
শেষ আপডেট: 12 May 2022 12:44
তখন বাঙালির জামাই ষষ্ঠী বা ভাইফোঁটার বিকেল মানেই ছিল সারা পরিবার মিলে সিনেমাহলে বাংলা ছবি দেখতে যাওয়া। উৎসব মানেই তখন নতুন বাংলা ছবির রমরমা। দেওয়াল জোড়া পরের পর সিনেমার পোস্টার। কিংবা কলেজ কেটে কোনও মতে পকেটের খুচরো পয়সা গুনে নতুন হিন্দি ছবি দেখতে সোজা সিনেমা হল। সত্তর, আশি এমনকি নব্বইয়ের দশকেও এই চিত্র ছিল খুবই পরিচিত। তখন সিঙ্গেল স্ক্রিনে ছবি দেখা যেন স্বর্গ। আর যদি অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে কর্নার সিট পাওয়া যায়, একটা সুযোগ পাওয়া যায় বান্ধবীর হাতে হাত রাখার, তাহলে তো একেবারে কেল্লাফতে!
তবে এ সব এখন প্রায় অতীত। এখন মধ্যবিত্ত শিক্ষিত বাঙালি সারা পরিবার মিলে বাংলা ছবি দেখতে কমই যায়। বহু গুণে বেড়েছে টিকিটের দাম, সিনেমা দেখার খরচ। সিঙ্গেল স্ক্রিনের পরিবর্তে মাল্টিপ্লেক্সের রমরমা। কিন্তু তা যেন সেই আগের মতো আপন নয়। সিঙ্গেল স্ক্রিনে ছবি দেখার সেই নস্ট্যালজিয়া যেন আজও অমলিন। কিন্তু সেখানে ফিরে যাওয়ার রাস্তাটি আজ বন্ধ। বন্ধ হয়ে গেছে চিরপরিচিত সিনেমাহল পাড়া। সিঙ্গেলস্ক্রিনগুলো যেন ভূতুড়ে বাড়ি।
উত্তরের শ্রী, দর্পণা, রূপবাণী, ছায়া, মিত্রা বন্ধ। দক্ষিণের ভারতী, পূর্ণ, ভবানীও তাই। অথচ এসব সিঙ্গেলস্ক্রিন সিনেমাহলে দশকের পর দশক রমরমিয়ে চলেছে সব সুপারহিট ছবি। করোনা আর লকডাউনের প্রভাবে চালু সিঙ্গেলস্ক্রিনগুলোও হয়েছে তালাবন্ধ। নেই ফেরার পথ। কিন্তু টাইমমেশিনে চড়ে সেইসব সিঙ্গেলস্ক্রিনের সোনালি অতীতে যদি ফেরা যায়? জানা যায় সব নস্ট্যালজিক ইতিহাস? কেমন হয়?
সেই ভাবনা থেকেই দুই আন্তর্জাতিকখ্যাতিসম্পন্ন বাঙালি ফটোগ্রাফার করতে চলেছেন স্থিরচিত্রের প্রদর্শনী (Exhibition)। সাত্যকি ঘোষ ও অমিত ধর, দুই ফটোগ্রাফারের যৌথ উদ্যোগে শুরু হচ্ছে স্টিল ফটোগ্রাফির চিত্রপ্রদর্শনী-- 'কার্টেন ক্লোজেস'। '8×6' গ্যালারিতে চলবে প্রদর্শনী। বিষয়, কলকাতা ও মুম্বইয়ের বন্ধ হয়ে যাওয়া সিনেমাহলের গল্প, যা পর্দা পড়ে যাওয়া সিনেমাপাড়ার শেষ দলিল।

সাত্যকি ঘোষের বাবা হলেন প্রবাদপ্রতিম ফটোগ্রাফার নিমাই ঘোষ। তিনি সত্যজিৎ রায়ের ফটো-বায়োগ্রাফারও। সাত্যকি কালীঘাটের ছেলে হলেও তাঁর কাজের পরিধি টলিউড ও বলিউড। সেই সঙ্গে দুই মেট্রো শহর কলকাতা ও মুম্বইয়ের অতীত দিনের গল্প ধরা আছে সাত্যকির ক্যামেরায়। কলকাতার রূপবাণী, ছায়া, মিত্রা, ভবানী-- যেসব সিনেমাহলের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ, নেতাজি, অবনীন্দ্রনাথ, সত্যজিৎ রায়ের নাম জড়িত, সেসব বন্ধ হয়ে যাওয়া সিনেমাহলের ছবি থাকবে এই প্রদর্শনীতে (Exhibition)।
সাত্যকি ঘোষের শ্বশুরমশাই বেহালার একসময়ের জনপ্রিয় সিঙ্গেলস্ক্রিন 'পুষ্পশ্রী'র কর্ণধার। শুধু তাই নয়, সাদা-কালোয় বম্বের নিষিদ্ধ পল্লি 'নিউ রোশন টকিজ'-এর সব অসাধারণ ডকুমেন্টেশন করে রেখেছেন সাত্যকি। কামতাপুরির এই সিঙ্গেল স্ক্রিন সিনেমাহলটি সিনেমা ইতিহাসের শেষ দলিল বলা চলে, যা এই প্রথম দেখা যাবে এই প্রদর্শনীতে।

