
শেষ আপডেট: 7 January 2024 17:11
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শনিবার সিপিএমের যুবনেত্রী মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন, ব্রিগেড সফল হল কিনা রবিবার দুপুর ১২টায় বোঝা যাবে। চব্বিশ ঘণ্টা পর দেখা গেল, প্রায় কানায় কানায় পূর্ণ ব্রিগেড। ড্রোন থেকে তোলা ছবিটা আরও মনোগ্রাহী। কারণ, ডান বা বাম যারই সভা হোক না কেন, এই ভরা ভরা ব্রিগেড যেন বাঙালি প্রতিবাদী সত্তার স্মারক হয়ে আছে।
শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের দাবিতে টানা দু’মাস ধরে ২৯১০ কিলোমিটার পথ হেঁটেছেন মীনাক্ষীরা। তার পর এত বড় আয়োজন মোটেই কম কথা নয়। বাংলায় নতুন প্রজন্মের রাজনীতিকদের মধ্যে উদ্যমের নিরিখে মীনাক্ষীর এই ইনসাফ যাত্রা স্মরণে থেকে যাওয়ার মতোই।
তবু রবিবাসরীয় ব্রিগেড যেন বুঝিয়ে দিল, এখনও পুরনো চালই নজর কাড়ে। মীনাক্ষীদের আয়োজন, উদ্যম ও উৎসাহে ত্রুটি না থাকলেও এদিন যুব নেতা-নেত্রীদের বক্তৃতায় স্ফুলিঙ্গের অভাব ছিল বেশ স্পষ্ট। সৃজন-হিমঘ্নরাজ-মীনাক্ষীদের বক্তৃতা দূরদর্শন বা মোবাইল স্ক্রিনের দর্শকদের দূরস্থান, ব্রিগেডে সিপিএম সমর্থকদেরও আহামরি আন্দোলিত করতে পারেননি। বরং সভার একেবারে শেষ বক্তৃতায় তীক্ষ্ণ, ঝাঁঝালো ও শ্লেষ মাখানো কথায় হাততালি পেলেন প্রবীণ নেতা তথা দলের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম।
এদিন ব্রিগেডে মীনাক্ষীদের সভার মূল উদ্দেশ্য ও বিধেয় ছিল, এক- নতুন প্রজন্মকে বামপন্থী আন্দোলনের প্রতি আরও আগ্রহী করে তোলা। দুই, পঞ্চায়েত ভোটের সময় থেকে বুথ ও ব্লক স্তরে যে আন্দোলন সঙ্ঘবদ্ধ করা হচ্ছে তা অব্যহত রাখা। এবং তিন, বামেদের যে সমর্থক বা ভোটাররা গত লোকসভা ও বিধানসভা ভোটে বিভ্রান্ত হয়ে বিজেপি বা তৃণমূলকে ভোট দিয়েছেন, তাঁদের বোঝানো যে এই দুই দল হল মুদ্রার এ পিঠ আর ও পিঠ।
এদিন তাঁর বক্তৃতা শেষ করার সময়ে নজরুল ইসলামের কবিতার দু’লাইন বলতে গিয়ে গুলিয়ে ফেলেন মীনাক্ষী। তার পর অকপটে বলেন, ‘ভুলে গেছি’। মীনাক্ষীর এই ‘ভুলে গেছি’ বলার মধ্যে কতটা সারল্য ছিল, তা কেউ না দেখলে শুধু লিখে বোঝানো সম্ভব নয়।
মীনাক্ষী যেখানে শেষ করেছিলেন, ঠিক সেখান থেকে শুরু করেন দলের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। তিনি এদিন বলেন, “বাম আর দক্ষিণপন্থার মধ্যে ফারাক কী? মীনাক্ষী নজরুলের কবিতার দু’লাইন বলতে গিয়ে বললেন, ভুলে গেছি। রণক্লান্ত তো। কিন্তু মমতা কি বলতে পারেন, ভুলে গেছি! নাকি মোদী কখনও বলতে পারেন? কোনও ফ্যাসিস্ত পারে না। শুধু বামপন্থীরা পারেন। চোরকে চোর বলতে, গুণ্ডাকে গুণ্ডা বলতে আর সাম্প্রদায়িককে সাম্প্রদায়িক বলতে বামেরা ভয় পান না।”
