দ্য ওয়াল ব্যুরো: এ ব্যথা কি যে ব্যথা বোঝে কি আনজনে!
না গলদা চিংড়ির ব্যথা কেউ বুঝল না! যতই বলা হোক জলের পোকা। কিন্তু ব্যথা-বেদনা তাদেরও আছে ষোলোআনা। যন্ত্রণায় ছটফট করে তারাও। কেটেছড়ে গেলে সেই ক্ষত ঢাকার চেষ্টাও করে। বিপদ বুঝলে সেই দিকে মোটেও যায় না। এমনটাই দাবি বিজ্ঞানীদের।
সরীসৃপ, খেচড় থেকে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের ব্যথা-বেদনা নিয়ে কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু তাদের থেকেও একটু নীচু শ্রেণির সন্ধিপদ অর্থাৎ কীট-পতঙ্গদেরও যে ব্যথা-বেদনা থাকতে পারে সেটা নিয়ে দ্বিমত আছে বিজ্ঞানী মহলেও। সেই ২০০০ সালের গোড়া থেকেই দেশীয় গলদা চিংড়ি আর বিদেশি নানা গোত্রের বড়সড় লবস্টারদের যে ব্যথা থাকতে পারে সেই নিয়ে বিস্তর তর্ক-বিতর্ক, পরীক্ষানিরীক্ষা হয়েছে চলছে। সমালোচনার শুরু অবশ্য তারও আগে থেকে।
ব্যথা লাগলে সাড়া দেয় লবস্টাররা, ছটফট করে যন্ত্রণায়
কুইন’স ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক-গবেষক ডঃ রবার্ট এলউড তাঁর দীর্ঘকালীন গবেষণায় বলেছিলেন, ব্যথা লাগলে সাড়া দিতে পারে গলদা বা লবস্টাররা। অনেক সময় দেখা গেছে ফুটন্ত জলে ফেললে তাদের লেজ সাঙ্ঘাতিক ভাবে নড়াচড়া করে। কোনও জায়গায় ক্ষত তৈরি হলে বড় দাঁড়া দিয়ে সেই ক্ষতস্থান ঢাকার চেষ্টাও করে তারা। ১০-১৫ বছরের গবেষণায় এই তথ্য সামনে এনেছিলেন তিনি।
[caption id="attachment_179886" align="aligncenter" width="600"]
হলুদ নড হল ডেকাপডের নার্ভাস সিস্টেম[/caption]
ডঃ রবার্ট শুধু নন, পরবর্তীকালে বিশ্বের অনেক গবেষকই দাবি করেছিলেন যন্ত্রণার অনুভূতি আছে লবস্টারদের। সেই প্রতিক্রিয়ার প্রমাণও মিলেছে হাতেনাতে। অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের ব্যথা থাকতে নেই এ চিরন্তন ধারণা ভেঙে দিয়ে বিস্তর বিতর্কেও জড়িয়েছিলেন তাঁরা। প্রমাণ হিসেবে যে যুক্তিগুলো খাড়া করেছিলেন বিজ্ঞানীরা সেগুলি হল—
- নেগেটিভ স্টিমুলাস বা বাইরে থেকে আঘাত আসলে অমেরুদণ্ডীদের শরীরও সাড়া দেয়। লবস্টারের ক্ষেত্রেও তা ব্যতিক্রম নয়।
- ব্রেন না থাকলেও তাদের নার্ভাস সিস্টেম আছে এবং সেন্সর রিসেপটর আছে।
- নিজেদের রক্ষা করার কৌশল তারা জানে। এমনকি এও দেখা গেছে ক্ষতস্থান বাঁচিয়ে চলার প্রবণতা এদের আছে।
আশ্চর্যজনকভাবে দেখা গেছে লবস্টারদের মতো অন্য ডেকাপড যেমন কাঁকড়া বা শ্রিম্পের মধ্যে এই প্রবণতা নেই। এই গবেষণা সামনে আসার পরে পৃথিবীর অনেক দেশেই জীবন্ত লবস্টার ফুটিয়ে রান্না করা বা জীবন্ত অবস্থায় তাদের খুঁচিয়ে মারার প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেছে।
গলদা চিংড়ির ব্যথা নিয়ে মাথাব্যথা বিশ্বের তাবড় বিজ্ঞানীমহলে
লবস্টার ইনস্টিটিউট অব মেন-এর বিজ্ঞানীরা তো সাফ বলেই দিয়েছেন গলদা চিংড়ির নার্ভাস সিস্টেম আছে কিন্তু স্তন্যপায়ীদের মতো মস্তিষ্কের জটিল গঠন নেই, অতএব ব্যথার অনুভূতি থাকতেই পারে না। তাদের রিসেপটর বাইরের উত্তেজনাপ সংস্পর্শে এলে সাড়া দেয় মাত্র। যুক্তি হিসেবে
লবস্টার ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী রবার্ট বেয়ার বলেন, ‘‘মশাও তো সন্ধিপদ। মশা মারার সময় কি আমাদের এমন চিন্তা আসে? তাহলে গলদা চিংড়ি বা লবস্টারদের নিয়ে এত মাথাব্যথা কেন!’’ তাঁর দাবি, লবস্টার রান্না মানে মনে করতে হবে বড়সড় কোনও কীটকে রান্না করা হচ্ছে, আর কিছুই নয়। ২০০৫ সালে নরওয়ের একদল বিজ্ঞানীও এমনটাই দাবি করেন।

