দ্য ওয়াল ব্যুরো: ডাইনোসরের মাথায় উকুন! পালকে উকুনের ডিম! এ কী সর্বনেশে কথা!
জুরাসিক পার্কে দেখা সেই বিশাল, দাঁত বার করা টি-রেক্সেরও হয়তো মাথা চুলকাত। লম্বা ডানা আর্কিওপটেরিক্স বা টেরর-বার্ড ‘বৃহচ্চঞ্চু’ অ্যাণ্ডালগ্যালর্নিস মাঝেমধ্যেই হয়তো ডানা ঝাঁকিয়ে, পালক উঁচিয়ে গা চুলকানোর চেষ্টা করত! কারণ উকুনের সমস্যায় জেরবার ছিল ডাইনোসররাও। না কোনও কৌতুক বা মিম নয়। জুরাসিক যুগেও যে বহাল তবিয়তে বাস করত উকুনরা এবং দিব্যি কুটকুট করে কামড়াত ডাইনোসরদের, তা রীতিমতো প্রমাণ করে দেখিয়েছেন মার্কিন বিজ্ঞানীরা। চিন, জাপান, রাশিয়ার বিজ্ঞানীরাও সহমত। আর হবে নাই বা কেন, পেল্লায় সেই উকুনের জীবাশ্ম একেবারে টাটকা, তাজা হাতে এসেছে বিজ্ঞানীদের।

ডাইনোসরদের সঙ্গে যখন ওঠাবসা ছিল তখন নেহাত ছোটখাটো উকুন নয়, সেটা বোঝাই যাচ্ছে। জুরাসিক যুগের এই উকুন দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে-উচ্চতায় আজকের যুগের উকুনদের কাছে একেবারেই দৈত্যের মতো। ডাইনোসরের জীবাশ্মের মধ্যেই চিড়েচ্যাপ্টা হয়ে হয়ে তাদেরও জীবাশ্ম নজরে এসেছে বিজ্ঞানীদের। ওই জীবাশ্ম ছিল এক ডানাওয়ালা ডাইনোসরের। সুতরাং তার গায়ের লোম ও পালকের মধ্যেই যে ওই উকুন বাসা বেধেছিল সেটা স্পষ্ট। এই উকুনের জীবাশ্মের ছবি ও তথ্যপ্রমাণ সহ ‘নেচার কমিউনিকেশন’ জার্নালে প্রকাশিত হওয়ার পরেই হইচই পড়ে যায় বিজ্ঞানীমহলে।
ডাইনোসরের ওই জীবাশ্মের খোঁজ মিলেছিল বহুদিন আগেই, জানিয়েছেন ইউনিভার্সিটি অব নেভাদার জীবাশ্মবিদ জুলি অ্যালেন। মায়ানমার থেকে ওই ডাইনোসরের জীবাশ্মের খোঁজ মেলে। অ্যালেন বলেছেন, “ডাইনোসরের জীবাশ্ম নিয়ে রেডিও কার্বন পদ্ধতিতে গবেষণা চালাচ্ছিলাম আমরা। তখনই নজরে আসে ওই উকুন। প্রথমে মনে হয়েছিল পোকার মতো কিছু। পরে পরীক্ষা করে দেখা যায় সেটা সত্যিই উকুন, আকারে বৈশিষ্ট্যে এখনকার যুগের থেকে আলাদা হলেও, তার গণ এবং প্রজাতি এক।”
ইউনিভার্সিটি অব নেভাদার বিজ্ঞানীরা বলেছেন, উত্তর মায়ানমারের হুকাং ভ্যালিতে প্রায় ১০ কোটি বছরের পুরনো দুটো অ্যাম্বার উদ্ধার হয়েছে যার মধ্যে ১০টি এমন উকুনের জীবাশ্মের খোঁজ মিলেছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন এদের স্বভাব-বৈশিষ্ট্য একরকম হলেও সামান্য প্রভেদ রয়েছে, যার ভিত্তিতে এদের দুটো ক্যাটাগরিতে ফেলা যেতে পারে।

