্তি কয়েকশো মানুষ। যে গ্যাসটি লিক হওয়ায় এই বিপদ, তার নাম ‘স্টাইরিন‘। স্টাইরিন সাধারণ তাপমাত্রায় তরল অবস্থায় থাকে। ওই অবস্থাতেই গ্যাসটি কাজে লাগে প্লাস্টিক ও রবার শিল্পে। দেশজুড়ে বড়বড় কারখানাগুলিতে এর ব্যাপক ব্যবহার। বিভিন্ন প্যাকেজিং মেটেরিয়াল, ওয়্যারিং, ফাইবারগ্লাস, প্লাস্টিকের পাইপ, গাড়ির যন্ত্রাংশ, প্লাস্টিকের কাপ– এই সব কিছু তৈরিতেই স্টাইরিন গ্যাস ব্যবহৃত হয়।
মানবদেহে খুব অল্প পরিমাণে এই গ্যাস ঢুকলেই তা ক্যানসারের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। নষ্ট হতে পারে স্নায়ুতন্ত্র। মাথা ঘুরে, বমি করে অজ্ঞান হয়ে যান বহু মানুষ। রাস্তাঘাট, নর্দমা থেকে উদ্ধার করতে হয় তাঁদের।
তবে প্রশ্ন একটাই, কোন গাফিলতিতে ঘটে গেল এত বড় বিপর্যয়! ইতিমধ্যেই নয়াদিল্লির জাতীয় পরিবেশ আদালতে ওই কারখানার মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করেছে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। সরকার যাতে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গড়ে গোটা ঘটনাটির তদন্ত ও বিচার করে, সে বিষয়েও আবেদন করেছে তারা।