
শেষ আপডেট: 3 July 2019 18:30
গতকাল সন্ধে থেকেই সেজে উঠেছে পুরীর আনাচ কানাচ। গ্র্যান্ড রোডে ভিড় সামলাতে রাখা হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। এ দিন ভোর রাত থেকেই সিংহদুয়ারের সামনে জমা হয়েছে মেলা ভিড়। গর্ভগৃহ থেকে জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রাকে বার করে আনার মুহূর্তের সাক্ষী থাকতে চান প্রায় সব ভক্তই। যাঁরা যে সুযোগ থেকে বঞ্চিত, তাঁরা স্বর্গদ্বারের রাস্তায় জমায়েত হয়েছেন একবার রথের দড়ি ছোঁবেন বলে।
আমেরিকার ইস্কন থেকে রথের-পুরীতে এসেছেন গুরুপ্রভ দাসী। বলেছেন, “শ্রীপ্রভুকে দর্শন করার জন্য আমি ব্যাকুল হয়ে আছি। অহিন্দুদের প্রবেশাধিকার নেই মন্দিরে। তাই রাস্তাতেই অপেক্ষা করছি একবার ভগবানকে চোখের দেখা দেখব বলে।”
দেশ-বিদেশ থেকে বহু মানুষ জমা হয়েছেন পুরীতে। হোটেল, লজ, হলিডে হোমে প্রায় ঠাঁই নেই বললেই চলে। সমু্দ্রের ধারে খোলা প্রান্তরে বা অস্থায়ী শিবিরে বিনিদ্র রাত কাটিয়ে জগন্নাথের পথের আনাচ-কানাচের গলিঘুঁজিতে অপেক্ষা করছেন বহু মানুষ। একবারটি রথে প্রভুকে দর্শনের আশায় সকাল থেকেই বড় দাণ্ডের কিনারে হত্যে দিয়ে পড়ে আছেন তাঁরা। মন্দিরের একেবারে মুখটায় রথ তিনটির কাছাকাছি বড় দাণ্ডের অংশ ঘিরে রয়েছে বিরাট পুলিশবাহিনী। সেটাই ভিআইপি-জোন। পুলিশের ডিরেক্টর জেনারেল আর পি শর্মার কথায়, “পুরীর নানা জায়গায় অস্থায়ী সিসিটিভি ক্যামেরা বসান হয়েছে। পুলিশের মোট ১৫৫টি টিম কাজ করছে, নামানো হয়েছে র্যাফও। বাইরে থেকে আসা ভিআইপিদের সুরক্ষার জন্যও রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। পুরীতে আজ নিরাপত্তা ব্যবস্থা আঁটোসাঁটো।”
প্রাচীন উপকথা বলছে, মালবের রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন বিষ্ণুর একটি রূপ নীলমাধবের খোঁজে শামিল হতেই জগন্নাথের সন্ধান মেলে। ইন্দ্রদ্যুম্নের ব্রাহ্মণ পুরোহিত বিদ্যাপতি শবররাজ বিশ্বাবসুর বাড়িতে থাকাকালীনই জানতে পারেন, শবরেরা সেই দেবতার পুজো করেন। ইতিহাসবিদেরাও বলেন, শবরজাতির দেবতা নীলমাধবকেই পরে জগন্নাথ রূপে প্রতীষ্ঠা করা হয়েছিল। জগন্নাথ সেবাতেও তাই দয়িতাপতি বলে পরিচিত এক শ্রেণির শবর বংশোদ্ভূতদের অধিকার বহাল রয়েছে।
গোটা পুরীধামে কাছের-দূরের বিভিন্ন জনপদ থেকে আগত অগণিত ভক্ত অবশ্য কোনও পরিচয়পত্রের তোয়াক্কা করেন না। রথ দেখা হবে কি হবে না, রশি স্পর্শ করা হবে কি হবে না সে খেয়াল না রেখেই প্রবল ভিড়ে ভিড়াক্কার শ্রীক্ষেত্রে পা রাখেন অনেকেই। রাতভর দলে দলে লোকে নামগান, কীর্তন করেন। ভক্তের সমর্পণের এই আবেগ মাথায় রেখেই পুরীর রথ ঘিরে এক অন্য আবেগ তৈরি হয়। প্রথমে জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রার সঙ্গী কাঠের একটি দণ্ড বা সুদর্শনকে সুভদ্রার রথে তোলা হয়। তারপরে বোন সুভদ্রা, দাদা বলভদ্র এবং সব শেষে জগন্নাথ রথে চাপেন। নারীবেশী পুরুষের দল প্রভুর সামনে একনাগাড়ে গোটিপুয়া লোকনৃত্য পরিবেশন করেন। রথ ছাড়তে মোটামুটি বিকেল হয়। ভিআইপি-রা রথেই প্রভুকে দর্শনের জন্য আসেন। তারপরে মাঝদুপুরে হয় ছেরা পহরা। সোনার ঝাড়ু নিয়ে পুরীর গজপতি রাজা পথ পরিষ্কার করেন। এর পরে একে-একে ছাড়ে বলভদ্র, সুভদ্রা ও জগন্নাথের রথ। আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে ভক্তগন বলে ওঠেন, 'জয় জগন্নাথ।'