দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারত-পাক সীমান্ত তথা নিয়ন্ত্রণরেখায় জঙ্গিদের উৎপাত বেড়েই চলেছে। কখনও মাটির নিচের সুড়ঙ্গ দিয়ে সীমান্তের এপারে উঠে আসছে জঙ্গিরা, আবার কখনও ড্রোনে চাপিয়ে অস্ত্রশস্ত্র, টাকাপয়সা পাঠাচ্ছে উপত্যকার জঙ্গি ঘাঁটিগুলিতে। প্রায়শই নিয়ন্ত্রণরেখায় ভারতের আকাশসীমার কাছাকাছি ঘুরঘুর করতে দেখা যাচ্ছে পাকিস্তানের ড্রোনগুলিকে। তাই ভারতও প্রস্তুতি সেরে রাখছে। শত্রুসেনার ড্রোন ধ্বংস করার জন্য আরও বেশি অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম সীমান্তে মোতায়েন করার তোড়জোড় চলছে।
ভারতের হাতে শক্তিশালী অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম রয়েছে। স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লায় মোতায়েন করা হয়েছিল এমনই একটি অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম। তবে পাক জঙ্গিদের উপদ্রব যেভাবে বাড়ছে তাতে আরও বেশি ড্রোন-ধ্বংসকারী সিস্টেম প্রয়োজন। সে জন্য ভারত ইলেকট্রনিক্সকে বরাত দিয়েছে ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা ডিআরডিও (ডিফেন্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন)।
অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম কী?
ডিআরডিও-র তৈরি অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম লেজার প্রযুক্তিতে কাজ করে। আকাশপথে শত্রুসেনার ড্রোন দেখলেই লেজার রশ্মি ছুড়ে ধ্বংস করে দিতে পারে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আকাশপথে ২.৫ কিলোমিটার অবধি লক্ষ্য স্থির করতে পারে এই সিস্টেম। এর রেডার টেকনোলজি এতটাই উন্নত যে, শত্রুপক্ষের ড্রোন বহুদূর থেকেই চিহ্নিত করে ফেলতে পারে। এই সিস্টেম যেমন বিপক্ষের ড্রোন চিহ্নিত করতে পারে তেমনি আকাশে তিন কিলোমিটার রেঞ্জের মধ্যে মাইক্রো-ড্রোনের কার্যক্ষমতা নষ্ট করে দিতেও পারে। লেজার রশ্মি ছুড়ে যে কোনও আধুনিক প্রযুক্তির ড্রোনকে ঘায়েল করতে পারে ডিআরডিও-র তৈরি এই অ্যান্টি ড্রোন সিস্টেম।
হাই স্পিড এক্সপ্যানডেবল এরিয়াল টার্গেট (এইচইএটি ) ‘অভ্যাস’ ড্রোনও রয়েছে ডিআরডিও-র হাতে। এই ড্রোনে রয়েছে অটোপাইলট সিস্টেম।আর এই সিস্টেমকে কাজে লাগিয়েই লক্ষ্যবস্তুকে নিখুঁত ভাবে নিশানা করা যায়। ‘লক্ষ্য’ ড্রোনের মতোই প্রোটোটাইপ অভ্যাস ড্রোনের। ‘লক্ষ্য’ হল হাই স্পিড টার্গেট ড্রোন। এটি তৈরি করে ডিআরডিও-র অ্যারোনটিক্যাল ডেভেলপমেন্ট এসটাব্লিশমেন্ট (এডিই)।
ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলি জানাচ্ছে, গত কয়েকমাসে ড্রোনের ব্যবহার বাড়িয়েছে জঙ্গিরা। ভারতীয় সেনা ক্যাম্পের উপর নজরদারি চালানো, উপত্যকার জঙ্গি ঘাঁটিগুলিতে অস্ত্র পৌঁছে দেওয়ার জন্য ড্রোনের সাহায্যই নিচ্ছে পাক মদতপুষ্ট জঙ্গি সংগঠনগুলি। কয়েকমাস আগেও পাঞ্জাব ও জম্মু-কাশ্মীর সীমান্তে ড্রোনের মাধ্যমে মাদক ও অস্ত্র পাচার করা প্রায় রুটিনে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। ভারতীয় সেনার তৎপরতায় ড্রোনের আনাগোনা কিছুটা কমলেও বন্ধ হয়নি। সশস্ত্র ড্রোন ভারতীয় আকাশসীমায় পাঠানোর জন্য নানা ফন্দি-ফিকির খুঁজছে পাক জঙ্গিরা। তবে ভারতও তৈরি। শত্রুসেনার যে কোনও হামলা রুখে দেওয়ার জন্য আধুনিক প্রযুক্তির সশস্ত্র ড্রোনও আছে ভারতের হাতে।
কী কী সশস্ত্র ড্রোন আছে ভারতের অস্ত্র ভাণ্ডারে?
