
শেষ আপডেট: 4 September 2023 10:26
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাসে, ট্রেনে, অথবা রাস্তার সিগন্যালে প্রায়ই দেখা যায় তাঁদের। যাত্রীদের কাছ থেকে টাকা চান তাঁরা। তাঁদের পরিচয় তাঁরা রূপান্তরকামী (Ruplekha Singha roy social worker)। বহু লড়াইয়ের পরও আজকের দিনেও সমাজ পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারেনি এই মানুষগুলিকে। আইন তাঁদের খাতায় কলমে মান্যতা দিলেও সাধারণ মানুষের একটা বড় অংশের চোখে আজও ব্রাত্য হয়েই রয়ে গেছেন তাঁরা।
কীভাবে 'বিষ্ণুপ্রিয়া প্রজেক্ট' শুরু করার কথা মাথায় এল? (Ruplekha Singha roy social worker)

আমি ছোটবেলা থেকেই পড়াতে ভালবাসতাম। সেই কারণে শিক্ষকতার পেশায় যাওয়ার ইচ্ছা ছিল। সমাজের জন্য কিছু করব এই বিষয়টা ছোট থেকেই মাথায় ঘুরত আমার। সেই ভাবনা থেকেই প্রথম শুরু করি ছোট ছোট বাচ্চাদের পড়ানো। আমি ১০ বছর ধরে এনজিওর সঙ্গে যুক্ত। অবহেলিত, বঞ্চিত নারী এবং শিশুদের নিয়ে আমি দীর্ঘদিন ধরেই কাজ করছি। তবে আমার বরাবরই মনে হত, রূপান্তরকামীদেরও সমাজের মূলস্রোতে ফেরানো দরকার। তাঁদের জন্য কিছু করা দরকার। সেই ভাবনা থেকেই এই 'বিষ্ণুপ্রিয়া প্রজেক্ট'এর কথা মাথায় আসে।
এই প্রজেক্ট যখন শুরু করলেন তখন কোনও রকম বাধাবিপত্তির সম্মুখীন হয়েছিলেন?
দেখুন যে কোনও ভাল কাজ শুরু করতে গেলেই প্রথমে তো বাধাবিপত্তি আসেই। আমি সেই অর্থে তেমন কোনও অন্য বাধার সম্মুখীন হইনি। তবে রূপান্তরকামীদের সঙ্গে কানেকশন তৈরি করাই ছিল আসল চ্যালেঞ্জ। কীভাবে তাঁদের সঙ্গে কথা বলব, ঠিক কীভাবে বোঝালে আমাকে ওঁরা বিশ্বাস করবেন এই বিষয়গুলিই আমাকে ভাবাত। আসলে ওঁরা যেহেতু সাধারণত ভাল ব্যবহার খুব একটা পান না, মানুষকে সহজে বিশ্বাস করতে ভয় পান ওঁরা। ফলে, সমাজের মূলস্রোতে তাঁদের ফিরিয়ে আনার জন্য যে লেখাপড়া শেখা দরকার, আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হওয়া দরকার সেকথা বোঝাতে প্রথম দিকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত এই চ্যালেঞ্জে আমরা জয় লাভ করেছি। এই মুহূর্তে আমাদের এনজিওর চারজন কাঁকুড়গাছির ল্যাকমে অ্যাকাডেমিতে পেশাদার কোর্সের ট্রেনিং নিচ্ছে।
বিষ্ণুপ্রিয়া প্রজেক্ট নামটা দেওয়ার কারণ কী?

