
শেষ আপডেট: 16 October 2019 07:13
'মারফি বেবি' এবং মারফি রেডিও[/caption]
'মারফি রেডিও' ছিল একটি বিখ্যাত রেডিও ও টেলিভিশন নির্মাতা কোম্পানি। ইংল্যান্ডের ওয়েলউইনে ছিল এদের সদর দফতর। ফ্র্যাঙ্ক মারফি ও ইজে পাওয়ার ১৯২৯ সালে এই কোম্পানিটি তৈরি করেন, আধুনিক রেডিও সেটের বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান বাজার ধরার উদ্দেশ্য নিয়ে।
দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় মারফি রেডিও কোম্পানিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। যুদ্ধরত ব্রিটিশ সেনাদের কাছে খবর পৌঁছে দেওয়ার জন্য রেডিও সেট বানিয়েছিল। এই সেটগুলির মধ্যে জনপ্রিয় ছিল Wireless Set No. 38 সেটটি। এছাড়াও সমুদ্রপথে থাকা ব্রিটিশ নৌসেনাদের কাছে খবর পৌঁছনোর জন্য মারফি রেডিও বানিয়েছিল শক্তিশালী B40 সিরিজের রেডিও।
[caption id="attachment_150748" align="aligncenter" width="1215"]
নিজের কম্পানির বিজ্ঞাপনে ফ্র্যাঙ্ক মারফি[/caption]
কিন্তু কোনও অজ্ঞাত কারণে ফ্র্যাঙ্ক মারফি ১৯৩৭ সালে নিজের তৈরি করা কোম্পানি থেকে বেরিয়ে গিয়ে তৈরি করেন আরেকটি কোম্পানি। নাম দিয়েছিলেন 'FM Radio' বা ফ্র্যাঙ্ক মারফি রেডিও। ১৯৫৫ সালে ৬৫ বছর বয়সে ফ্র্যাঙ্ক মারফি প্রয়াত হন। কিন্তু বিশ্বজুড়ে তাঁর নামাঙ্কিত ব্র্যান্ড 'মারফি' রেডিও সেট রমরমিয়ে চলতে থাকে।
'মারফি' রেডিওর ঢেউ এসে পড়েছিল ভারতের বিশাল বাজারেও। একসময় ভারতের বাজার ছেয়ে ফেলেছিল 'মারফি' রেডিও। তখনকার দিনের জনপ্রিয় দুই চিত্রতারকা শর্মিলা ঠাকুর ও বৈজয়ন্তীমালাকে দেখা যেত মারফি রেডিওর বিজ্ঞাপনে। কিন্তু তারপর হঠাৎই সুপারহিট হয়ে যায় গালে আঙুল দেওয়া একটি শিশুর মুখ সম্বলিত বিজ্ঞাপন। যার নাম বা পরিচয় কখনও জানা যায়নি। জানা যায়নি সে ভারতীয় না বিদেশি।
[caption id="attachment_150750" align="aligncenter" width="236"]
মারফি রেডিওর বিজ্ঞাপনে ফ্র্যাঙ্ক মারফি[/caption]
কিন্তু কয়েকমাস পরে মারফি রেডিও শিশুটির মুখ বিজ্ঞাপন থেকে সরিয়ে নেয়। এর পিছনে ছিল অত্যন্ত দুঃখজনক একটি ঘটনা। অনেক পরে জানা গিয়েছিল বিজ্ঞাপনের শিশুকন্যাটির মৃত্যু হয়েছিল আকস্মিকভাবে। কিন্তু শিশুকন্যাটির বিজ্ঞাপন ছিল সুপারহিট। তাই মারফি রেডিও তখন হন্নে হয়ে ভারতজুড়ে খুঁজতে শুরু করেছিল প্রয়াত শিশুকন্যাটির মতো দেখতে একটি ভারতীয় শিশুর মুখ। যেটি হবে মারফি রেডিওর সিম্বল।
মারফি রেডিওর বিজ্ঞাপন বানাত যে কোম্পানি, তাঁদের লোকজন সারা ভারতে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। একজন ছিলেন মানালিতে। হঠাৎই তিনি দেখতে পেয়ে যান তিব্বত থেকে ভারতে আশ্রয় নেওয়া একটি পরিবারকে। তাঁদের সঙ্গে থাকা তিন বছরের একটি শিশুকে দেখে চমকে ওঠেন বিজ্ঞাপন নির্মাতার পাঠানো সেই কর্মী। আগের বিজ্ঞাপনের শিশুকন্যাটির সঙ্গে এই শিশুপুত্রটির হুবহু মিল। ব্যাস,বাকিটা ইতিহাস।
