দ্য ওয়াল ব্যুরো: সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয়েছে এক ভার্চুয়াল মানববন্ধন। 'হোয়্যার ইজ় কাজল'। ৮ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই মানববন্ধনের পেছনে রয়েছে এক রহস্যজনক ঘটনা। গত ১০ মার্চ থেকে নিখোঁজ পড়শি দেশ বাংলাদেশের ঢাকা শহরের এক আলোকচিত্রী ও সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজল। ৪০ দিন পার হতে চলল, কিন্তু এখনও কোনও রকম খোঁজ মেলেনি তাঁর! সন্দেহ করা হয়েছে, অপহরণ করা হয়েছে তাঁকে। কিন্তু এখনও কোনও সূত্র মেলেনি।
কাজলের ছেলে মনোরম পলক জানিয়েছেন, গত ১০ মার্চ পুরনো ঢাকার বক্সীবাজারের বাড়ি থেকে কাজে বেরিয়েছিলেন কাজল। তার পর থেকেই আর যোগাযোগ করা যায়নি তাঁর সঙ্গে। পলকের মা অর্থাৎ কাজলের স্ত্রী জুলিয়া পরের দিনই থানায় নিখোঁজ ডায়েরি লেখান। কিন্তু কোনও রকম খোঁজ দিতে পারেনি পুলিশও। কাজল যেন হাওয়ায় মিলিয়ে যান! এর পরে ১৮ মার্চ অজ্ঞাতপরিচয় অপরাধীদের বিরুদ্ধে অপহরণের মামলা করেন পলক। বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে সমালোচনামূলক লেখালেখির জন্য কেউ তাঁকে অপহরণ করেছে বলে সন্দেহ প্রকাশ করে মামলা করেন তিনি।
এর পরেই সোশ্যাল মিডিয়া মারফত ছড়িয়ে পড়ে কাজলের হারিয়ে যাওয়ার খবর। তাঁকে খুঁজে বের করার আহ্বান জানায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ফোরাম অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও।

কাজলের পরিবার জানিয়েছে, মেহেরপুরের আদি বাসিন্দা কাজল বাম রাজনীতির সমর্থক। একাত্তরের বীরাঙ্গনাদের সাক্ষাৎকারভিত্তিক একটি বই-ও লেখেন তিনি। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রথম সারির সংবাদমাধ্যমে কাজ করেছেন। অভিযোগ, কাজলের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না পুলিশ। পলক বলেন, "সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, কয়েক জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি সন্দেহজনক আচরণ করছে। অথচ পুলিশ ওই ফুটেজে রহস্যময় কিছুই দেখছে না।"
ওই ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, মোটরসাইকেলে করে হাতিরপুলের মেহের টাওয়ারে তাঁর অফিসের সামনে পৌঁছন কাজল। এর পরে তাঁর বাইকটির আশপাশে বেশ কয়েকজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে সন্দেহজনক ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। ওই দিনই সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায় কাজল তাঁর পত্রিকার অফিস থেকে বেরিয়ে মোটরসাইকেলে উঠলেন। এর পর থেকে তিনি নিখোঁজ। পুলিশ এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না বলে অভিযোগ পলকের। পুলিশ জানিয়েছে, কাজলের কোনও সন্ধান মেলেনি, তাঁর ফোনও বন্ধ ওই দিন থেকেই। কোনও সূত্রই নাকি মিলছে না।

অথচ কাজলের পরিবারের দেওয়া তথ্যে দুটো গুরুত্বপূর্ণ সূত্র রয়েছে, যার সঙ্গে এই অপহরণ জড়িত বলেই মনে করছেন অনেকে। জানা গেছে, নিখোঁজ হওয়ার ঠিক আগের দিন অর্থাৎ গত ৯ মার্চ রাত ১১টা ৫৫ মিনিটে কাজল-সহ ৩১ জনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একটি মামলাটি করেন আওয়ামী লীগের এক সাংসদ। এর পরের দিন ১০ মার্চ কাজল নিখোঁজ হওয়ার তিন ঘণ্টার মাথায়, রাত ১০ টা ১০ মিনিটে ফের কাজলের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে দ্বিতীয় মামলাটি করেন আওয়ামী লীগের আর এক নেতা।
এই বিষয়গুলি তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে কাজলের পরিবার। কাজলের ২০ বছরের ছেলে মনোরম পলকের লেখা একটি চিঠি ইতিমধ্যেই ভাইরাল হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়।
সে চিঠির একটি অংশে পলক লিখেছেন, "আমি তোমাকে ফেরত আনার চেষ্টা করছি। অনেকে বলছেন, আমি ছেলে হিসেবে অনেক করছি। আমি ছেলে হিসেবে পর্যাপ্ত করেছি, এ কথা তখনই ভাবতে পারব যখন তোমাকে আমাদের মাঝে আবার ফেরত পাব। কেউ কেউ বলছেন, আমার মতো ছেলে তাদের যদি থাকত! পিতামাতাকে তাদের সন্তানের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিলে যে কোন সন্তানই তাদের পিতামাতাকে ফেরত পাওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করবে। আমিও তাই করছি। আমি আমার বাবা-মা কে চিনি। আমি জানি না আমার বাবা-মা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা-মা কিনা। কিন্তু আমি জানি, তোমাদের থেকে শ্রেষ্ঠ বাবা-মা আমার কখনও হতে পারত না। আমি সবসময়ই জানতাম, তোমার আর মার আমার থেকে যোগ্য সন্তান প্রাপ্য ছিল। পিতাকে নিয়ে চলে যাওয়ার ২০ দিন পরেও যে সন্তান তার পিতাকে ফিরিয়ে আনতে পারেনি, সন্তান হিসেবে তার যোগ্যতা কী? এমন ছেলে থেকে কী লাভ?"

এই চিঠি ভাইরাল হওয়ার পরেই সারা দুনিয়ার নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে কাজলের খবর। এতগুলো দিন ধরে একজন সাংবাদিক কোথায় আছেন, কী করছেন, সে বিষয়ে প্রশাসন কেন কোনও তথ্য পাচ্ছে না, প্রশ্ন উঠেছে আন্তর্জাতিক মহলে। স্বাধীনচিন্তার লেখালেখির মাসুলই কি দিতে হচ্ছে কাজলকে? এমনটাই আশঙ্কা অনেকের।