
শেষ আপডেট: 22 August 2019 15:25
জমে যাওয়া বৈকাল হ্রদ, সাইবেরিয়া[/caption]
মানুষের বসবাসের পক্ষে অনুপযুক্ত আবহাওয়া মনে হলেও এখানেই প্রায় এক লাখ বছর আগে মানুষের বসতি গড়ে উঠেছিল। সাইবেরিয়ার একটু উষ্ণ অংশের বিভিন্ন শহরে সভ্য ও আধুনিক মানুষ বাস করলেও, সাইবেরিয়ার বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করে বিভিন্ন উপজাতি সম্প্রদায় যারা আজও আদিম জীবনে অভ্যস্ত। যেমন 'ডলগ্যান'।
ডলগ্যান উপজাতি[/caption]
২০১০ সালের জনগণনায় জানা যায় প্রায় ৭৮৯০ জন ডলগ্যান সাইবেরিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে বাস করে। হাজার পাঁচেক ডলগ্যান ডুডিনকা নামে এক শহরের আশেপাশে বাস করলেও। প্রায় ২০০০ এর বেশি ডলগ্যান সাইবেরিয়ার একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাস করে। তুষারঝড় ও মৃত্যুশীতল তাপমাত্রায় প্রতিনিয়ত লড়াই করে বেঁচে থাকতে হয় তাদের। যাদের জীবনযাত্রা এক কথায় অবিশ্বাস্য।
উপযুক্ত জায়গায় গ্রাম পাতার জন্য এগিয়ে চলেছে ডলগ্যান উপজাতিরা[/caption]
কিছু কিছু ডলগ্যান গোষ্ঠীর স্থায়ী গ্রীষ্ম আবাস আছে। গ্রীষ্মের আবাসগুলি সাধারণত নদী বা জঙ্গলের ধারে হয়। সেগুলিও কাঠের তৈরি। শিকারের সময় বা খাদ্য সংগ্রহের সময় বা মরসুমি স্থানান্তরের সময় স্থায়ী বাড়িগুলি পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকে।
বহনযোগ্য শঙ্কু আকৃতির বাড়িগুলি সাধারণত একটি ঘরের ও বাক্স আকৃতির বাড়িগুলি দুটি ঘরের হয়। প্রতি পরিবারের একটি করে বাড়ি থাকে। পরিবারের ছেলের বিয়ের পর প্রথম সন্তান জন্মালে, ছেলেকে আলাদা বাড়ি বানিয়ে নিতে হয়। বাড়িগুলিতে একটা জানলা থাকে। ভেতরে সারাদিন চর্বির প্রদীপ জ্বলে। কার্বন-ডাই-অক্সাইড বের করে দেওয়ার জন্য বিশেষ নল থাকে।
[caption id="attachment_134655" align="aligncenter" width="702"]
ডলগ্যানদের স্লেজ দিয়ে টানা বাড়ির জানলায় ডলগ্যান শিশু[/caption]
সঙ্গে থাকা কয়েকশো বল্গা হরিণদের খাদ্য যেখানে পাওয়া যায়, সাধারণত সেখানেই অস্থায়ী গ্রাম পেতে ফেলে ডলগ্যানরা। আফ্রিকার মাসাই উপজাতির যেমন গরু, সাইবেরিয়ার ডলগ্যানদের তেমন বল্গা হরিণ। এই বিশাল শিংওয়ালা গড়ে আটশো কেজি ওজনের হরিণগুলির ওপর নির্ভর করেই বেঁচে রয়েছে ডলগ্যানরা। এই বল্গা হরিণরা যাযাবর ডলগ্যানদের খাদ্য ও বস্ত্র জোগায়। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় গোটা গ্রামকে স্লেজ গাড়িতে করে বহন করে নিয়ে যায়।
ডলগ্যানদের গ্রাম আবার পেশাগত ভাবে দুই ধরণের হয়। শিকারী ডলগ্যানদের গ্রাম ও পশুপালনকারী ডলগ্যানদের গ্রাম। শিকারীদের গ্রামে একাধিক পরিবার মিলে এক একটি শিকারের দল তৈরি করে। এরকম দশ বারোটি দল শিকারে বার হয়। শিকার করে বল্গা হরিণ, খরগোশ, শিয়াল, পাখি ও মাছ। বরফে গর্ত খুঁড়ে তার মধ্যে শিকার করা পশু,পাখি, মাছ রেখে দেয়। খাবার সময় প্রয়োজন মত প্রকৃতির ডিপ-ফ্রিজ থেকে বার করে নেয়।
[caption id="attachment_134868" align="aligncenter" width="964"]
বল্গা হরিণেরা চরে বেড়াচ্ছে,,পাহারায় আছে ডলগ্যানরা[/caption]
পশুপালনকারী ডলগ্যানদের আবার শহরে যাতায়াত আছে। তারা কাছাকাছি শহরে পশম ও চামড়া বেচে প্রয়োজনীয় খাবার দাবার, ওষু্ধ, বাসনপত্র কিনে আনে। কখনও কখনও দুটি ডলগ্যান গোষ্ঠী একে অপরের কাছ থেকে বিনিময় প্রথায় প্রয়োজনীয় জিনিসের আদানপ্রদান করে। এক একটি অস্থায়ী গ্রামে গ্রামবাসীর সংখ্যা ৫০ থেকে ৬০০ জন পর্যন্ত হতে পারে।
