
শেষ আপডেট: 3 June 2018 08:24
সম্মানিত হলেন প্রবীণ প্রজন্মের এভারেস্ট অভিযাত্রীরা[/caption]
১৯৫৩ সালের এই দিনেই তেনজিং ও হিলারি পা রেখেছিলেন এভারেস্ট শৃঙ্গে। এই 'এভারেস্ট ডে' উপলক্ষে সোনারপুর আরোহী এবং ইন্ডিয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ফাউন্ডেশন (IMF)-এর যৌথ পরিচালনায় ২ জুন, শনিবার, গোর্কি সদনে বাঙালির এভারেস্ট অভিযানের স্মৃতিচারণ এবং অভিযানগুলির উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলী নিয়ে আয়োজিত হয়েছিল একটি অনুষ্ঠান।
এভারেস্ট অভিযানে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য সম্মানপ্রাপকের তালিকায় ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ থেকে হওয়া ১৭টি এভারেস্ট অভিযানের প্রায় ৬০ জন অভিযাত্রী। সম্মানিত হলেন বাংলোর বিভিন্ন এভারেস্ট অভিযানের পর্বতারোহী, বেসক্যাম্প স্টাফ থেকে অভিযানের চিকিৎসক এবং আলোকচিত্র শিল্পীরাও। এর মধ্যে কিছু অভিযাত্রী ব্যস্ততার কারণে অনুষ্ঠানে হাজির থাকতে পারেননি বলে জানা গেছে।
১৯৯১ ও ১৯৯৩ সালে ভারতের প্রখ্যাত দুই পর্বতারোহী প্রাণেশ চক্রবর্তী ও অমূল্য সেনের নেতৃত্বে কিছু নবীন বাঙালি পর্বতারোহী তিব্বতের দিক দিয়ে এভারেস্ট আরোহণের দুঃসাহসিক প্রচেষ্টা করেছিলেন। তা প্রকৃত অর্থেই ছিল ঐতিহাসিক ও পথপ্রদর্শক। তারই কৃতজ্ঞতা স্বরূপ তাঁদের সম্মানিত করল সোনারপুর আরোহী ও আইএমএফ।
[caption id="attachment_9024" align="alignleft" width="282"]
সম্মানিতদের দেওয়া হলো এই স্মারক কয়েন[/caption]
রাধানাথ শিকদার ও তেনজিং নোরগের চিত্র সম্বলিত স্মারক মুদ্রা ও উত্তরীয়তে সম্মানিত হলেন আগের প্রজন্মের বিশিষ্ট পর্বতারোহী ও এভারেস্ট অভিযাত্রীরা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন মানিক ব্যানার্জী, অমূল্য সেন, ভাইস এয়ার মার্শাল(রিটায়ার্ড) অপূর্ব ভট্টাচার্য, গৌতম দত্ত, অতনু চ্যাটার্জি, সুশান্ত মজুমদার, রাজশেখর ঘোষ, রিতা চক্রবর্তী, পলাশ মজুমদার, উৎপল সরকার, দেবাশিস নাথ, ডঃ ইন্দ্রনীল সেন, বিপ্লব দাশগুপ্ত, বিপ্লব সিনহা রায়, ডঃ প্রসেনজিৎ ব্যানার্জী, শ্যামল সরকার সহ আরও অনেকে।
পরবর্তী প্রজন্মের এভারেস্ট অভিযাত্রীদের মধ্যে সম্মান প্রাপকের তালিকায় ছিলেন (এর মধ্যে কয়েক জন বিভিন্ন কারণে আসতে পারেননি) মিলন নাথ, প্রথম বাংলাভাষী এভারেস্ট আরোহণকারী সত্যব্রত দাম, প্রথম বাংলাভাষী মহিলা এভারেস্ট আরোহণকারী শিপ্রা মজুমদার এবং বাংলার অনান্য এভারেস্ট আরোহণকারীরা। এঁরা হলেন বসন্ত সিংহরায়, দেবাশিস বিশ্বাস, দীপঙ্কর ঘোষ, দেবব্রত মুখার্জি, বিপ্লব বৈদ্য, সত্যরুপ সিদ্ধান্ত, দেবরাজ দত্ত, টুসি দাস, চেতনা সাউ, মলয় মুখার্জি, রুদ্রপ্রসাদ হালদার, রমেশ রায়, উজ্জ্বল রায়, দেবদাস নন্দী, কুন্তল কাঁড়ার, এস কে সাহাবুদ্দিন, ত্রিশলা গুরুঙ্গ, সুলক্ষণা তামাঙ্গ প্রমুখ পর্বতারোহী সহ আরও অনেকে। গোর্কিসদনের অনুষ্ঠানে পুরস্কার প্রাপকের তালিকায় ছিলেন গৌতম ঘোষও। ২০১৬ সালের এভারেস্ট অভিযানে যাঁর মৃত্যু হয়।
ঠিক একইরকম ভাবে মঞ্চে অনুপস্থিত থেকেও গোর্কি সদনে ভীষণ ভাবে উপস্থিত ছিলেন হিমালয়ে শেষ ঘুমে ঘুমিয়ে পড়া ও পুরস্কার প্রাপকদের তালিকায় থাকা সুভাষ পাল, রাজীব ভট্টাচার্য, ছন্দা গায়েন (তিনজনই এভারেস্টে আরোহণ করেছিলেন) ও পরেশ নাথেরা। তালিকায় ছিলেন এভারেস্ট আরোহণ করে ফিরে আসার পর হৃদরোগে প্রাণ হারানো প্রদীপ সাউও। পর্বতারোহীদের ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় বার বার উঠে এসেছিল ওপরের নামগুলি। পুরস্কার প্রাপকের তালিকায় ছিলেন ২০১৬-তে এভারেস্টে নিশ্চিত মৃত্যুকে চ্যালেঞ্জ করে ফিরে আসা সুনীতা হাজরাও।
