
শেষ আপডেট: 6 October 2018 18:30
গৌতমী সেনগুপ্ত
সালটা ছিল ১৯৫৩। অসম্ভব বেসামাল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ। ভাষা আন্দোলন তখন অন্তিম পর্বে,পদ্মাও বইছিল অনিশ্চতার ভার নিয়েই। ঠিক সেই সময়ই একতার বার্তা নিয়ে যশোরে দুর্গা পুজো শুরু করলেন সুধীর ঘোষ। দেশপ্রেমী মানুষটি সম্প্রীতির বার্তা নিয়েই তাঁর কাঠগোলায় সর্বজনীন দুর্গা পুজো শুরু করেন। যশোর শহরে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক পুজোর সংখ্যা তখন সাত থেকে আট। অভিনবত্ব শুধু নয়, জাতি-ধর্ম-বর্ণের প্রাচীর ভেঙে সুধীর বাবু চেয়েছিলেন সবাইকে নিয়ে সবাই মিলে পুজো করতে, যা আজও বহাল। যশোরের প্রথম সর্বজনীন দুর্গা পুজোকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তাঁর পরিবার। তবে পরিবারের প্রত্যেকের মনের অন্দরে লুকিয়ে সেই হাহাকার, বড্ড আগেই যে না-ফেরার দেশে চলে গেলেন বাড়ির প্রধান কর্তা। ১৯৫৬ সালে বাংলা ভাষার স্বীকৃতির পরই বিষিয়ে উঠল বাংলাদেশ। পাকিস্তানের গ্রাস থেকে বাংলাদেশ তখন মুক্তির লড়াইয়ে। সুধীরকুমার ঘোষও পিছিয়ে ছিলেন না, ঝাঁপালেন সেই আগুনে। ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ, সুধীর কুমার ঘোষ ও তাঁর নাবালক সন্তান সত্যব্রত ঘোষকে তুলে নিয়ে যায় পাক সেনা। স্বামী ও সন্তানকে সেই শেষ দেখেছিলেন কনকলতা ঘোষ। পাক সেনা ক্যাম্পে অকথ্য অত্যাচারের পর শহিদ হন সুধীর ঘোষ ও তাঁর ছেলে। স্বামী ও ছেলের দেহ পাননি কনকলতা দেবী। শোকে পাথর কনকলতা, তবুও দুর্গা পুজো থামেনি। নতুন উদ্যোগে সুধীর ঘোষের স্মৃতিতেই শুরু হয় পুজো।
বর্তমানে, পুজোটি “শহিদ সুধীরকুমার ঘোষ পুজো মন্দির” নামে বিখ্যাত। পুজো উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হয় শারদ মেলাও।পরিচালনার মূলে ঘোষ পরিবার, সর্বজনীন হওয়ায় পরিবারের সঙ্গে জোট বাঁধেন সংস্কৃতিপ্রেমী বিভিন্ন বিশিষ্টেরা। থাকেন এলাকার তরুণরা।
ঘোষ বাড়ির বড় বউ স্মৃতিকণা ঘোষ নিজে হাতে পুজোর পরিচালনা করেন, ঠিক যেমন করতেন সুধীরকুমারের স্ত্রী কনকলতা। পুজো শুরু হওয়ার পর থেকেই কনকলতা ও তাঁর মেয়েরা পুজো পরিচালনা করতেন। রীতি মেনে এখনও সেই দায়িত্ব পালন করে চলেছেন বাড়ির বড় ছেলে দেবব্রত ঘোষ ও স্ত্রী স্মৃতিকণা। পরিবারের অন্যান্যরা দেশের বাইরে ছড়িয়ে।কেউ থাকেন কলকাতা, কেউ বা দিল্লি, কানাডা, আমেরিকায়। তবে পুজোর দিনগুলিতে দেশের টানে প্রায় প্রত্যেকেই চলে আসেন বাংলাদেশে। একজোট হয়ে চলে পুজোর জোগাড়, খাওয়া দাওয়ার আয়োজন। উলুধ্বনি, সিঁদুরখেলা, মন্দির প্রদক্ষিণ সবই হয় নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে। এর মধ্যেও সুধীরকুমার ঘোষের পুজোর উদ্দেশ্য অটুট থাকে, সম্প্রীতির বার্তাবাহী এই পুজোর শারদ মেলায় বস্ত্রদানের আয়োজন করা হয়।