
শেষ আপডেট: 29 August 2023 12:34
আকাশ ঘোষ
উত্তর কলকাতার (North Kolkata) বিধান সরণি হল ইতিহাসের খনি। বহু বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে এক একটি গল্প। এক বিধান সরণিতেই আছে বিবেকানন্দের বাসভবন। বিবেকানন্দের বাড়ির উল্টোদিকেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বই প্রেমীদের অন্যতম ঠিকানা। ৪২, বিধান সরণি, কলকাতা। সবার কাছে ঠিকানাটা পরিচিত না হলেও বইপ্রেমীদের কাছে এটি 'ডি এম লাইব্রেরি' (D M Library) নামে খ্যাত। যাঁরা চেনেন না তাঁদের কাছে মনে হতেই পারে যে শহরের বুকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা লাইব্রেরিগুলোর মতো এ আর এক কোনও লাইব্রেরি। তবে সাহিত্য জগতের কাছে এটি সম্পদ। নামের শেষে লাইব্রেরি থাকলেও, এটা কোনও বই পড়ার গ্রন্থাগার নয়। এই লাইব্রেরি হল এক অন্যতম প্রকাশনা সংস্থা। পুরোনো বইয়ের খনি।
রাস্তার ওপর দুটো ঘর নিয়ে এই দোকান। ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই বোঝা যায় এটি সাধারণ কোনো দোকান নয়, বহু ইতিহাসের জন্ম এই লাইব্রেরি থেকে। দোকানে থাকা প্রতিটি জিনিসের সঙ্গে যুক্ত আছে এক একটি ইতিহাস। মন ভাল করে দেওয়ার ইতিহাস।
শতবর্ষ উপলক্ষ্যে ডি এম লাইব্রেরির নতুন লোগোও প্রকাশিত হয়। নতুন প্রকাশিত বইয়ে জ্বলজ্বল করবে সেই লোগো। ১০০ বছরের উল্লেখ আছে তাতে। আর আছে এই লাইব্রেরির হীরক জয়ন্তী উপলক্ষ্যে পূর্ণেন্দু পত্রীর হাতে তৈরি করা লোগোর ছোঁয়াও থাকছে শতবর্ষে।
১০০ বছর আগে এই শহরের বুকে নতুন বইয়ের ব্যবসা শুরু করেন গোপালদাস মজুমদার। সঙ্গী বন্ধু বিধুভূষণ দে। তাঁরা তখন দুজনেই 'বিজলী' পত্রিকায় কর্মরত। সেখান থেকেই যাত্রা শুরু 'ডি এম লাইব্রেরি'। পরে বিধুবাবু বন্ধুর হাত ছেড়ে দিলেও দোকানের নামের থেকে 'ডি' বাদ দেননি গোপালদাস মজুমদার। পরে ৬১ নম্বর কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের ছোট্ট দোকানে বইয়ের সম্ভার সাজান গোপালদাস মজুমদার।
সেই পথ চলা শুরু। হাজার ঝড় ঝাপটা সামলে দোকানটিকে আগলে রেখেছেন। শুরু করেছিলেন বই ছাপার কাজ। বারীন্দ্রকুমার ঘোষের লেখা বই ‘বারীন্দ্রের আত্মকাহিনী’, শচীন সেনগুপ্তের ‘চিঠি’, বারীন্দ্রের ‘মুক্তির দিশা’, নলিনী গুপ্তের ‘স্বরাজ গঠনের ধারা’ আর সুরেশ চক্রবর্তীর একটি কবিতার বই।
এইভাবেই চলতে চলতে নজরুল ইসলামের সঙ্গে পরিচয় গোপালদাসের। ব্যস, তারপর ইতিহাস। নজরুল ইসলামের একের পর এক সৃষ্টি বেরোত এই প্রকাশনা থেকে। নজরুল ইসলাম আর ডি এম লাইব্রেরি হয়ে উঠল পরিপূরক। নজরুলের যে কোনও বই পাওয়ার ঠিকানা এই লাইব্রেরি।
নজরুল ইসলামের সঙ্গে তাঁর জেঠা গোপালদাস মজুমদার ও ডি এম লাইব্রেরির সম্পর্ক বোঝাতে গিয়ে আশিসবাবু জানান, "এই প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে কবির ছিল আত্মীয়তার সম্পর্ক। তাঁর বই ছাপানো আমাদের কাছে আবেগ।" তাই নতুন করে 'অগ্নিবীণা' ছাপিয়েছেন তিনি। সেখানেই রেখে দিয়েছেন এই বইয়ের প্রথম সংস্করণের প্রচ্ছদটিও। তিনি জানান, "অনেকেই জানেন যে সেই প্রচ্ছদ নাকি অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা। তবে সেটি ভুল। সেই উল্লেখ আছে এই নতুন সংস্করণে"।
নতুন লেখকদের আশ্রয় ছিলেন গোপালদাস মজুমদার। সেই সময় কল্লোল গোষ্ঠীর লেখকদের লেখা ছাপিয়েছিলেন তিনি। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র, শৈলজাননন্দ, অন্নদাশঙ্কর, বনফুল, বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, মণীন্দ্রলাল বসু, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, সুকুমার সেন, জাহ্নবী কুমার চক্রবর্তীর বইও ছাপা হত এই প্রকাশনায়। নিত্য যাতায়াত ছিল তাঁদের এই ছোট বইয়ের দোকানে। এমনকি নজরুল ইসলামকে কোথাও পাওয়া না গেলে এখানেই খুঁজতে আসতেন সবাই। পরিচিত জনেরা বলতেন, নজরুল ইসলামকে খুঁজছেন? একবার ডি এম লাইব্রেরিতে যান। ওখানে পেয়ে যাবেন।
দোকানে আসা এক ক্রেতা সৌরভপ্রভ চ্যাটার্জীর স্কুল জীবন থেকেই এই দোকানে আনাগোনা। বইয়ের খোঁজে মাঝে মধ্যেই তিনি পাড়ি দেন এখানে। এই দোকানের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, "এই দোকানে পুরনো বইয়ের দাম খুব কম।" পরে কথাটার ব্যাখ্যা দিলেন আশিসবাবু। তিনি বলেন, "আমাদের কাছে পুরোনো সংস্করণের যা বই আছে তাতে মুদ্রিত যা দাম সেই দামই নি বা যদি বাঁধাইয়ের প্ৰয়োজন হয় তবে সেইটুকু টাকা।"
১৯৬৭ থেকে এই দোকানের সঙ্গে যুক্ত সোমনাথ বসু জানান, "এই দোকানই আমার সব। বাড়িতে থাকতে ভালই লাগে না। আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রফুল্ল রায়, রমাপদ সবার বাড়িতেই যাতায়াত করতাম। কখনও প্রুফ দেখাতে আবার কখনও প্রুফ আনতে।"
ইতিহাস এভাবেই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে এই দোকানের সঙ্গে। 'বিজলী' পত্রিকাকে দেওয়া চিত্তরঞ্জন দাসের একটি বইয়ের আলমারি, টেবিল চেয়ার আসে গোপালদাস মজুমদারের কাছে। এখনও সেই আলমারি শোভা পাচ্ছে দোকানের সামনে। যেন এক জীবন্ত ইতিহাস প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে। আর পাহারা দিচ্ছে ডি এম লাইব্রেরিকে।
শয্যাশায়ী প্রমীলা দেবী রাঁধতেন স্বামী নজরুলের জন্য, প্রেম দেখে মুগ্ধ হন সন্ধ্যা