এ দিন একই সঙ্গে একই মঞ্চে আয়োজিত হলো সোনারপুর আরোহীর গ্রাজুয়েশন সেরিমনি। রক ক্লাইম্বিং কোর্স ও সামার ক্যাম্পের সফল শিক্ষার্থীরা কাঙ্খিত শংসাপত্র পত্র হাতে পেলেন। বাংলা ভাষায় অ্যাডভেঞ্চার সংক্রান্ত পূর্নাঙ্গ অনলাইন ম্যাগাজিন নেই বললেই চলে। এই অভাব পূরন করতে গোর্কিসদনে এদিনই আত্মপ্রকাশ করলো 'আরোহী'। বাংলাভাষার পূর্নাঙ্গ অনলাইন অ্যাডভেঞ্চার ম্যাগাজিন।
[caption id="attachment_9023" align="alignright" width="300"]
সুদীপ্তা সেনগুপ্তের সঙ্গে বাংলার সফল এভারেস্ট আরোহণকারীরা[/caption]
এই অনুষ্ঠানে লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট পুরস্কার দেওয়া হলো বিশিষ্ট ভূতাত্বিক ও পর্বতারোহী শ্রীমতি সুদীপ্তা সেনগুপ্তকে। যিনি প্রথম ভারতীয় মহিলা হিসেবে অ্যান্টার্কটিকাতে পা রেখেছিলেন। সম্মানিত হলেন বাংলার পর্বতারোহনের নতুন প্রতিভা মহুয়া বিশ্বাসও।
অনুষ্ঠানটিতে ছিল বাংলা থেকে হওয়া এভারেস্ট সহ বিভিন্ন অভিযানের স্লাইড শো। পর্দায় পর্বতারোহী দীপঙ্কর ঘোষের পরিচালনায় ১৯৯১ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত বাঙালিদের এভারেস্ট অভিযানের ইতিবৃত্ত, চন্দন বিশ্বাসের ট্রান্স হিমালয়ান সোলো সাইক্লিং এক্সপিডিশন, পর্বতারোহী রুদ্রপ্রসাদ হালদারের চাম্বা হিমালয়ে অভিযান, পর্বতারোহী সত্যরূপ সিদ্ধান্তর সপ্তশৃঙ্গ অভিযানের স্লাইড শো এবং মডারেটরদের সাবলীল ধারাভাষ্য অনুষ্ঠানটিকে মনোজ্ঞ করে তুলেছিল।
অনুষ্ঠানটি একটি বিশেষ মাত্রা পায় বিশিষ্ট অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ভিডিও শুভেচ্ছা বার্তায়।শ্যুটিং থাকায় সৌমিত্র বাবু আসতে পারেননি। তাই তাঁর লিখিত ও ভিডিও শুভেচ্ছা বার্তায় অনুষ্টান ও বাংলার পর্বতারোহনের সর্বাঙ্গীন সাফল্য কামনা করলেন। অনেকেই জানেন না সৌমিত্র বাবু ১৯৯১ এর এভারেস্ট টিমের সঙ্গে নেপাল পর্যন্ত গিয়েছিলেন। অনুষ্ঠানটির শুরুও হয়েছিল চমক দিয়ে। অনুষ্ঠানটির জন্য গান বেঁধেছিলেন বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী প্রতুল মুখোপাধ্যায়। গানটি গেয়ে শুরুতেই অনুষ্ঠানের আবহকে বেঁধে দিলেন এভারেস্টের উচ্চতায়।
[caption id="attachment_9019" align="alignleft" width="300"]
অনুষ্ঠানের জন্য গান বেঁধে ছিলেন শিল্পী প্রতুল মুখোপাধ্যায়[/caption]
গোর্কিসদনের অনুষ্ঠানটি সফল করতে সোনারপুর আরোহী ও আইএমএফ-কে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলো বেশ কিছু পর্বতারোহন সংস্থা। যেমন বিএমসি অ্যাডভেঞ্চার(পুনে),নীলকন্ঠ অভিযাত্রী সংঘ, মাউন্টেনারস অ্যাসোসিয়েশন অফ কৃষ্ণনগর,আরোহণ ওয়ান্ডারলাস্ট, হাওড়া ডিস্ট্রিক্ট মাউন্টেনিয়ারস অ্যান্ড ট্রেকার্স অ্যাসোসিয়েশন, মাউন্টেন কোয়েস্ট অফ কলকাতা, বিজপুর পাইওনিয়ার এডভেঞ্চার সোসাইটি সহ অনান্য পর্বতারোহন সংস্থা।
বাংলার সিংহহৃদয় অভিযাত্রীদের দুঃসাহসী প্রচেষ্টাকে স্যালুট জানাতেই পশ্চিমবঙ্গের নবীন প্রজন্মের পর্বতারোহীরা গোর্কি সদনের অনুষ্ঠানটির আয়োজন করেছিলেন। অনুষ্ঠানটি আক্ষরিক অর্থেই বাংলা থেকে হওয়া এভারেস্ট সহ বিভিন্ন অভিযানের ও বিভিন্ন প্রজন্মের ট্রেকার ও পর্বতারোহীদের মিলন মেলা হয়ে উঠেছিল। অনুষ্ঠানটিতে, মতাদর্শগত ভাবে ভিন্ন মেরুতে অবস্থিত এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় যুযুধান বেশকিছু বাঙালি পাহাড়ি নক্ষত্রকে এক সাথে গল্পগুজব করতেও দেখা গেল। যা বাংলার পর্বতারোহনের ভবিষতের পক্ষে আশাব্যঞ্জক বলে মনে করছেন পর্বতপ্রেমীরা।