দেখুন 'বিষ্ণুপ্রিয়া' মানে তো লক্ষ্মী। আর আমরা জানি যে লক্ষ্মী কিন্তু অর্থের দেবী। রূপান্তরকামীদের সমাজের মূল স্রোতে ফেরার জন্য যেটা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তা হল রোজগার করা এবং অবশ্যই তা সম্মানজনক উপায়ে। সেই কথা মাথায় রেখেই এই প্রজেক্টের নাম দেওয়া হয়েছে 'বিষ্ণুপ্রিয়া' প্রজেক্ট। আমাদের লক্ষ্য এই প্রজেক্টের মাধ্যমে যত বেশি সংখ্যক সম্ভব রূপান্তরকামীকে নিজের পায়ে দাঁড় করিয়ে, আর্থিক ভাবে স্বচ্ছল করিয়ে সমাজের মূলস্রোতে ফেরানো।
ইদানীং রূপান্তরকামীদের নিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বহু আলোচনা হচ্ছে, কয়েকদিন আগে 'তালি' নামে একটি ওয়েব সিরিজও মুক্তি পেয়েছে। আপনার কি মনে হয় আদৌ সমাজ যথেষ্ট পরিমাণ সংবেদনশীল হয়েছে রূপান্তরকামীদের প্রতি?
দেখুন সচেতনতা বা সংবেদনশীলতা যাই বলুন তা একটা সময়ে বাড়তেই হত। চিরকাল এক শ্রেণির মানুষ সমাজে ব্রাত্য হয়ে থেকে যাবে এটা হতে দেওয়া যায় না। সমাজের অন্যান্যদের মতোই রূপান্তরকামীদেরও সমান সুযোগ সুবিধা পাওয়ার অধিকার আছে এটা মানুষকে বুঝতে হবে। ভগবান ওঁদের যখন মানুষ হিসেবেই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন তখন মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার প্রাথমিক চাহিদাগুলি আমরা কোনওভাবেই কেড়ে নিতে পারি না। আমার ভাল লাগে এটা দেখে যে এখন অনেক মানুষ এই নিয়ে কথা বলছেন, ওঁদের নিয়ে ছবি তৈরি হচ্ছে। আমার তো নিজেরই মাঝেমধ্যে মনে হয় আমিই হয়তো একজন রূপান্তরকামী। এটা ভাবলে ওঁদের লড়াইটার সঙ্গে আমি আরও বেশি করে নিজেকে রিলেট করতে পারি। ওঁদের লড়াইটা আমার নিজের লড়াই মনে হয়। আমার ধারণা 'তালি' ছবিটা দেখে আরও অনেক মানুষ বুঝবেন ওঁদের লড়াইটা।
ছবি তৈরি হলেও এখনও কি সাধারণ মানুষ সমান চোখে দেখেন রূপান্তরকামীদের, কী মনে হয় আপনার?
দেখুন সাধারণ মানুষ যে কোনও বিষয় জেনারালাইজ করতে ভালবাসে। যে কোনও ক্ষেত্রেই ব্যতিক্রমী কোনও কিছু মানুষের সহজে মেনে নিতে অসুবিধা হয়। এই যেমন অনেকে মনে করেন সমস্ত বাঙালি মাছ খেতে পছন্দ করে অথবা সমস্ত মাড়োয়ারি দুর্দান্ত ব্যবসায়ী। আসলে এগুলো জেনারালাইজেশন ছাড়া কিছুই না। ঠিক তেমন ভাবেই অনেকেই সমস্ত রূপান্তরকামীদেরই একই গোষ্ঠীর মনে করেন, তাঁদের থেকে দূরে সরে থাকেন। আসলে তাঁদের এই ভাবনা যে ভুল তা তাঁরা একদিন নিশ্চয়ই বুঝবেন, আমরা বোঝানোর চেষ্টা করছি।
আপনার এনজিওতে এই মুহূর্তে কতজন রূপান্তরকামী রয়েছেন? কী কী ভাবে সাবলম্বী করা হচ্ছে তাঁদের?

দেখুন এই মুহূর্তে আমার এনজিওতে রূপান্তরকামীর সংখ্যা ২৫। তাঁরা প্রত্যেকেই নিজের পায়ে দাঁড়াতে চান। এর মধ্যে অনেকেই গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করেছেন। তবে সমস্যা হল তাঁদের কোনও অফিস নিতে চায় না। অথবা নিলেও কর্মক্ষেত্রে নানা ভাবে অপদস্থ করা হয় তাঁদের। আমরা তাঁদেরকে সেভাবেই প্রশিক্ষণ দিই যাতে এই ধরনের সমস্যা তাঁরা মোকাবিলা করতে পারেন। তবে মানুষকেও আরও একটু সংবেদনশীল হতে হবে। ওদেরকে যে বিচ্ছিন্ন করে রাখা উচিত নয় সেটা আমাদেরও বোঝার সময় এসেছে।
আগামীদিনে লোটাস অর্থাৎ আপনার এনজিওকে ঘিরে আপনার কী কী পরিকল্পনা রয়েছে?
আমি চাই আমার এনজিওর সমস্ত পড়ুয়ারা স্বাবলম্বী হোক, নিজের পায়ে দাঁড়াক। আগামী ৫ বছরের মধ্যে আমি চাই অন্তত ৫০ জন রূপান্তরকামীকে সমাজের মূলস্রোতে ফেরাতে। এখন আমার এনজিওতে যে ছোট ছোট বাচ্চারা পড়াশোনা করছে আমি চাই তারা প্রত্যেকে জীবনে সফল হোক। লড়াই করার শক্তি জন্মাক তাঁদের মধ্যে। রূপান্তরকামীদের পাশাপাশি যে মহিলারা রয়েছেন আমি চাই তাঁরাও নিজের পায়ে দাঁড়ান। চাকরি করুন, আর্থিক ভাবে স্বচ্ছল হোন। আপনি বলতেই পারেন লোটাস হয়তো 'জ্যাক অফ অল ট্রেডস' হতে চাইছে, তবে আমরা সত্যিই চাই সব ধরনের পিছিয়ে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়াতে। এর জন্য যে কোনও সাহায্য করতে 'লোটাস' প্রস্তুত।
বিষ্ণুপ্রিয়া প্রজেক্টে শুধুমাত্র বড়রাই আছেন নাকি ছোটরাও রয়েছেন এই প্রজেক্টে?
বিষ্ণুপ্রিয়া প্রজেক্টে শুধুমাত্র প্রাপ্তবয়স্ক রূপান্তরকামীরাও রয়েছেন। তবে অনেক নাবালক রূপান্তরকামীও রয়েছে আমাদের এই সংস্থায়।
স্কুল ইউনিফর্ম প্রকল্পে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ, জেলাশাসককে তদন্তের নির্দেশ