দ্য ওয়াল ব্যুরো: 'রেশন-পানি' নিতে এসে ঠা ঠা রোদে ঘুমন্ত বাচ্চাকে কোলে নিয়ে লম্বা লাইনে বসে এক তরুণী মা। মধ্যপ্রদেশের পাহাড়গড় এলাকার এই দৃশ্যের পটভূমি ধরেই সামনে এল সেখানকার কাহিনি। কারণ আশপাশে কোনও রেশনের দোকান চোখে পড়ছে না।
দূরের একটি ছোট ঘর দেখিয়ে তরুণী বলেন, 'রেশন-পানি' নিতে নয়, আসলে সে কথা জানতে এসেছেন তাঁরা। ওই ঘরটি আদতে পাহাড়গড়ের ব্লক পঞ্চায়েতের অফিস। সেখানেই তাঁরা প্রশ্ন নিয়ে এসেছেন লকডাউনের প্রায় দেড় মাস পরে। খাবেন কী? বাঁচবেন কীভাবে? বাচ্চা কী খাবে? কতদিনে কাজ মিলবে আবার? এমনই হাজার প্রশ্ন নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে তাঁরা। এটাই তাঁদের 'রেশন-পানি'র লাইন।
দিল্লি থেকে ৪০০ কিলোমিটার দূরে মধ্যপ্রদেশের মোরেনা জেলা। চম্বল এলাকার এই জেলাতেই পাহাড়গড় ব্লক। শাহরিয়া আদিবাসী সম্প্রদায়ের বাস সেখানে। লাইনে বসে থাকা তরুণী মা পূজা তাঁদেরই প্রতিনিধি। তিনি থাকেন তিন কিলোমিটার দূরের খাদারিয়াপুরা গ্রামে। পাহাড়গড় বাজারে কাঠ বেচেই দিন কাটে। কিন্তু লকডাউনের পর থেকে, মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকেই থমকে গেছে জীবন। থমকে গেছে দৈনিক রোজগার, টান পড়েছে খাবার পাতে।

শাহরিয়া সম্প্রদায়ের মানুষগুলো মার্চ থেকে মে মাস ব্যস্ত থাকেন বিভিন্ন চাষখেতে। গম, সর্ষে, রসুন চাষ হয় রাজ্যের নানা প্রান্তে, মজুর হিসেবে খাটেন তাঁরা। কেউ কেউ যান পড়শি রাজ্যগুলিতেও। এই কাজ এবং এই আয় থেকে নিজেরাও সারা বছরের ফসল তোলেন ঘরে। কারণ এই সম্প্রদায়েক বেশির ভাগ কৃষকই চাষ করার মজুরি টাকায় পান না, পান ফসলে।
যেমন এক বিঘা জমিতে গম চাষ করলে কৃষকদের মজুরি হয় ১৫০ কেজি গম। মোটামুটি ৫ জন কৃষক এক বিঘা চাষ করে ফেলতে পারেন এক দিনে। ফলে এক এক জনের ঘরে ওঠে ৩০ কেজি করে ফসল। এক পরিবারের দম্পতি এভাবে ১০-১৫ দিন কাজ করলে মোটামুটি ৬০০ কেজি ফসল ঘরে ওঠে। এটুকুই সারা বছরের নিশ্চিত খাদ্য-নিরাপত্তা।
এবার সে সব বন্ধ। মহামারী কেড়ে নিয়েছে খাবারের নিশ্চয়তাও। ভরসা এখন শুধুই সরকার। যদিও গ্রামের মজুররা তৈরি ছিলেন পায়ে হেঁটেই খেতে গিয়ে চাষ করতে। কিন্তু সম্ভব হয়নি সেটাও। পূজার কথায়, "কাছু কামাই কুছু ধান্দো নাহি হো পা রাহো, ভুখে পিয়াসে ঘরমে ব্যাইঠে হ্যায়, পুলিশনে খাড়েদ দিয়া।" অর্থাৎ রোজগার নেই, কাজ নেই। খিদে-তেষ্টা নিয়ে ঘরে বসে আছি, বেরোলেই পুলিশ তাড়িয়ে দিচ্ছে।

প্রশ্ন ওঠে, ঘর থেকে বেরোনো যখন পুলিশ আটকানোর দায়িত্ব নিয়েছে, তার মানে এই গ্রাম বা এই মানুষগুলি প্রশাসনের নজরের বাইরে নয়। তাহলে তাঁরা খাবার কেন পাচ্ছেন না? লকডাউনের পরেই তো এই মানুষগুলোর জন্যই বড় আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও তাঁর সরকার। ঘোষণা করেছে ১০ কেজি করে খাদ্যশস্য বণ্টনেরও। তাহলে লকডাউনের ছ'সপ্তাহ পরেও কেন 'রেশন-পানি' জোটেনি শাহরিয়া মানুষগুলোর?
লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা পূজা, শান্তিরা অবশ্য খবর রাখেন না এসব সরকারি নীতির। তাঁরা বলছেন একটাই কথা, পাহাড়গড়ে সরকারের তরফে কোনও খাবার এসে পৌঁছয়নি। খাদারিয়াপুরা গ্রামের কেউ পায়নি।
একই অভিযোগ ২০ কিলোমিটার দূরের ধোবিনি গ্রামেও। সেখানেও শাহরিয়া সম্প্রদায়ের মানুষই বাস করেন। সঙ্গে থাকেন রজক সম্প্রদায়। রজকরা অবশ্য ভিন্ রাজ্যে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেই যান বেশি। তাঁরা চাষবাসে অতটা দক্ষ নন। ধোবিনি গ্রামের এই দুই সম্প্রদায়ের তরফেই অভিযোগ, লকডাউনের পর থেকে সব কাজ বন্ধ। কিন্তু সরকারি আনুকূল্যের কিছুই এসে পৌঁছয়নি তাঁদের কাছে। ধোবিনির বাসিন্দা ২১ বছরের লক্ষ্মী জানালেন, রুটির সঙ্গে পেঁয়াজ আর লঙ্কা। এটাই তাঁদের চার বেলার খাবার। গম শেষ হয়ে গেলে কী হবে, জানেন না কেউ।

