
শেষ আপডেট: 3 May 2019 18:30
ক্ষতি হয়েছে বিস্তর। এই দামাল ঝড়ের এক একটা ঝাপটায় লণ্ডভণ্ড হযে গেছে রাজ্য। তছনছ হয়ে গেছে মন্দিরনগরী পুরী। তবে প্রাণহানি রোখা গেছে অনেকটাই। কারণ এই দীর্ঘ ২০ বছরের জার্নিতে ওড়িশা অনেকটাই পরিণত। মৃত্যুর যে নির্মম রূপ এককালে সে দেখেছে, তার আর পুনরাবৃত্তি হতে দেয়নি সে। আগেভাগেই কোমর কষে নেমে পড়েছিলেন প্রশাসনিক কর্তা, আবহাওয়াবিদ থেকে স্থানীয় মানুষজন।
ফণীর ‘ল্যান্ডফল’ যে পুরী, তার সতর্কবার্তা আগেই দিয়েছিলেন আবহাওযাবিদেরা। পাশাপাশি উপকূলবর্তী শহর ভুবনেশ্বর, কটক, জাজপুর, ভদ্রক-সহ সর্বত্রই জারি হয়েছিল সতর্কতা। ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় প্রস্তুতির অভাব ছিল না। ফণী ছোবল মারার ৪৮ ঘণ্টা আগে থেকেই তৎপর ছিল প্রশাসন। প্রায় ১১ লক্ষ মানুষকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল নিরাপদ স্থানে। সতর্কতার জন্য রাজ্যের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল। বিপর্যয় মোকাবিলা দল, স্বেচ্ছাসেবী শিবির মিলিয়ে প্রস্তুত ছিল ৪৩,০০০ মানুষ, অন্তত হাজার খানেক লোককে আপৎকালীন অবস্থার জন্য তৈরি রাখা হয়েছিল। পুলিশ, নৌসেনা, হেলিকপ্টার উড়িয়ে বায়ুসেনা, উপকূলরক্ষী বাহিনী ঘিরে রণসাজে যুদ্ধজয়ের প্রস্তুতি ছিল তুঙ্গে।

“আমরা পেরেছি। খুব কম জায়গায় এমন উচ্চস্তরের প্রস্তুতি দেখা যায়,”বলেছেন প্রাক্তন নৌসেনা কর্মী অভিজিৎ সিং। তাঁর কথায়, ঘণ্টায় ১৭৫-২০০ কিলোমিটার বেগে ঘূর্ণিঝড় যখন স্থলভূমিতে উঠেছিল, তখন প্রশাসনিক নির্দেশ মেনেই রাস্তায় বার হননি কেউই। হাতে গোনা মানুষজন আর গাড়ি চলতে দেখা গেছে রাস্তায়।
আবহাওয়া দফতরের হিসেব অনুযায়ী, ঠিক আটটা নাগাদ চারদিক লন্ডভন্ড করে দিয়ে পুরো শক্তি নিয়ে পুরীতে থাবা বসায় ফণী। চারদিকে তখন শুধু বালির ঝড় আর বৃষ্টি। খড়কুটোর মতো সব কিছু হাওয়ায় এদিক ওদিক ভাসছে। ভুবনেশ্বরে ঝড় গতি ছিল ১৪০ কিলোমিটার গতিতে। পরে কটক ও জাজপুরের কাছে সেই গতি কমে ১০০ কিলোমিটারের কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ায়। ওড়িশার স্পেশাল রিলিফ কমিশনের সূত্র অনুযায়ী, শনিবার পর্যন্ত মোট ১৬ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে। জলে প্লাবিত হয়ে রয়েছে নীচু এলাকাগুলি। বিদ্যুৎ ও মোবাইল সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তবে মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়ক জানিয়েছেন, দ্রুত মেরামতির চ্যালেঞ্জ নিয়ে দিন-রাত কাজ করছেন কর্মী ও ইঞ্জিনিয়ারেরা।
ওড়িশার স্পেশাল রিলিফ কমিশনার বিষ্ণুপুরা শেট্টির কথায়, "এই দুর্যোগের মোকাবিলা করা ছিল আমাদের কাছে একটা চ্যালেঞ্জ, কমিটমেন্ট। আমরা ঠিক করেছিলাম একটাও প্রাণহানি হতে দেওয়া যাবে না। সেদিক থেকে আমরা অনেকটাই সাফল্য পেয়েছি।"
একতা। ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস। সেখানে নাক গলাতে ভয় পেয়েছে ঝড়ের ভ্রুকুটিও। তছনছ হয়েছে শুধু বাইরেটা, সেটা খুব দ্রুত সামলে উঠবে বলেও জানিয়েছে ওড়িশা প্রশাসন। ভারতের আবহাওয়া দফতরের নির্ভুল তথ্য এবং আগাম সতর্কতাকে কৃতিত্ব দিয়েছে রাষ্ট্রপুঞ্জও। তাদের তরফে বলা হয়েছে, বিপর্যয়ের ঝুঁকি আগে থেকে বুঝতে পারাই শুধু নয়, তা নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে ওড়িশা। একটা ছোট্ট রাজ্য, যেখানে অধিকাংশ মানুষই দারিদ্যসীমার নীচে। পর্যটনকে কেন্দ্র করেই প্রাণ পায় রাজ্যের উপকূলবর্তী শহরগুলি, সেখানে নিরাপত্তার এমন বজ্র বেষ্টনী ও প্রশাসনিক তৎপরতা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। এই প্রয়াস হার মানিয়ে দেয় যে কোনও শক্তিশালী ও বিত্তশালী রাষ্ট্রকেও।