
শেষ আপডেট: 17 July 2020 18:30
বেলজিয়ামের রয়্যাল অবজারভেটরির প্রেন্সিপাল ইনভেস্টিগেটর ও সোলার অরবিটার মিশনের বিজ্ঞানী ডেভিড বার্গম্যান বলেছেন, সোলার অরবিটারের চোখ দিয়ে প্রথম সূর্যকে শান্ত, ধিরস্থির লেগছিল। কিন্তু পরে যখন অরবিটার আর একটু কাছে গেল তখন এই ক্যাম্পফায়ার বা ছোট ছোট রশ্মিগুলোকে দেখে মনে হচ্ছিল ঝলসে দেবে সবকিছু।
সোলার অরবিটার (SoLO) হল সান-অবজার্ভিং স্যাটেলাইট। নাসা ও ইউরোপীয়ান স্পেস এজেন্সির যৌথ উদ্যোগে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সোলার মিশন। এক আধটা দেশ নয়, বিভিন্ন দেশের মহাকাশবিজ্ঞানীদের অবদান রয়েছে। ইউরোপীয়ান স্পেস এজেন্সির ১২ সদস্য যথা অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, চেক প্রজাতন্ত্র, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, নরওয়ে, পোলান্ড, স্পেন, সুইডেন, সুইৎজারল্যান্ড ও ব্রিটেনের বিজ্ঞানীরা রয়েছেন সোলার অরবিটার মিশনের গবেষণা ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি ইউরোপীয় সময় রাত ১১টা ৩ মিনিটে ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল এয়ার ফোর্স স্টেশন থেকে রকেটে চাপিয়ে সুর্যের দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয় সোলার অরবিটারকে।
[caption id="attachment_241416" align="alignnone" width="985"]
সূর্যের ক্যাম্পফায়ার[/caption]
ইউনাইটেড লঞ্চ অ্যালায়েন্স অ্যাটলাস ভি রকেটে করে পাঠানো হয়েছিল সোলার অরবিটারকে। এতদিন বুধের কক্ষপথে ঘুরতে ঘুরতে সৌরমণ্ডলের কিছু ছবিও পাঠিয়েছে সে। এবার একেবারে সূর্যকে কাছ থেকে দেখে তার ছবি তুলেছে নাসার এই মহাকাশযান।
সোলার অরবিটার মিশনের গবেষণা ও প্রস্তুতি দীর্ঘ সাত বছরের। ই অরবিটারে রয়েছে থ্রি-অ্যাক্সিস স্টেবিলাইজ়ড প্ল্যাটফর্ম। সূর্যের আগুনে তেজ সইবার জন্য বিশেষ রকমের হিট-শিল্ড। ২১ রকমের সেন্সর ছাড়াও সোলার অরবিটার ম্যাগনেটোমিটার (MAG), সোলার উইন্ড অ্যানালাইজার (SWA), এক্সট্রিম আলট্রাভায়োলেট ইমেজার (EUI) ইত্যাদি নানারকম যন্ত্রপাতি। পৃথিবীর গ্রাউন্ড স্টেশনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জন্য লো-গ্রেড অ্যান্টেনা ও হাই-টেম্পারেটার হাই-গেন অ্যান্টেনা রয়েছে।
ক্যাম্পফায়ার ছাড়াও সূর্য থেকে ছিটকে আসা তড়িদাহত কণার স্রোত দেখেছে সোলার অরবিটার। সৌরবায়ুর গতিপ্রকৃতি বোঝার চেষ্টা করেছে। ড্যানিয়েল মুলার বলেছেন, সোলার অরবিটারের ‘পোলারিমেট্রিক অ্যান্ড হেলিওসিসমিক ইমেজার’(PHI) সূর্যের চৌম্বক ক্ষেত্রকে পর্যবেক্ষণ করেছে। সূর্যের যে এলাকা থেকে উত্তপ্ত আগুনে রশ্মি বের হয় সেই অংশের ছবিও তুলে পাঠিয়েছে।
জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউটের সোলার রিসার্চ বিভাগের ডিরেক্টর স্যামি সোলাঙ্কি বলেছেন, সূর্যের করোনা স্তরের ছবিও তুলেছে সোলার অরবিটার। আমাদের পৃথিবীর যেমন অ্যাটমস্ফিয়ার আছে, সূর্যের তেমন অ্যাটমস্ফিয়ার আছে। সূর্যের পিঠ (সারফেস) ও তার উপরের স্তর করোনার মধ্যে তাপমাত্রার ফারাক অনেক। সারফেসের গড় তাপমাত্রা ৫৬০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি। কোথাও ৫৮০০ ডিগ্রি আবার কোথাও ৫২০০ ডিগ্রি সেলসিয়ারের কাছাকাছি। করোনার তাপমাত্রা সেখানে প্রায় ২ লক্ষ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি। কখনও তারও বেশি। করোনা স্তরে গ্যাসের ঘনত্ব অনেক কম। তাই এর আলো জোরালো নয়। সূর্যের পিঠ থেকে যেমন গনগনে আগুনের মতো তেজ বের হয়, করোনার তেমনটা হয়। তাই জোরালো আলোয় করোনা ঢাকা পড়ে যায়।
এই করোনা স্তর যেখানে শেষ হচ্ছে সেখান থেকেই সৌরঝড়ের জন্ম হয়। এই করোনা উচ্চতাপমাত্রার প্লাজমা আবরণে ঢাকা। এখান থেকেই বেরিয়ে আসে তড়িদাহত কণার স্রোত। প্রচণ্ড গতিতে ছড়িয়ে পড়ে মহাকাশে। একেই বলে সৌরঝড়। শুধু মহাকাশই নয়, সেই কণার স্রোত প্রভাবিত করে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলকেও। সোলার অরবিটারের কাজ হল এই সৌরঝড় ও সৌরকণাদের চিহ্নিত করা। সূর্যের কাছাকাছি থেকে এই সৌরঝড়ের মতিগতি মাপবে সোলার অরবিটার। কীভাবে এবং কোন পথে সৌরকণারা ধেয়ে আসতে পারে তারও খোঁজখবর নেবে নাসা ও ইএসএ-র এই মহাকাশযান।