এই অভিযোগ অবশ্য অস্বীকার করেনি মধ্যপ্রদেশের সরকার। আধিকারিকরা জানিয়েছেন, রেশন বিলির কাজ শেষ হয়নি তাঁদের। রাজ্যের খাদ্য সরবরাহ দফতরের ডিরেক্টর অবিনাশ লাভানিয়া বলেন, "দু'মাসের জন্য যা বরাদ্দ তার ৫১ শতাংশ চাল বণ্টন করা হয়েছে। বাকিটার কাজ চলছে। মোরেনা এলাকায় ৪৪ শতাংশ বিতরণের কাজ হয়েছে, বাকিটা এখনও হয়নি।" তাঁর ব্যাখ্যা, কেন্দ্র ও রাজ্যের সরকারি নির্দেশ এসে গেলেও, মূলত গণপরিবহণের সমস্যার জন্যই বিতরণে দেরি হচ্ছে।
পাশাপাশি এ কথা ধরে নেওয়াই যায়, যতটা বিতরণ ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে বলে জানাচ্ছেন তিনি, তার মধ্যে দুর্ভাগ্যক্রমে জায়গা হয়নি পাহাড়গড় সংলগ্ন গ্রামগুলির শাহরিয়া সম্প্রদায়ের বহু মানুষের। কিন্তু যাঁরা পেয়েছেন রেশন, তাঁরাই বা কী বলছেন? পাহাড়গড়ের সাজেন্দে নামের এক বাসিন্দা জানালেন, তাঁর অন্ত্যোদয় কার্ড রয়েছে সরকারের বানিয়ে দেওয়া। এই কার্ডের জন্য প্রতি মাসে ৩৫ কেজি চাল পাওয়া যায় রেশনের। পরিবারের সদস্য সংখ্যা যতই হোক, চালের পরিমাণ এই ৩৫ কেজি। তিন মাসের আগাম হিসেবে মোট ১০৫ কেজি চাল পেয়েছেন তিনি। তাঁর প্রশ্ন, "আমার ছ'সদস্যের পরিবার। কতদিন চলবে এই চালে?"
আর যাঁদের অন্ত্যোদয় কার্ডের সুবিধা নেই, আক্ষরিক অর্থেই তাঁদের পরিস্থিতি আরও করুণ।
তবে হাল ছাড়ছেন না তাঁরা। প্রকৃতিগত কারণেই সহ্য ক্ষমতা ও বেঁচে থাকার শক্তি অনেক বেশি এই সম্প্রদায়ের মানুষগুলোর। বনে-বাদাড়ে ঘুরে কিছু না কিছু খাবার সংগ্রহ করে শিশুদের মুখে তুলে দিচ্ছেন তাঁদের অনেকেই। পাশাপাশি বলছেন, সরকার তাঁদের কাজ দিক। রীতিমতো পরামর্শের সুরে সমস্যার সমাধান করার আর্জি জানাচ্ছেন তাঁরা।

তাঁদের মতামত, এলাকায় খুবই জলকষ্ট। এই সময়ে যখন অন্য কাজ নেই, তখন তাঁরা সকলে একটা বড় জলাশয় খননের কাজ করতে পারেন। সরকার এই কাজ করাতে পারে তাঁদের দিয়ে। এতে রোজগারও হবে, জলের সমস্যাও মিটবে। অবশ্য একথাও সত্যি, সরকারি ভাবে জলাশয় খননের কাজ করার জন্য শুধু শ্রমিকদের ইচ্ছেই যথেষ্ট নয়। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অসংখ্য নিয়ম-কানুন, যা সবই বাধা পাবে মহামারী পরিস্থিতির জন্য।
এ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি কবে মিলবে, তা জানে না কেউ। আর মুক্তি না মিললে যে স্বাভাবিক জীবনে ফেরা ক্রমেই কঠিনতর হবে, সে কথাও স্পষ্ট। শাহরিয়া সম্প্রদায়ের মানুষগুলিও ব্যতিক্রম নন। তাঁরা এই পরিস্থিতি সম্পর্কে একটাই কথা বলছেন, "সবার থেকে আলাদা থাকব, বেরোব না, সর্দি-জ্বর হলেই সরকারকে জানাব-- এগুলো সব ঠিক আছে। কিন্তু আমরা এখন খাব কী?"
এই প্রশ্নের উত্তরের দিতেই আপাতত চেয়ে আছেন লক্ষ্মী, শান্তি, সাজেন্দেরা।