
শেষ আপডেট: 25 April 2023 07:46
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আর কয়েকটা দিনের অপেক্ষা মাত্র। কাগজপত্র তৈরি হয়ে গেলেই জেল (jail) থেকে বেরিয়ে আসবে ‘গব্বর সিং’ (Gabbar Singh)।
বিহারবাসীর (Bihar) মুখে মুখে ঘুরছে সেই খবর। বড়রা ছোটদের শোনাচ্ছে গব্বর সিংয়ের কাহিনি। ১৭ বছর আগে কী করে বেড়াত গব্বর ও তার দলবল। কীভাবে ভয়ে শিঁটকে থাকত গোটা মহল্লা। পাশের রাজ্য উত্তরপ্রদেশে গ্যাংস্টার আতিক আহমেদ, তার ভাই ও পুত্রের নৃশংস হতার ঘটনায় বিহারের একটা মাফিয়া ডন আনন্দ মোহনকে নিয়ে আলোচনা নয়া মাত্রা দিয়েছে।
শোলের কালজয়ী চরিত্রটির মতো ভয়ানক ডাকু না হলেও একটা সময় এলাকার দাগি দুষ্কৃতীদের লোকে ‘গব্বর সিং’ বলেই মানত। সেই তুলনায় আনন্দ মোহন সিংয়ের রাজত্ব ছিল বিশাল। মধ্য বিহারের হাজিপুর, সমস্তিপুর, মুজফফরপুর, বৈশালী, সহরশা, ছাপরা, সিওয়ান এলাকায় একচ্ছত্র দাপট ছিল আনন্দ বাহিনীর। এই নামে পরিচিত ছিল তার দল। দলের লোকজন, সাধারণ মানুষ ভয়ে ভক্তিতে বলত ‘গব্বর সিং’।
রাজত্ব বলতে তোলাবাজি আর গুন্ডাগিরি। নয়ের দশকের মাঝামাঝি। বিহারের হাজার হাজার গ্রামে তখনও শাসন-প্রশাসন বলতে সানলাইট সেনা, ভূমি সেনা, রণবীর সেনা, কুয়ের সেনা, গঙ্গা সেনার ফতোয়া। এগুলি, ব্রাহ্মণ, রাজপুত, ভূমিহার, যাদব, হরিজন—প্রত্যেক জাতির নিজস্ব সেনা বাহিনী। স্বজাতির হয়ে গ্রাম দখলের লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়াই ছিল এই প্রাইভেট সেনার কাজ। গ্রামে গ্রামে প্রকাশ্যেই চলত অস্ত্র প্রশিক্ষণ। ভয়ে পুলিশও ত্রিসীমানায় যেত না ওই সব গ্রামে। রাজপুতদের গঙ্গাসেনার কমান্ডার ইন চিফ তখন টগবগে যুহক আনন্দ মোহন সিং।
১৯৯০-এর পর থেকে একটু একটি করে বদলে যেতে থাকে বিহারের জাত রাজনীতির সমীকরণ। লালুপ্রসাদ যাদবের শাসন দীর্ঘায়িত হতে থাকলে ক্রমে মাথা তোলে যাদবদের প্রাইভেট আর্মি লোরিক সেনা। ভূমিহারদের রণবীর সেনা আর রাজপুতদের গঙ্গা সেনার সঙ্গে লড়াইয়ে বহু প্রাণহানি আর গ্রাম হাতছাড়া হয়ে মুষড়ে পড়া লোরিক সেনা স্বজাতি লালুপ্রসাদের রাজনৈতিক উত্থানে নতুন করে জেগে ওঠে। ততদিনে রাজপুত আনন্দ মোহন হয়ে উঠেছে গঙ্গা সেনার মুখ। লালুপ্রসাদের পুলিশের পয়লা নম্বর টার্গেট সে ও তার বাহিনী। যাদবদের অভিযোগ, আনন্দ মোহনের হাত থেকে বাঁচতে অন্য জাতের জওয়ান ছেলেরাও তার বাহিনীতে নাম লেখাতে বাধ্য হত।