[caption id="attachment_150757" align="aligncenter" width="500"]
মন্দাকিনীর সঙ্গে 'মারফি' বেবি[/caption]
কয়েকদিনের মধ্যে সারা ভারতজুড়ে খবরের কাগজে, পত্রপত্রিকায়, হোর্ডিং-এ ঘুরতে লাগল তিন বছর বয়সী তিব্বতি শিশুটির ছবি। কিন্তু তখনও শিশুটির পরিচয় সামনে আসেনি। প্রকৃত পরিচয় জানা গেছিল ঘটনাটির ৩৭ বছর পর। কারণ শিশুটি ছবিটি তোলার পর কুড়ি বছর কাটিয়েছিল বৌদ্ধ মনাস্ট্রিতে। তিব্বতীদের ধর্মীয় আচার অনুসারে বংশের প্রথম সন্তানকে মনাস্ট্রিতে বাধ্যতামূলকভাবে পাঠাতে হয় ধর্মশিক্ষা ও বৌদ্ধ সংস্কৃতি প্রচার ও প্রসারের উদ্দেশ্যে। একই ঘটনা ঘটেছিল 'মারফি বেবি'র ক্ষেত্রেও।
২০ বছর পর মনাস্ট্রি থেকে যুবক হয়ে সংসারে ফিরে এসেছিলেন কাগিউর টুল্কু রিনপোচে। হয়ে উঠেছিলেন তিব্বতীয় ভেষজ চিকিৎসার বিশেষজ্ঞ। এরপর বেশ কিছু বছর কাটান মানালিতে। তারপর ভাগ্যের সন্ধানে চলে এসেছিলেন দিল্লিতে। এখানেই ঘটনাচক্রে দেখা হয়ে গিয়েছিল মন্দাকিনীর সঙ্গে।
[caption id="attachment_150759" align="aligncenter" width="600"]
মন্দাকিনীর প্রেমে পড়েন 'মারফি বেবি' কাগিউর টুল্কু রিনপোচে[/caption]
সেই মন্দাকিনী, যাঁকে রাজকাপুরের 'রাম তেরি গঙ্গা ময়লি' ছবিতে দেখা গিয়েছিল। দেখা গিয়েছিল দাউদ ইব্রাহিমের সঙ্গে শারজার ক্রিকেট মাঠের প্রেসবক্সে। ইয়াসমিন যোশেফ ওরফে মন্দাকিনী তখন হারিয়ে গিয়েছিলেন ছবির জগৎ থেকে। দাউদের সঙ্গে নাম জড়িয়ে যাওয়ায় সারাভারতে প্রায় একঘরে হয়ে দিন কাটছিল তাঁর।
আলাপ থেকে বন্ধুত্ব, সেখান থেকে প্রেম।মন্দাকিনীর সঙ্গে ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে বিয়ে হয়ে যায় রিনপোচের। কিছুদিন দিল্লিতে কাটিয়ে দম্পতি চলে যান মুম্বইতে।
[caption id="attachment_150761" align="alignnone" width="960"]
কাগিউরকে বিয়ে করলেন মন্দাকিনী[/caption]
[caption id="attachment_150765" align="alignnone" width="602"]
বিয়ের পর প্রথম গিয়েছিলেন দলাই লামার আশীর্বাদ নিতে[/caption]
[caption id="attachment_150775" align="aligncenter" width="660"]
স্ত্রী ও মেয়ের সঙ্গে কাগিউর[/caption]
মন্দাকিনী এখন মুম্বাইতে যোগা ক্লাস চালান। ডাঃ রিনপোচে চালান টিবেটান মেডিসিন হার্বাল সেন্টার। মাঝে মাঝে একমাত্র কন্যাকে নিয়ে ঘুরে বেড়ান লাদাখ হিমালয়ে। কখনও যান দলাই লামার আশীর্বাদ নিতে। প্রচারের আলোর থেকে অনেক অনেক দূরে আজ তাঁদের দিন কাটে ।