
শেষ আপডেট: 18 February 2022 09:22
বৃহস্পতিবার এমনই অকুতোভয় শিশুদের সঙ্গে কথা হচ্ছিল ঠাকুরপুকুর ক্যান্সার হাসপাতালে। যারা সকাল থেকে দুপুর বিশাল হাসপাতাল চত্বরের রাজহাঁস, পাখপাখালি, ঘাসেভরা মাঠ নিয়ে মশগুল। চোখে তাদের অনেক স্বপ্ন। সেই স্বপ্নে নেতিবাচকতার কোনও স্থান নেই। তাদের স্বপ্নে শুধুই স্কুল, ফেলে আসা বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয় পরিজন।
হাসপাতালের দুটি ওয়ার্ড শিশুদের। বেলুনে সাজানো। কার্টুন চরিত্র, খেলনা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। নার্সরা জানালেন, বেশিরভাগ বাচ্চাই রোগের সঙ্গে লড়াই করে ফিরে যায়। প্রথম দিকে রোগ নির্ণয় হলে সেরে ওঠার সম্ভবনা প্রায় ৯০ শতাংশ। সেখানেই শুয়ে রয়েছে পাঁচ বছর বয়সি বিদিশা (নাম পরবর্তিত)। ছুঁচের দাগে সারা শরীরটা কালো, মুখ ফুলে চোখ দুটোকে প্রায় ঢেকে দিয়েছে। কিন্তু।মুখে হাসি তার। মাথায় ছোট ছোট দুটো বিনুনি বেঁধে দিয়েছে মা।
দার্জিলিং থেকে তিন বছরের মেয়েকে নিয়ে এসেছেন এক দম্পতি। যে বয়সে বাচ্চারা কথা শেখে, সেই বয়সেই লিউকোমিয়া ধরা পড়ে আরাধ্যা থাপার (নাম পরিবর্তিত)। রাজ্যের মধ্যে ক্যান্সারের চিকিৎসার কম খরচ ঠাকুরপুকুরের এই হাসপাতালে। তাই এখানেই নিয়ে এসেছেন।
আরাধ্যার মা বললেন, 'ন মাস ধরে রয়েছি। মেয়ে চিকিৎসায় সারা দিচ্ছে। অনেক উন্নতি হচ্ছে। আশাকরি সেরে উঠবে।' তাঁর কথা শেষ হওয়ার আগেই আরাধ্যা কোল থেকে নেমে ছুটে হাঁস দেখতে চলে গেল। তার মনেই নেই যে, গতকালই তার কেমোথেরাপি হয়েছে। অগত্যা পেছনে ছুটলেন তাঁর বাবা।
ঠাকুরপুকুরের এই হাসপাতালে বাইরের কোনও কোলাহল নেই। সবুজ লন, বেশকিছু জলাশয় রয়েছে। রয়েছে বাচ্চাদের খেলার মাঠ। সবজি চাষ হয় হাসপাতালেই। সেই সবজিই দেওয়া হয় রোগীদের।
ওয়ার্ডগুলিতে গিয়ে দেখা গেল নার্সরা নম্রতা, আদিত্য, আরাধ্যাদের দেখভাল করছেন মাতৃস্নেহে। কত আবদার তাঁদের! পাশেই বড়দের ওয়ার্ড। সেখানে দেখা গেল নির্লিপ্ত কিছু মুখ।
ওয়ার্ডের বাইরে রয়েছে ওই শিশুদের আঁকা ছবি। কেউ এঁকেছে ক্রিকেটের মাঠ। কেউ হাত ধরে বাবা-মার। কেউ এঁকেছে স্কুল। চিকিৎসকরা জানালেন, বাচ্চারা আসলে জানেনা ক্যান্সার কী? সেজন্যই তাঁদের কোনও ভয় নেই। সেজন্যই ওদের সেরে ওঠার সম্ভবনা প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় অনেক বেশি। ওদের কোনও ভয় নেই। ভয় পেলে কোনও ওষুধেই কাজ করবে না।
চিকিৎসক অঞ্জন গুপ্ত বললেন, 'বাচ্চাদের জন্য ৪২টা বেড রয়েছে। এখানে প্রথম স্টেজে নিয়ে এলে সেরে ওঠার সম্ভবনা ৮৫ শতাংশ। বাচ্চারা যাতে আনন্দে থাকে সেজন্য সবরকম ব্যবস্থা রয়েছে। অডিটোরিয়ামে বাচ্চারা নাটক করে। গান-নাচ, আঁকা এসবের মধ্যেই চিকিৎসা হয়। বাচ্চা কেমো নিয়ে এসে ছবি আঁকে। মিউজিক থেরাপিস্ট রাখা হয়েছে। এই হাসপাতালে একটা আনন্দমুখর পরিবেশ। সরোজ গুপ্তর স্বপ্নকেই আমরা বয়ে চলেছি।'
ফাল্গুনের বেলা ঝুপ করে পড়ে যায়। বিশাল হাসপাতাল কম্পাউন্ড। রঙ-বেরঙের বোগেনভেলিয়া। সাজানো বাগান। ঘাসে ভরা লন। অদূরে কোনও বৃদ্ধকে স্ট্রেচারে করে শববাহী গাড়িতে তোলা হচ্ছে। কিন্তু একই 'ক্ষত' নিয়ে বাচ্চারা ছুটছে, খেলছে হই হই করে। দূরে দাঁড়িয়ে তাদের বাবা-মার মুখেও হাসি খেলছে। অকুতোভয় বাচ্চাদের মতো তাঁদের মনেও হিমালয়সম বিশ্বাস, ওরা ঠিক হয়ে যাবে।