সেলিমের এই কথায় জোরালো হাততালি দেয় ব্রিগেড। সেই উজ্জীবিত ভিড়ের উদ্দেশে দলের রাজ্য সম্পাদক এর পর বলেন, “যাঁরা চুরি করেছে, রাজ্যের মানুষ তাঁদের শাস্তি চাইছে। যৌবনকে দেখে বলছে, তোমরা পারবে।”
সংসদের সদস্য থাকার সময়ে দলের অন্যতম বক্তা ছিলেন মহম্মদ সেলিম। বাংলায় সিপিএম নেতাদের মধ্যে যাঁরা হিন্দি খুব স্বচ্ছন্দে বলেন, তাঁদের মধ্যে সেলিম অন্যতম। তাঁর বক্তৃতায় বরাবরই ‘উইট’ বা মজা থাকে।
দুর্নীতির প্রশ্নে এদিন তৃণমূলকে বিঁধতে গিয়ে সেলিম বলেন, “ঐকিক নিয়মের অঙ্ক জানেন তো? একজন কাকুর কণ্ঠস্বর পরীক্ষা করতে ছ’মাস সময় লাগলে পিসির কণ্ঠস্বর পরীক্ষা করতে কত সময় লাগবে?” তাঁর কথায়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন সব ভুলে গেছেন। বাংলার শিক্ষা, সংস্কৃতি, উন্নয়ন, কর্মসংস্থান তিনি সব বাজি রেখেছেন শুধু তাঁর পরিবারকে রক্ষা করার জন্য।
এর পরই ভাইপোর প্রসঙ্গ তোলেন মহম্মদ সেলিম। সিপিএম রাজ্য সম্পাদক বলেন, “আমি ভাইপো বলি না। আমি বলি ভেঁপো।”
তাঁর কথায়, “দেখা যাবে এই ভেঁপোর তথা তৃণমূলের নেতাদের সম্পত্তি বেড়েছে ২০১৩ সালের পর। কারণ, যখন সাঁইয়া কোতওয়াল, আব ডর কাঁহে কা! চৌকিদারই চোর। তাহলে আর ভয় কোথায়!”
এদিনের সভায় মীনাক্ষী তাঁর বক্তৃতায় বলেছিলেন, “যে মাঠে খেলা হবে বলেছিলে, সেই মাঠের দখল নিতে এসেছি।” মীনাক্ষী আভাসদের মতোই সেলিমও বলেন আন্দোলনকে বুথ স্তরে নিয়ে যাওয়ার কথা। বুথ ও ব্লকের সংগঠনকে শক্তিশালী করার কথা। তৃণমূল যে আরএসএসের পরিকল্পনা মাফিক চলছে তা মানুষকে বোঝাতে হবে। তাঁর কথায়, কাস্তেকে আরও শান দিতে হবে। হাতুড়িকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।
রবিবার সেলিমের বক্তৃতার শেষের আগেও শেষ ছিল। এক সময়ে তিনি বলেন, “এখানেই বক্তৃতা শেষ করতে পারতাম, কিন্তু আপনারা যখন শুনতে চাইছেন, তখন আরও দু-চার কথা বলি। এ কথা বলেই মণিপুরের প্রসঙ্গ তোলেন সেলিম। বিজেপির বুলডোজার রাজনীতির বিরুদ্ধে সরব হন। তাঁর কথায়, দিল্লিতে যখন পরিযায়ী শ্রমিকের বস্তিতে বিজেপি বুলডোজার চালায় তখন কোনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যান না, বৃন্দা কারাত গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন।
সভার শেষে সেলিম বলেন, “পঞ্চায়েত ভোটে ট্রেলার দেখিয়েছি, এবার সিনেমা দেখাতে হবে। এটাই মূল কথা।”