
শেষ আপডেট: 21 August 2019 18:30
পরনে জলপাই রঙা পোশাক, কাঁধের উপর কার্ল-গুস্তভ এম৪। টাইট করে পনিটেল করা চুল। ছিপছিপে গড়নে বড় উজ্জ্বল আর আত্মবিশ্বাসী দুই চোখ। বাঁ হাতের কব্জি থেকে বেল্টে ঝুলছে একে-১০৩ অ্যাসল্ট রাইফেল। অস্ত্রসাজে সজ্জিতা এই নারীকে দেখে থমকে গিয়েছিলেন সাংবাদিকরা। ঠিক যেন শক্তিরূপিনী দুর্গা। পাপ নাশ করতে চলেছেন। সাংবাদিকদের বিহ্বল ভাব দেখে মৃদু হেসে সেই সাহসিনী বলেছিলেন, “৫০ মিটার দূর থেকে মানুষের মাথার উপর রাখা আপেলে নিখুঁত নিশানা লাগাতে পারি। একটা চুলেও আঁচড় পড়বে না। দুরন্ত গতিতে ছুটে আসা বুলেট থেকে নিজের মাথা বাঁচাতে পারি কয়েক সেকেন্ডের ক্ষিপ্রতায়।“
[caption id="attachment_134876" align="alignleft" width="219"]
ভারতীয় বাহিনীর একমাত্র মহিলা কম্যান্ডো প্রশিক্ষক ডঃ সীমা রাও[/caption]
খবরের কাগজ, সংবাদ মাধ্যম জুড়ে একসময় ঝড় তুলেছিলেন এই নারী। তখন তাঁর বয়স কম। এখন তিনি ৪৯। শরীরের গড়নে, লড়াকু মনে বয়সের ছাপ পড়েনি। ভারতীয় সেনাবাহিনী, বায়ুসেনা, নৌসেনা, স্পেশাল সার্ভিস গ্রুপ, বিএসএফ, এনএসজি এক ডাকে চেনে এই মহিলাকে। ডঃ সীমা রাও। মার্শাল আর্টের সেভেন্থ ডিগ্রি ব্ল্যাক বেল্ট হোল্ডার সীমা কমব্যাট শ্যুটিং ইনস্ট্রাকটর, ভারতীয় সেনা বাহিনীর একমাত্র মহিলা কম্যান্ডার। তাঁর পরিচয় শেষ হয় না এখানেই। অভিজ্ঞতা আর দূরদর্শিতার তালিকাটা বড়ই লম্বা। সীমা রাও অভিজ্ঞ ফায়ার-ফাইটার, স্কুবা ডাইভার, হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট থেকে ডিগ্রি ধারী পর্বতারোহী। তিনি চিকিৎসক আবার ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টে এমবিএ। তিনি প্রাক্তন মডেল। মিস ইন্ডিয়া ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগীতায় ফাইনালিস্ট। তিনি লেখিকা। তিনি নারীশক্তির এক অনন্য ব্যাখ্যা।
জনৈক গে রাইটার লিখেছিলেন, মেয়েরা ততখানি বুদ্ধি ধরে না, যতখানি তাদের লাস্য! সেই সংজ্ঞাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছেন ভারতের ‘ওয়্যান্ডার ওম্যান’ ডঃ সীমা রাও। ভারতের সশস্ত্র বাহিনীতে প্রশিক্ষকের কাজ করছেন গত ২০ বছর ধরে। এলিট আর্মড ফোর্সেস--পুলিশ, সেনা, প্যারামিলিটারি ও কম্যান্ডো মিলিয়ে ২০ হাজারের বেশি সেনাকে কমব্যাট ট্রেনিং দিয়েছেন। আজও সেনাদের কাছে অস্ত্র প্রশিক্ষণের সেরা ‘মাস্টারনি’ সীমাই। বলেছেন, “জন্ম হওয়া থেকে দেশকে ভালোবাসার কথা শুনে আসছি। দেশপ্রেম আমার রক্তে। শেষ নিঃশ্বাস অবধি দেশের জন্যই নিজেকে উৎসর্গ করেছি।”
অস্ত্র হাতে এই সাহসিনী ভারতের গর্ব[/caption]
মা চেয়েছিলেন মেয়ে ডাক্তার হোক। এমবিবিএসের পড়াশোনা চলছিলই। কিন্তু, মেয়ের ঝোঁক নানা দিকে। কলেজ থেকে ফিরে ডাক্তারির স্টেথো গলা থেকে নামিয়েই সে ছুটে যায় পাহাড়ে চড়ার ট্রেনিং নিতে। খরস্রোতা নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে অবলীলায়। বন্দুক-পিস্তলেও অব্যর্থ লক্ষ্য। সেনাবাহিনীর কুচকাওয়াজ দেখলে মেয়ের মুখে হাসি ফোটে। যে হাতে পিস্তল চালাতে পারে, সেই হাতে আবার সুন্দর করে চুলও বাঁধতে পারে। মডেলিং-এও মেয়ের ঝোঁক। মা বুঝলেন, এই মেয়ে ইতিহাস গড়বে একদিন।

মার্শাল আর্ট থেকে রাইফেল শ্যুটিং- সীমা রপ্ত করেছিলেন কম বয়সেই
স্বামী দীপক রাওয়ের সঙ্গে সেনা ক্যাম্পে সীমা[/caption]