গলদাদের ব্যথা নিয়ে হইচই শুরু হয় ২০০৬ সালে। পৃথিবীর অনেক খোলা বাজারেই জীবন্ত লবস্টার বিক্রি বন্ধ হযে যায়।
পেটা (PETA) দাবি করে, গরম জলে জীবন্ত ফুটিয়ে রান্না করা হয় লবস্টার যেটা নৈতিকতার বিরুদ্ধে। কারণ ওদেরও ব্যথার অনুভূতি আছে। অনেক দেশেই প্যাকেটবন্দি মৃত লবস্টার রান্না হয় না। জীবন্ত অবস্থাতেই তাদের খুঁচিয়ে মেরে বা হাত-পা ছিঁড়ে মেরে তবে রান্না করা হয়। জীবন্ত অবস্থাতেই তাদের মাইক্রোওয়েভে ঢুকিয়ে রান্না করার পদ্ধতিও চালু কোনও কোনও দেশে।

কানাডার লবস্টার কাউন্সিলের বিজ্ঞানী গ্রেগ আরভিন বলেছেন, "এই গবেষণায় আমরা একমত। অনেকেই বিষয়টা হাসি-মজা ভেবে উড়িয়ে দিচ্ছেন, কিন্তু ডেকাপড বলে নৃশংসভাবে লবস্টার-হত্যা বন্ধ হওয়া উচিত। " এই ব্যাপারে লবস্টার কাউন্সিলের তরফ থেকে একটি গাইডলাইনও সামনে আনা হয়।

তর্ক-বিতর্ক থামে নি। গলদা চিংড়ির ব্যথা নিয়ে মাথাব্যথাও কমেনি। ২০১৭-১৮ সালের মধ্যে সুইৎজারল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, ইতালি-সহ বিশ্বের কয়েকটি দেশে জ্যান্ত লবস্টার রান্না বন্ধ হয়ে যায়। হালে সুইৎজারল্যান্ডের সরকার আইন করে লবস্টারদের জ্যান্ত সিদ্ধ করে বা ঝলসিয়ে রান্না করা নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে এমন একটি যন্ত্র আনা হয়েছে যেগুলি ৬ সেকেন্ডের মধ্যে লবস্টারদের মারতে পারে। যন্ত্রণা দিয়ে নয় বরং জলের চাপ বাড়িয়ে।
গবেষণা, বিতর্ক থামবে না। যুক্তি-পাল্টা যুক্তি খাড়া হবেই। তাই বলে গলদা বা লবস্টার বিক্রি বা খাওয়া কোনওটাই বন্ধ হবে না। লেখক ট্রিভেন করসন তো গলদাদের ব্যথা নিয়ে ‘দ্য সিক্রেট লাইফ অব লবস্টার’ নামে একটা বই লিখে ফেলেছেন। যেখানে লবস্টারদের যন্ত্রণা কমানোর অনেক উপায় লেখা আছে।