দ্য ওয়াল ব্যুরো: ফ্রুট জুসের প্যাকেটের খোলস ছাড়াতেই দেখা গেল সবটুকু তরল জমে পাথর হয়ে গেছে। হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়েও তাকে ভাঙা দুষ্কর। একই দশা ডিম আর কাঁচা আনাজেরও। সবই যেন লোহার মতো শক্ত। হিমশীতল হাওয়া যেন নিঙড়ে রস শুষে নিয়েছে সবকিছুর। ঘটনাস্থল পৃথিবীর সর্বোচ্চ যুদ্ধক্ষেত্র সিয়াচেন। পৃথিবীর কয়েকটি দুর্গমতম বিন্দু যদি বেছে নিতে বলা হয়, সিয়াচেন অবশ্যই তার মধ্যে একটি। এই গ্রহের একান্ত, নির্জন প্রান্ত হিসেবেই যেন জন্ম সিয়াচেন হিমবাহের। সেখানেই অতন্ত্র প্রহরারত ভারতীয় সেনা জওয়ানরা। সিয়াচেনের দুর্গম প্রান্তরে জীবনযাত্রা কতটা কঠিন, তার হাল্কা একটা আভাস দিয়েছেন জওয়ানেরা। যা দেখে বিস্মিত দেশবাসী।
প্রতিটা মিনিট, প্রতি সেকেন্ড বাঁচার লড়াই। দুর্গম প্রান্তরের একদিকে যদি শত্রু আক্রমণের সম্ভাবনা থাকে, তাহলে অন্যদিকে প্রবল বাধা হয়ে দাঁড়ায় প্রতিকূল আবহাওয়া। সব কিছুর সঙ্গেই মানিয়ে নিয়ে চলে এক অদম্য লড়াই। বেঁচে থাকার লড়াই। ইন্ডিয়ান মিলিটারি অ্যাকাডেমি তাদের ফেসবুক পেজে একটি ভিডিও শেয়ার করেছে। তাতেই আভাস মিলেছে সিয়াচেনে কেমন ভাবে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখেন জওয়ানেরা।
ভিডিওতে দেখা গেছে, কাঠের বড় স্ল্যাবে কয়েকটা ডিম ভাঙার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন তিন জওয়ান। কিন্তু ডিম পুরো পাথর। হাতুড়ির ঘায়েও ভাঙে না। স্ল্যাবেই ছড়িয়ে রয়েছে আরও আনাজপাতি, টোম্যাটো, আলু, আদা, পেঁয়াজ ইত্যাদি। সবগুলিরই মোটামুটি একই দশা। মজা করে এক জওয়ান বললেন, "এটা হচ্ছে বিশেষ ধরনের ডিম যা হিমবাহের মধ্যে পাওয়া যায়।" অন্য জওয়ানের কথায়, "সিয়াচেনের তাপমাত্রা যখন তখন হিমাঙ্কের ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস নীচে নেমে যায়। বেঁচে থাকাটা এখানে নরক যন্ত্রণার মতো।"
https://www.facebook.com/IMA.Dehradun.Uk/videos/364614397587955/?v=364614397587955
"তাপমাত্রা যখন -৪০ ডিগ্রিতে নামে. ডাল-রুটি কিছুই বানানো যায় না। সিয়াচেনে সেনাবাহিনীর জীবন কেমন, সেটা কেউ কল্পনাও করতে পারবেন না," জানালেন তিন জনের একজন। এই ভিডিও এখন নেট দুনিয়ায় ভাইরাল। ফেসবুক-টুইটারে কয়েক হাজার শেয়ার হয়ে গেছে।
চারিদিকে ১৮ থেকে ২০ হাজার ফুট উঁচু পাহাড়। আদিগন্ত বিস্তৃত বরফ। পশ্চিমতম প্রান্ত ছুঁয়েছে হিমালয়ের শেষ বিন্দুকে। সে দিক থেকেই বাঁক নিয়ে এই হিমবাহের পূর্ব দিকে এসে শেষ হয়েছে কারাকোরাম। পৃথিবীর দুই দুর্গমতম পর্বতশ্রেণির মাঝে ৭২ কিলোমিটার জুড়ে শুধুই বরফ।তাপমাত্রা কখনও পৌঁছে যায় মাইনাস ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। সারা বছরে সিয়াচেনে প্রায় ৩০-৪০ ফুট গভীরতার বরফ পড়ে। অক্সিজেনের মাত্রা সমতলের প্রায় দশ শতাংশ। তাই পৌঁছনোর পরই কমতে থাকে ওজন। বমি হওয়ার পাশাপাশি খিদে থাকে না একেবারেই। খাওয়ার কথা বাদই দেওয়া গেল, বেঁচে থাকাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
১৯৮৪ সাল থেকেই সিয়াচেনে অবস্থান করছে ভারতীয় সেনা। শত্রুর গোলা নয়, পৃথিবীর উচ্চতম এই যুদ্ধক্ষেত্রে ভারতীয় সেনাদের সব থেকে বড় শত্রু হল প্রতিকূল আবহাওয়া। গত তিন দশক ধরে শ’য়ে শ’য়ে সেনার মৃত্যু হয়েছে এই হিমবাহে। গুলি-বোমা-মর্টারের থেকেও প্রকৃতির খামখেয়ালিপনাই অভিশাপ হয়ে দেখা দেয় কর্তব্যরত সেনাবাহিনীর সামনে। বহু মৃত্যু ডেকে আনে ভয়ঙ্কর তুষারঝড়। রয়েছে ক্রিভাসের আতঙ্কও। হিমবাহের কোনও কোনও অংশে গভীর এবং লম্বা ফাটল তৈরি হয় মাঝে মধ্যেই। সেই ফাটল অনেক সময় গ্রাস করে নেয় সর্বস্ব।