ভারতের যোদ্ধা ড্রোন রুস্তমকে বলা হয় ‘দ্য ওয়ারিয়র’। ‘মিডিয়াম অল্টিটিউট আনম্যানড এরিয়াল ভেহিকল’ (ইউএভি) রুস্তমের উন্নত ভ্যারিয়ান্ট হল রুস্তম-২। তৈরি করেছে ডিআরডিও। এই ড্রোনের প্রোটোটাইপ এমনভাবে তৈরি যে ২৬ হাজার ফুট উচ্চতা অবধি ওড়ার ক্ষমতা আছে এই আনম্যানড এরিয়াল ভেহিকলের। ১৮ ঘণ্টার বেশি উড়তে পারে এই ড্রোন। ১৯৮০ সালে অধ্যাপক রুস্তম ডামানিয়ার নেতৃত্বে এই ড্রোনের প্রোটোটাইপ তৈরি করে লাইট কানার্ড রিসার্চ এয়ারক্রাফ্ট। পরে এর ইঞ্জিন ও অন্যান্য প্রযুক্তিতে বদল ঘটায় ডিআরডিও। এর পরের ভ্যারিয়ান্ট রুস্তম-এইচ মিডিয়াম অল্টিটিউড লং-এন্ডুর্যান্স। দুই ইঞ্জিনের চালকহীন বিমান যা নজরদারি তো বটেই যুদ্ধস্ত্রও বয়ে নিয়ে যেতে পারে। সাড়ে তিনশো কেডি পে-লোড বইতে পারে রুস্তমের এই ভ্যারিয়ান্ট। প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দূর থেকে শত্রুঘাঁটিতে নজর রাখতে পারে এই ড্রোন। বিভিন্ন রকমের ক্যামেরা ফিট করা আছে রুস্তম ড্রোনে। এর রেডার সিস্টেমও উন্নত।
[caption id="" align="aligncenter" width="960"]
রুস্তম ড্রোন[/caption]
ইজরায়েল থেকে কেনা সশস্ত্র হেরন ড্রোন রয়েছে ভারতের হাতে। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা তথা এলএসিতে নজরদারি বাড়াতে এই ড্রোন নামানো হয়েছে। এই ড্রোনের নির্মাতা সংস্থা ইজরায়েল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ। ১৪ মিটার দৈর্ঘ্যের এই ড্রোন হাই-উইং ক্যান্টিলিভার মোনোপ্লেনের ডিজাইনে তৈরি। এর দুটো ডানার বিস্তৃতি প্রায় ২৬ মিটারের কাছাকাছি। হাজার কিলোগ্রামের বেশি ওজন বইতে পারে এই ড্রোন। এতে রয়েছে ইলেকট্রো-অপটিক্যাল টার্গেট সিস্টেম। রাতের বেলাতেও কাজ করতে পারে এই ড্রোন। এর বিশেষ ক্যামেরা যে কোনও আবহাওয়ার পরিস্থিতিতে যে কোনও সময় শত্রু ঘাঁটির ছবি তুলে আনতে পারে। এতে রয়েছে ইলেকট্রনিক সাপোর্ট মেসারস (ESM), ইলেকট্রনিক অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইনটেলিজেন্স (ELINT) এবং সিন্থেটিক অ্যাপার্চার রাডার (SAR)। উন্নতি প্রযুক্তির এই সশস্ত্র ড্রোন যুদ্ধক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয়।