সাত্যকি ঘোষ 'দ্য ওয়াল' কে জানালেন, 'আমরা দুই সিনেমাপ্রেমী ফটোজার্নালিস্ট এই 'কার্টেন ক্লোজেস' প্রদর্শনী (Exhibition) করছি।' অমিত ধর আবার মনে করেছেন, এইসব ছবিগুলো সিঙ্গেল স্ক্রিন সিনেমাহলের ইতিহাসে শেষ দলিল। আজকে দশ টাকার টিকিট পাবেন না, আজকাল সিনেমার বিরতিতে বেরোলে দিনের আলো দেখতে পাবেন না। মাল্টিপ্লেক্সে তো দিনের আলো দেখা যায় না। সে দুপুরে যান কিংবা মধ্য রাতে যান, সবই এক। প্রকৃতি আর সিনেমাকে এক করা যায় না আজকাল। সেইসব হারানো দিনের গল্প থাকবে এই প্রদর্শনীতে।'

ফটো জার্নালিস্ট অমিত ধরের কেরিয়ার সুদীর্ঘ ৪২ বছরের। দীর্ঘদিন তিনি প্রথমসারির সংবাদপত্রে ফটোজার্নালিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন। তাঁর ভাবনা ও পরিশ্রমের ফসলে সৃষ্টি হয়েছে অসাধারণ সব স্থিরচিত্র। আশি-নব্বই দশকের কলকাতার গল্প ধরা আছে তাঁর ক্যামেরায়।
এই দুই ফটোগ্রাফারের চোখ দিয়ে প্রদর্শনীতে (Exhibition) উঠে আসবে বদলে যাওয়া কলকাতার চিত্র। শহরটা দেখতে কেমন পাল্টে যাচ্ছে, কেমন ভাবে বদলে যাচ্ছে কলকাতা ও মুম্বই, দেখা যাবে এই প্রদর্শনীতে। এর মূল বিষয় লুপ্ত হওয়া ছবিঘরের স্থিরচিত্র।
অমিতই প্রথম সাত্যকিকে এই প্রদর্শনী করার প্রস্তাব দেন। ছোট ফ্রেমে ছোট ছবি দিয়ে, সাত্যকির অসাধারণ অ্যানালগ রয়েছে স্টুডিওতে। সেই ভাবনা থেকেই এই প্রদর্শনী করার পরিকল্পনা। সঙ্গে উপরি পাওনা, '8×6' সাত্যকি ঘোষের প্রথম ফটো স্টুডিও, যার পথ চলা শুরু হবে এই প্রদর্শনী দিয়েই।

আগামী রোববার, ১৫ মে, '8×6' গ্যালারিতে 'কার্টেন ক্লোজেস' প্রদর্শনী (Exhibition) শুরু হচ্ছে। সাত্যকি ঘোষ ও অমিত ধরের দীর্ঘ কেরিয়ারে তোলা পুরনো সিঙ্গেলস্ক্রিনের স্থিরচিত্র দেখতে পাওয়া যাবে, যা এক দুষ্প্রাপ্য প্রদর্শনী হতে চলেছে। উদ্বোধন করবেন সত্যজিৎ রায়ের পুত্র সন্দীপ রায়। ২৯ মে পর্যন্ত চলবে এই প্রদর্শনী, রোজ বিকেল ৩টে থেকে সন্ধ্যে ৭টা অবধি।
'8×6' গ্যালারির ঠিকানা: ১০২/এ বালিগঞ্জ প্লেস, কলকাতা ১৯। 'পাঠ ভবন' স্কুলের পাশেই।
সিঙ্গেল স্ক্রিনের এমন স্থিরচিত্র প্রদর্শনীতে একবার ঢুঁ মেরে আসতেই পারেন, ফিরে পাবেন হারানো ছেলেবেলা থেকে যৌবনবেলার দিনগুলো।