দ্য ওয়াল ব্যুরো: মুজফফরপুরের হাসপাতালে পা দিতেই ভেসে এল রাগী গলার স্লোগান ‘ওয়াপাস যাও।’ থমকে গিয়ে আবারও চলা শুরু করলেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার। ততক্ষণে তাঁকে ঘিরে ধরেছেন ক্ষুব্ধ জনতা। ভিড়ের সামনেই হাহাকার করছেন সন্তানহারা মা, বাবারা। দু’চোখে জল, হাত বাড়িয়ে কাতর আর্তি, ‘এতদিন পরে কেন এসেছেন, ফিরে যান।’
মৃত্যু মিছিল বেড়েই চলেছে বিহারে। শয়ে শয়ে শিশু মৃত্যুতে রীতিমতো উদ্বেগে প্রশাসন। মঙ্গলবারের হিসেবে সংখ্যাটা ১২৬ ছুঁয়েছে। মুজফফরপুরেই ১০৭। রোগের কারণ নিয়ে যেমন তৈরি হয়েছে সংশয়, তেমনি অভিযোগ উঠেছে চিকিৎসা ব্যবস্থা গাফিলতিরও। কেন এত মৃত্যু? বিশেষজ্ঞরা বলছেন ‘অ্যাকিউট এনসেফেলাইটিস সিনড্রোম,’ সরকারি সূত্র বলছে, লিচুর টক্সিন। তার থেকে ‘ব্রেন ফিভার’। স্থানীয়রা বলছেন ‘চামকি বুখার’, বিক্ষোভকারীদের দাবি, রোগের কারণ নির্ণয় তো দূরে থাক, সরকারি হাসপাতালগুলোতে পরিষেবাই অমিল। কাজেই বেড়ে চলেছে একের পর এক মৃত্যু। সেই সঙ্গে উঠে এসেছে অপুষ্টি ও তাপপ্রবাহের কারণও।

জুনের প্রথমেই বিহারের নানা প্রান্ত থেকে একটি, দু’টি করে শিশু মৃত্যুর খবর মেলে। গত ১৭ দিনে সেটাই মহামারীর আকার নিয়েছে। চিকিৎসকরা বলছেন, শিশুরা যে রোগ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে, তার নাম- 'অ্যাকিউট এনসেফেলাইটিস সিনড্রোম (এইএস)'। রোগাক্রান্তদের সকলেরই উপসর্গ অনেকটাই এক। রক্তে শর্করার মাত্রা তলানিতে, মস্তিষ্কে প্রদাহজনিত সমস্যা (Brain Inflammation)। এখনও পর্যন্ত এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মুজফফরপুরের শ্রীকৃষ্ণ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩০৯টি শিশু।
শিশু মৃত্যুর জন্য দায়ী করা হয়েছে কী কী কারণকে?
অ্যাকিউট এনসেফেলাইটিস সিনড্রোম (AES)প্রাথমিক কারণ। এইএস বা জাপানিজ এনসেফেলাইটিস ভাইরাস, ব্যাকটিরিয়া, ছত্রাক ঘটিত রোগ। কোনও রাসায়নিক বা টক্সিন রক্তে মিশলেও এই রোগের আগমন হয়। উত্তরবঙ্গে একসময় মশা বাহিত এনসেফেলাইটিসের কারণে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন সাধারণত মশা বাহিত হয়ে এই রোগের ভাইরাস হানা দেয় বর্ষাকাল বা বর্ষার শেষের দিকে। কিন্তু বিহার, উত্তরপ্রদেশে যখন তীব্র তাপপ্রবাহ এবং খরার প্রকোপ চলছে এমন সময় মশা বাহিত এই রোগের ছড়ানোর সম্ভাবনা অনেক কম।
তবে অ্যাকিউট এনসেফেলাইটিসের এই তত্ত্ব মানতে রাজি নন ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অব পেডিয়াট্রিক্স (আইএপি)-এর প্রাক্তন সভাপতি ও ভেলোরের ক্রিশ্চান মেডিক্যাল কলেজের ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক টি জে জন। তাঁর মতে, এইএস মানে মস্তিষ্কের যে কোনও প্রদাহজনিত রোগ। সেটা রাসায়নিক বা টক্সিনের কারণে হতে পারে। বা অন্য কারণে। ভাইরাসের হানাদারি একমাত্র কারণ নয়। চিকিৎসকরা শিশুদের পরীক্ষা করার সময় এই রোগের সঠিক কারণ ধরতে পারেননি। এইএস নানা কারণে হতে পারে, ভাইরাস একটা কারণ তো বটেই। তা ছাড়া
মেনিনজাইটিস (এই রোগে মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডের বাইরের আবরণীতে ক্ষয় হতে থাকে)। ফলে স্নায়ুর রোগ দেখা দেয়।
এনসেফ্যালোপ্যাথি (যে রোগে মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দেয়) এবং
সেরিব্রাল ম্যালেরিয়া (ম্যালেরিয়ার সঙ্গে স্নায়ুতন্ত্রের জটিলতা)।

অধ্যাপক টি জে জন জানিয়েছেন, স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময় এই সব রোগগুলিকে মাথায় রেখেই চিকিৎসা শুরু করতে হবে। ঠিক কোন প্রকার এনসেফেলাইটিসে শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে সেটা জানা না থাকলে, রোগের সঠিক চিকিৎসাও সম্ভব নয়। বিহারের যে সব এলাকায় অধিক শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে সেখানে শিশুদের অপুষ্টিও একটা কারণ। সুতরাং এইএস হানা দিলে শিশুদের মস্তিষ্কে সেটা সহজেই থাবা বসাচ্ছে। দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে মৃত্যু হচ্ছে শিশুদের।
দিল্লির ন্যাশনাল সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল (এনসিডিসি) ও আমেরিকার আটলান্টার সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল (সিডিসি-র বিশেষজ্ঞরা এখনও পর্যন্ত এই মহামারীর পিছনে দু’টি সম্ভাব্য কারণ জানিয়েছেন। প্রথমত, তাপপ্রবাহ, দ্বিতীয়ত লিচু থেকে নির্গত টক্সিন। যদিও তাঁদের এই তত্ত্ব মানতে রাজি হননি দেশের অনেক বিশেষজ্ঞই।
মুজফফরপুরে শ্রীকৃষ্ণ মেডিক্যাল কলেজ ও হাতপাতালের এইচওডি ডঃ গোপাল শঙ্করের কথায়, “আগে মনে করা হতো ভাইরাসের হানায় এই রোগ ছড়াচ্ছে মহামারীর মতো। কিন্তু, ২০০৫, ২০১১, ২০১৩ ও ২০১৯ সালের রেকর্ড খতিয়ে দেখা গেছে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা যখনই বাড়ে তখনই এই মৃত্যু মিছিল শুরু হয়। ২০১৪ সালেই ৭০০ জনের মৃত্যু হয়েছিল।”
মত-পাল্টা মতের মধ্যেই হু হু করে বাড়ছে মৃত্যু। মঙ্গলবার মুজফফরপুরের হাসপাতালগুলি পরিদর্শ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার ও উপ মুখ্যমন্ত্রী সুশীল কুমার মোদী। গতকাল এসেছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হর্ষ বর্ধন। তাঁকেও ‘গো ব্যাক’ স্লোগান দিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা। মৃতের পরিবার পিছু ইতিমধ্যেই ৪ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। আগামী দিনে রোগের প্রাদুর্ভাব রুখতে রাজ্যে উন্নত প্রযুক্তির বায়োলজি ল্যাব তৈরি করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।