বরফে রেখে দেওয়া হয়েছে বল্গা হরিণের মাংস[/caption]
ডলগ্যানদের রান্নার পদ্ধতি খুবই সাধারণ। কয়েক ধরণের জড়িবুটি ফেলে মাছ বা মাংস সেদ্ধ করে তাতে একটু লবন ফেলে দেওয়া। বল্গা হরিণের দুধও খায় লবণ ফেলে। হিমায়িত কাঁচা মাছ বা পশুর মেটে পাতলা ফালি করে কেটে লবণ ছড়িয়ে কাঁচা খায়। চিনির ব্যবহার খুব কম এদের খাদ্যে। বরফে জমিয়ে তোলা দুধ ও চর্বির টুকরো সারাক্ষণ মুখে রেখে লজেন্সের মতো চুষে খায় ডলগ্যানরা।
[caption id="attachment_134664" align="aligncenter" width="652"]
লবণে জারানো কাঁচা মাছের টুকরো, খেতে হবে গাছের ডাল দিয়ে তৈরি কাঁটা দিয়ে[/caption]
ডলগ্যানরা সব সময় কোনও না কোনও কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে[/caption]
অন্যদিকে ডলগ্যান নারীরা পরিবারের জন্য খাবার বানায়। বিভিন্ন পশুর পশম ও চামড়া দিয়ে দিয়ে পোশাক, বিছানার চাদর, তাঁবু তৈরি করে। বল্গা হরিণের পায়ের চামড়া দিয়ে জুতো বানায়। বিভিন্ন পশু পাখির নাড়িভুঁড়ি শুকিয়ে ও পাকিয়ে এরা সুতোর কাজ চালায়।
নারীদের আরেকটি কাজ হল, গ্রামের নিরাপত্তারক্ষীদের দেখভাল করা। এক একটি অস্থায়ী ডলগ্যান গ্রামে পঞ্চাশ থেকে ষাটটা চুকচা বা হাস্কি প্রজাতির কুকুর থাকে। ভয়ঙ্কর বদমেজাজি কিন্তু পরিশ্রমী কুকুরগুলিকে ডলগ্যানরা প্রচণ্ড ভালবাসে। কুকুরগুলি গ্রামের নিরাপত্তা দেওয়া ছাড়াও প্রয়োজনে স্লেজ টানে ও চরার সময় বল্গা হরিণদের চোখে চোখে রাখে। যাতে কোনও বল্গা হরিণ দলছুট না হয়।
[caption id="attachment_134853" align="aligncenter" width="562"]
ডলগ্যানদের হাস্কি কুকুর[/caption]
ডলগ্যান সমাজে বয়স্ক নারী পুরুষদের কথাকে সবাই বেদবাক্য বলে মানা হয়। তাঁদের কাজ গ্রামবাসীদের মধ্যে একতা ধরে রাখা ও বিয়ের ঘটকালি করা। সাধারণত চারপুরুষ দূরের সম্পর্কে বিয়ে হতে বাধা নেই। তুতো ভাইবোনদের মধ্যেও বিবাহ হয়, তবে কম।
বিয়েতে কনেপক্ষ যৌতুক হিসাবে দেয় বল্গা হরিণ, মাছ ধরার নৌকা বা শহুরে বাসনপত্র। বিয়ে হয় কনের বাড়িতে। তিনদিন ধরে চলে খানাপিনা। আত্মীয়রা দূরদূরান্ত থেকে আসে স্লেজ গাড়ি চালিয়ে। .
প্রেম করে বিয়েও হয়। কিন্তু বিয়ের আগে বাড়ির সবচেয়ে বয়স্ক মানুষটির অনুমতি নিতে হবে। তিনি অনুমতি দিয়েই দেন কারণ এখনও ডলগ্যানদের সমাজে প্রেম করলে বিয়ে করা বাধ্যতামূলক।
[caption id="attachment_134857" align="aligncenter" width="556"]
ডলগ্যানদের আকাশে অরোরা বোরিয়ালিস[/caption]
জন্মের মতোই মৃত্যু আসে ডলগ্যানদের জীবনে। মৃত্যু্র পর মৃতদেহ দুদিন বাড়িতে শুইয়ে রাখা হয়। তৃতীয় দিন বিকেল বেলায় বরফের সমাধিতে শুইয়ে দেওয়া হয় মানুষটিকে। মৃত মানুষটি পুরুষ হলে সঙ্গে দেওয়া হয় তির ও ধনুক ও নারী হলে চিরুনি ও ছুঁচ সুতো।
পরবর্তীকালে সহজে চিহ্নিত করা যাবে এমন এক জায়গায় সমাধিস্থ করা হয় মানুষটিকে। সমাধির ওপরে কাঠ দিয়ে ক্রস চিহ্ন তৈরি করা হয়। সেই রাতে বল্গা হরিণের মাংসের ভোজ দেওয়া হয়। সন্তানেরা বল্গা হরিণের মাথাটা রেখে আসে হয় সমাধির ওপর।
হিমশীতল তুষারমরুর বরফের নীচে শুয়ে থাকে রুদ্ধশ্বাস ও লড়াকু জীবন শেষ করা এক ডলগ্যান। তিন বছর পর এই রুটেই ফিরে আসবে তার সন্তানেরা, সেই আশা নিয়ে।