ডাইনোসরের মাথায় উকুন—এমন খোঁজ মেলার পর থেকে হইচই পড়ে গেছে রাশিয়া ও চিনের বিজ্ঞানীদের মধ্যেও। উকুনের জেনেটিক বিশ্লেষণ করেছেন বেজিংয়ের ক্যাপিটাল নর্মাল ইউনিভার্সিটির জীবাশ্মবিদ তাইপিং গাও, ডোং রেন এবং চাংগুন শি। গবেষকরা বলেছেন এই উকুন প্রায় ২ মিলিমিটার লম্বা। ডানা নেই, মোটা অ্যান্টেনা। মুখের আদল এখনকার উকুনের মতো নয়। অনেক বড় এবং দেখতেও বেশ ভয়ঙ্কর। শক্ত চোয়ালে রয়েছে ধারালো দাঁত, ছটা পায়ে রয়েছে নখ। এই প্রজাতির নাম দেওয়া হয়েছে মেসোফথিরাস এঙ্গেলি (Mesophthirus engeli)।
চমকের শেষ এখানেই নয়। এই মেসোফথিরাসরা স্বভাবে এখনকার উকুনের মতোই। লম্বা পালকের গোড়ায় যেমন বাসা বাঁধত, তেমনি পালকের আগা থেকে গোড়া সবই কুরে কুরে খেয়ে নষ্ট করত। বিজ্ঞানীদের ধারণা, ধারালো দাঁতে এরা জব্বর কামড় বসাত ডাইনোসরের মাথায়। প্রায় ১০ কোটি বছর আগেও উকুনের অস্তিত্ব ছিল পৃথিবীতে এই খোঁজ অনেক গবেষণার ভিত্তিই বদলে দেবে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এই মেসোফথিরাসরা একরকম এক্টোপ্যারাসাইট (Ectoparasite) যারা শরীরের বাইরের অংশেই সাংসার পাততে ভালবাসে। খুব দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে ছড়িয়ে পড়ে গোটা শরীরেই। আর ডানাওয়ালা ডাইনোসরদের তো দুঃখের শেষ নেই। পালক দেখলেই গুটিগুটি গিয়ে জমিয়ে বসত ওই মেসোফথিরাসরা। তারপরেই শুরু হত কুটকুট, খচখচ।

তবে এই মেসোফথিরাসরা যে দৈর্ঘ্যে ২ মিলিমিটারই হত সে ব্যাপারে এখনও নিশ্চিত নন বিজ্ঞানীরা। চাংগুন শি বলেছেন, হতেই পারে জীবাশ্মে যে মেসোফথিরাস মিলেছে সেটি পূর্ণবয়স্ক মেসোফথিরাসের বাচ্চা। আরও নানা ডাইনোসরের জীবাশ্ম পরীক্ষা করতে করতে সেই সম্ভাবনাই ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। তার মানে জুরাসিক যুগে বয়স্ক উকুনরা আড়েবহরে ঠিক কতটা হত সেটা ভাবলেই চমক হচ্ছে বিজ্ঞানীদের।
গাছের আঠায় আটকে থাকা একটি ছোট্ট মশা। তার শরীরে থাকা কয়েক ফোঁটা রক্ত। সেখান থেকে ডিএনএ বার করে জুরাসিক পার্কের কল্পবিজ্ঞান আস্ত ডাইনোসর বানিয়ে ফেলেছিল। তা হলে দশ কোটি বছর আগের উকুন এবং তার শরীর থেকে পাওয়া ডাইনোসরের ডিএনএ দিয়ে কী অবাক কাণ্ড ঘটতে পারে সেটা নিয়ে অবশ্য এখনও মুখ খোলেননি বিজ্ঞানীরা।
ছবি সূত্র-- বেজিংয়ের ক্যাপিটাল নর্মাল ইউনিভার্সিটির জীবাশ্মবিদ তাইপিং গাও।