১৯৯৪-এর মাঝামাঝি নাগাদ আনন্দ মোহনের গঙ্গা সেনার সঙ্গে যাদবদের লোরিক সেনার লড়াই নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে উঠল। প্রথম থেকে উচ্চবর্ণের চার প্রধান জাতি ব্রাহ্মণ, রাজপুত, ভুমিহার এবং লালা বা কায়স্থরা কংগ্রেস ছাতার তলায়। ক্রমে তাতে থাবা বসাচ্ছে রাজনীতিতে উদীয়মান বিজেপি।
বিষয়টি নজর এড়ায়নি ততদিনে যাদব সমাজের ত্রাতা তথা দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হয়ে ওঠা লালুপ্রসাদের। দুই সর্বভারতীয় দলের অগ্রগতি রুখে দিতে রাজনীতি আর সমাজ জীবনে উচ্চবর্ণের দাপটের দাঁত ভেঙে দেওয়ার কৌশল নিলেন মুখ্যমন্ত্রী লালুপ্রসাদ। ডাক দিলেন, ‘ভুরাবাল (ভূমিহার-রাজপুত-ব্রাহ্মণ-লালা বা কায়স্থ) কো ক্ষতম করো।’ এই ক্ষতম মানে অবশ্যই হত্যা নয়। উচ্চবর্ণের দাপট দমিয়ে দেওয়া। তারজন্য আশু প্রয়োজন ছিলে তাদের প্রাইভেট আর্মিগুলিকে নিরস্ত্র করে জেলে ঢোকানো। যদিও জাতপাতের রেষারেষি, জমি জায়গা নিয়ে সংঘাত ক্রমে যুদ্ধের চেহারা নিল গ্রামের পর গ্রামে। এমনই এক সংঘর্ষে পাটনায় গঙ্গার উল্টো পারে হাজিপুর-বৈশালির দুর্গম গ্রামে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে মারা যায় আনন্দ মোহনের ডানহাত ছোটন শুক্লা। অভিযোগ, পুলিশের সঙ্গে যাদবদের প্রাইভেট আর্মি লোরিক সেনার জওয়ানেরাও ছিল।
অনুগামী ছোটনের মৃত্যুর বদলা নিতে শুরু হয় আনন্দ মোহনের বাহিনীর পাল্টা তাণ্ডব। রাস্তা, রেল অবরোধ তো আছেই, গ্রামে, হাটে-বাজারে হামলার ঘটনায় তটস্থ হয়ে ওঠে মধ্য বিহারের বিস্তীর্ণ এলাকা। এমনই এক বিকালে পাটনা থেকে অফিসের কাজ সেরে ফিরছিলেন গোপালগঞ্জের জেলাশাসক জি কৃষ্ণাইয়া। অবিভক্ত অন্ধ্রপ্রদেশের বাসিন্দা তরুণ আইএএস অফিসার বিহার ক্যাডারে যোগ দিয়েছিলেন বছর কয়েক আগে। মুজফ্ফরপুর বাজারে জেলাশাসকের গাড়ি ঘিরে নিয়ে তাঁকে পিটিয়ে খুন করে আনন্দ মোহনের বাহিনী। ষড়যন্ত্র, উসকানি এবং গণপিটুনিতে যুক্ত থাকার অভিযোগে গ্রেফতার হয় প্রাক্তন সাংসদ গ্যাংস্টার-কাম-পলিটিশিয়ান আনন্দ মোহন। ১৯৯৪ সালের সেই মামলায় নিম্ন আদালতে ফাঁসির সাজা হয় ধৃতদের। পরে পাটনা হাই কোর্ট মৃত্যুদণ্ড রদ করে যাবজ্জীবন কারাবাসের সাজা দিয়েছে।