সীমা জানিয়েছেন, বিয়ের পরেই তাঁর জীবনে এক অভূতপূর্ব বদল আসে। মেজর রাও তখন ভারতীয় সেনা দলের ক্যাপ্টেন। মার্শাল আর্টে ধীরে ধীরে পারদর্শী হয়ে উঠেছেন সীমাও। ‘’ল এনফোর্সমেন্ট সার্টিফিকেশন’ (CLET) কোর্সে ভর্তি হন, মেজর দীপক রাও। ওয়েস্টমিনস্টার বিজ়নেস স্কুল থেকে ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টে এমবিএ করে ফেলেন সীমা। এর পর দু’জনেই শুরু করেন এক নতুন জার্নি। ভারতীয় সেনা দলের প্রশিক্ষক হিসেবে শুরু হয় সীমা-দীপকের পথ চলা।
[caption id="attachment_134884" align="aligncenter" width="645"]
কমব্যাট কম্যান্ডো ট্রেনিং দিচ্ছেন সীমা-দীপক[/caption]
Jeet Kune Do-র চিফ ইনস্ট্রাকটর রিচার্ড বুস্টলিও-র সঙ্গে সীমা রাও[/caption]
বলেছেন, “আমি শুধু নিয়ম শৃঙ্খলা শেখাই না, আমি সেনাদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সাহাস্য করি। নারীদের সম্মান দিতেও শেখাই। আমি চাই যুদ্ধক্ষেত্রে সাহস ও গর্বের সঙ্গে তাঁরা দেশকে রক্ষা করুক।”
https://www.youtube.com/watch?v=CsAmiEHNgTk
বায়ু সেনার গরুড় কম্যান্ডোকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার সময়েই ২০০৯ সালে বায়ুসেনা প্রধানের নিমন্ত্রণ পান সীমা। সেখানে তাঁকে আইএএফ প্যারা জাম্প শেখানো হয়। বর্তমানে আইএফের প্যারা উইং বিভাগেও প্রশিক্ষকের কাজ করছেন তিনি। ভারতীয় বাহিনীর নানা বিভাগের প্রায় ২০ হাজার সেনাকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য ২০১১ সালে রাষ্ট্রপতির হাত থেকে পুরস্কারও পেয়েছেন সীমা রাও।
[caption id="attachment_134903" align="aligncenter" width="571"]
রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের থেকে পুরস্কার নিচ্ছেন সীমা রাও[/caption]

সীমার কথায়, “রিফ্লেক্স শ্যুটিং-এর নতুন ঘরানা বানিয়েছি আমরা। সাধারণত দেখা যায়, শত্রুপক্ষ যখন ৩০০ ইয়ার্ড দূরে, তখন যে কোনও আড়াল থেকে গুলিযুদ্ধ চালানো যায়। কিন্তু, শত্রুপক্ষ যদি ২০ ইয়ার্ডের মধ্যে এসে পড়ে তাহলে অনেক সময় বেকায়দায় পড়তে হয় সেনাদের। এর জন্যই এই রিফ্লেক্স শ্যুটিং। ” ইদানীং কালে রিফ্লেক্স শ্যুটিং-এর এই বিশেষ প্রক্রিয়ায় ভারতীয় সেনারা অনেক উপকৃত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন সীমা।
[caption id="attachment_134906" align="aligncenter" width="598"]
৪টে Army Chief Citations পুরস্কার পেয়েছেন সীমা, যা এক কথায় অবিশ্বাস্য[/caption]
ভারতীয় সেনার চারটে Army Chief Citations পুরস্কার পেয়েছেন সীমা, যা অবিশ্বাস্য। মার্কিন প্রেসিডেন্টের থেকে পেয়েছেন Volunteer Service Award এবং World Peace Diplomat Award। চলতি বছরে পেয়েছেন ‘নারী শক্তি পুরস্কার ২০১৯’। ভারতীয় বায়ুসেনার স্কাই ডাইভিং কোর্স করে পেয়েছেন প্যারা উইংস। ক্লোজ় কোয়ার্টার ব্যাটেল নিয়ে তাঁর বই Encyclopedia of Close Combat Ops বিশ্বে সাড়া জাগিয়েছে। তা ছাড়া কম্যান্ডো ট্রেনিং ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আরও অনেক বই লখেছেন সীমা, যেগুলির মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়, Balidan: Essential Commando Skills for Anti Terror Ops, Handbook of World Terrorism, The Art of Success, Mind Range, Terrorism: A Comprehensive Analysis of World Terrorism, Commando Manual of Unarmed Combat।
তাঁকে ভারতীয় নারীশক্তির প্রতীক বলা হয়, কিন্তু লিঙ্গবিভাজনের বিরুদ্ধে ডঃ সীমা রাও। তাঁর মতে, মেয়েরা নিজেদের রক্ষার বর্ম নিজেরাই গড়ে তুলুক। DARE (Defence Against Rape and Eve Teasing) এর বিরুদ্ধে প্রচার চালান সীমা। তাঁর কথায়, “আমরা এগোচ্ছি। প্রগতির বার্তা সমেত আমাদের নিশান নমিত হবে না কখনও। ”