
শেষ আপডেট: 17 October 2023 13:09
দ্য ওয়াল ব্যুরো, পূর্ব বর্ধমান: নারীশিক্ষার প্রাণপুরুষ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সাহচর্য পেয়েছিল চকদিঘির জমিদার পরিবার। সেই পরিবারের দুর্গাপুজোয় কিন্তু আজও ব্রাত্য মহিলারা। পর্দার আড়ালেই কাটে তাঁদের উৎসবের দিনগুলি। শুধুমাত্র আভিজাত্য বজায় রাখতেই এমন ভবিতব্য মেনে চলেছেন চকদিঘির সিংহরায় পরিবারের মহিলারা।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজত্ব কালে এই বাংলায় জমিদারি ব্যবস্থার পত্তন হয়। সেই সময়ের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে জামালপুরের চকদিঘির জমিদারদের নামও। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে। কিন্তু ধারাবাহিক ঐতিহ্য এখনও বহন করে চলেছে চকদিঘির বাগানবাড়ি। প্রায় একশো বিঘে জমির উপর জমিদারদের বাগানবাড়ি। পরম্পরা মেনে এই বাগানবাড়ির সুবিশাল মন্দিরে প্রায় ২৮৭ বছর ধরে পুজিতা হয়ে আসছেন দেবী দুর্গা। একসময় পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর দুর্গাপুজোয় এসে থাকতেন এই বাগানবাড়িতে। কিংবদন্তি চিত্রপরিচালক সত্যজিৎ রায় তাঁর সিনেমার শ্যুটিংয়ের জন্যেও এই বাগানবাড়িকে বেছে নিয়েছিলেন।
চকদিঘির জমিদারদের পূর্বপুরুষরা ছিলেন রাজপুত ক্ষত্রিয়। দুর্গাচরণ রায়ের ‘দেবগণের মর্ত্যে আগমন’ গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে চকদিঘির জমিদারদের কথা। সেখান থেকে জানা যায় রাজস্থান থেকে প্রথম চকদিঘিতে এসে ছাউনি ফেলেছিলেন নল সিং। সেখানেই তিনি বসবাস শুরু করেছিলেন। পরবর্তী কালে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের কাছ থেকে জমিদারি লাভের পর নল সিং অগাধ ঐশ্বর্যের অধিকারী হন।
এই জমিদার বংশের খ্যাতি শীর্ষে পৌঁছেছিল সারদাপ্রসাদ সিংহরায়ের হাত ধরে। প্রজাবৎসল জমিদার সারদাপ্রসাদ তাঁর জমিদারি এলাকার উন্নতি সাধনে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন। শিক্ষাবিস্তারের জন্য তিনি চকদিঘিতে স্কুল তৈরি করেছিলেন। সেই স্কুলের উদ্বোধন করেছিলেন স্বয়ং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। এছাড়াও চকদিঘি হাসপাতাল এবং আজকের মেমারি-চকদিঘি সড়কপথ সবই তৈরি হয়েছিল সারদাপ্রসাদ সিংহরায়ের উদ্যোগে। জমিদার হয়েও ভোগবিলাসকে তুচ্ছ করে তিনি জনসেবামূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। প্রজারা একান্তভাবেই ছিলেন সারদাপ্রসাদ সিংহরায়ের গুণমুগ্ধ। পরবর্তী প্রজন্ম ললিতমোহন সিংহরায়, লীলামোহন সিংহরায় প্রমূখও সারদাপ্রসাদ সিংহরায়ের পথ অনুসরণ করে জমিদারি চালিয়েছিলেন। বর্তমান বংশধর অম্বরীশ সিংহরায়ও একইভাবে পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য বজায় রেখে চলেছেন ।
জমিদার পরিবারের অত্যন্ত কাছের মানুষ ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। এই বাগানবাড়িতেই বিদ্যাসাগর মহাশয়ের থাকার জন্য একটি জলাশয়ের ধারে তৈরি হয়েছিল হাওয়াখানা ঘর। যে ঘরটির পরিচিতি হাওয়া মহল নামে। বাগানবাড়ির ভিতর কাছাড়িবাড়ির সামনেই রয়েছে দুর্গাপুজোর স্থায়ী মন্দির। মন্দিরের সঙ্গেই রয়েছে টিনের ছাউনি দেওয়া বিশাল বসার জায়গা। জমিদারবাড়ির কেয়ারটেকার সুশান্ত দত্ত জানিয়েছেন, এই জমিদার পরিবারের অন্য দুর্গা মন্দিরটি রয়েছে চকদিঘি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে মণিরামবাটি গ্রামে। সেখানকার মন্দিরটিও একই আদলে তৈরি। সেখানেও জমিদারি ঐতিহ্য মেনে পুজোর যাবতীয় আয়োজন করা হয়। পঞ্জিকার সময় মেনে একই সময়ে দুটি ঠাকুর মন্দিরে হয় পুজো। ব্যবসা ও কর্মসূত্রে সিংহরায় পরিবারের বর্তমান সদস্যরা বছরের বাকি দিনগুলি কলকাতা ও অন্যত্র কাটান। তবে পুজোর ক’টাদিন গোটা পরিবার মিলিত হন চকদিঘির বাগানবাড়িতে।
বৈদিক মতে হয় সিংহরায় জমিদার বড়ির দুর্গাপুজো। একচালার কাঠামোয় ডাকের সাজে প্রতিমা সাজানো হয়। দেবী মূর্তির দু’পাশে বসানো থাকে জয়া ও বিজয়ার মূর্তি। মন্দিরচত্বর সাজানো হয় ভিন্ন আঙ্গিকে। একটি গোটা নারকেল, আমপল্লব ও একটি কাঁঠালি কলা একসঙ্গে নিয়ে বাঁধা থাকে মন্দিরের প্রতিটি থামে। প্রতিপদের দিন শুরু হয় পুজো। পঞ্জিকার নির্ঘণ্ট মেনে পুজো করেন হুগলির লোকনাথ এলাকার বাসিন্দা কুল-পুরোহিত ভোলানাথ চতুর্বেদি ।
নৈবেদ্যে অন্য ফলের সঙ্গে থাকে কাজু-কিসমিস-পেস্তা-আখরোট ও মেওয়া ফল। নৈবেদ্য সাজানো হয় চিনির সন্দেশ, ছোট ও বড় মুণ্ডি, ডোনা, নবাত, রসকড়া, মুড়কি প্রভৃতি দিয়ে। পারিবারিক নিয়ম মেনে স্থলপদ্মে হয় দেবীর পুজো । একমাত্র সন্ধিপুজোয় লাগে ১০৮ টি জল পদ্ম। পুজোর প্রতিটি দিন দেবীর কাছে নিবেদন করা হয় হরেক রকম নিরামিশ ভোগ। মহাষ্টমীর দিন থেকে পুজোর নৈবেদ্যে দেওয়া হয় মাখা সন্দে। আগে ছাগ বলির প্রথা থাকলেও বেশকয়েক বছর হল বলিদান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পরিবর্তে এখন সন্দেশ নিবেদন করা হয়। নবমীর দিন একই সময়ে চকদিঘি ও মণিরামবাটির মন্দিরে কুমারী পুজো অনুষ্ঠিত হয়। জমিদার বাড়ির পুজোর জোগাড়ে মহিলাদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ। সবকিছুই করেন জমিদার বংশের পুরুষরা।