একদা গব্বর সিং নামে খ্যাত আনন্দ মোহনের বয়স এখন ৬৯। তার মতো অনেক অপরাধী পাচ্ছে বিহারের নীতীশ কুমার সরকারের এক সিদ্ধান্তের কারণে। রাজ্য সরকার সম্প্রতি জেল ম্যানুয়াল বদলে সিদ্ধান্ত করেছে, যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তদের ১৪ বছর কারাবাসের পর মুক্তি দেওয়ার আবেদন সরকার বিবেচনা করবে। এতদিন এর মেয়াদ ছিল ২০ বছর। আনন্দ মোহন ও তার সঙ্গীরা ১৭ বছর জেলে আছে। ফলে নয়া সরকারি সিদ্ধান্তের জেরে জেল মুক্তি ঘটতে চলেছে বিহারের একদা গব্বর সিংয়ের।
চর্চা শুরু হয়েছে, আনন্দ মোহনের মুক্তি ঘিরে রাজনীতির লাভ-লোকসান নিয়ে। লক্ষণীয় হল, রাজ্যের কোনও দলই চড়া গলায় সরকারি সিদ্ধান্তের বিরোধিতায় নামেনি। তার পিছনেও আছে রাজনীতিরই অঙ্ক। বিহারের প্রাক্তন উপমুখ্যমন্ত্রী বিজেপির প্রবীণ নেতা সুশীল মোদী এই গ্যাংস্টার কাম পলিটিশিয়ানের মুক্তির খবরে স্বস্তি প্রকাশ করে টুইট করেছেন। আনন্দ মোহনের সঙ্গে পুরনো ছবি সহ টুইটে বলেছেন, ‘রাজীব গান্ধীর হত্যাকারীরা মুক্তি পেতে পারলে আনন্দ মোহন এমনকী অপরাধ করেছেন। নীতীশ কুমারের উচিত ছিল আরও আগেই মুক্তি দেওয়া।’
আসলে ১৭ বছর কারাগারে আটক থাকলেও স্ত্রী লাভলির মাধ্যমে বিহারের একদা গব্বর সিংয়ের প্রভাব বজায় আছে অনেকটাই। প্রতিটি নির্বাচনেই আলোচনায় আসে আনন্দ মোহনের আশীর্বাদধন্যদের কথা।
তাছাড়া, বিহারের রাজনীতিতে তিনি লালু-নীতীশ-সুশীল মোদীদের সমসাময়িক। স্বাধীনতা সংগ্রামী রাম বাহাদুর তোমরের নাতি আনন্দ মোহন বড় হয়ে গ্যাংস্টার পরিচয়ে পরিচিত হলেও সত্তরের দশকে জয়প্রকাশ নারায়ণের ডাকে কলেজ ছেড়ে ইন্দিরা হটাও রাজনীতিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ১৯৮৯-এ জনতা দলের টিকিটে লোকসভা যান। অনুগামীদের ধরে রাখতে জেলে যাওয়ার পর পরই তৈরি করেন নিজের দল বিহার পিপলস পার্টি। স্ত্রী লাভলিও সেই দলের হয়ে বিধানসভা, লোকসভাতেও পৌঁছে গিয়েছেন। তাই রাজনৈতিক দলগুলি জল মাপছে। যদিও সমাজমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় বয়ে চলেছে।
তবে রাজনীতি চড়িয়ে দিয়েছেন পড়শি রাজ্য উত্তরপ্রদেশের নেত্রী মায়াবতী। তিনি দলিতের প্রতি বঞ্চনা, অবমাননার অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর কথায়, আনন্দ মোহনের হাতে নিহত জেলাশাসক কৃষ্ণাইয়া দলিত পরিবারের সন্তান ছিলেন। তাঁর খুনিদের আগাম মুক্তি দলিতদের বিচার থেকে বঞ্চনার শামিল।
হিজাব আন্দোলনের মুখ তবাসসুম কর্নাটকে ১২ ক্লাসের পরীক্ষায় প্রথম