দ্য ওয়াল ব্যুরো: করোনা প্রতিরোধে বেশ কিছু অ্যান্টি-ভাইরাল ওষুধের পরীক্ষামূলক প্রয়োগে সম্মতি দিয়েছে কাউন্সিল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ (সিএসআইআর)। তার মধ্যে রয়েছে জাপানি অ্যান্টি-রেট্রোভিয়াল ওষুধ ফ্যাভিপিরাভির, সেপসিসের ওষুধ সেপসিভ্যাক ও লিভার সিরোসিস প্রতিরোধী ওষুধ। ফ্যাভিপিরাভিরের ক্লিনিকাল ট্রায়াল শুরু করছে মুম্বইয়ের গ্লেনমার্ক ফার্মাসিউটিক্যালস। এবার সেপসিসের ড্রাগ সেপসিভ্যাকের ট্রায়ালের জন্য সবুজ সঙ্কেত দিয়েছে সিএসআইআর।
২০০৭ সালেই ক্যাডিলা ফার্মাসিউটিক্যালসের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে এই ওষুধ তৈরি করেছে সিএসআইআর। করোনা সংক্রমণ কমাতে সেপসিভ্যাক কীভাবে কাজে আসতে পারে সেই নিয়ে গবেষণাও চলছিল সিএসআইআরে। ব্যাকটেরিয়াঘটিত সংক্রমণ সেপসিসের এই ওষুধকে সার্স-কভ-২ আরএনএ (RNA Virus)ভাইরাসের প্রতিরোধী করে সংশ্লেষ করা হচ্ছিল। সিএসআইআর জানিয়েছে, এই ওষুধ এবার ট্রায়াল করা যেতে পারে। তবে উপসর্গহীন করোনা রোগী এবং যাঁরা সেরে উঠেছেন তাঁদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে প্রথম প্রয়োগ করা হবে এই ওষুধ।
সিএসআইআর-ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ইনটিগ্রেটিভ মেডিসিন (CSIR-IIIM)-এর ডিরেক্টর রাম এ বিশ্বকর্মা
চণ্ডীগড়ের ‘পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ’ (PGIMER)-এ এই ওষুধের ট্রায়াল শুরু হবে। সিএসআইআর-ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ইনটিগ্রেটিভ মেডিসিন (CSIR-IIIM)-এর ডিরেক্টর রাম এ বিশ্বকর্মা বলেছেন, “তিনরকম ভাবে ট্রায়াল হবে এই ওষুধের। করোনার সংক্রমণ কতটা কমাচ্ছে এই ওষুধ সেটা যেমন দেখা হবে, তেমনি পরীক্ষা করা হবে এই ওষুধের প্রভাবে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কতটা বাড়ছে।” ডিরেক্টর বিশ্বকর্মা বলেছেন, পিজিআইএমইআর-এর ট্রায়াল সফল হলে দিল্লি এইমস ও ভোপাল এইমসে এই ওষুধের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ শুরু হবে।
তিনরকম ট্রায়াল হবে সেপসিসের ওষুধ সেপসিভ্যাকের
সিএসআইআর জানিয়েছে, প্রথমত, কোভিড পজিটিভ কিন্তু উপসর্গ নেই এমন রোগীদের শরীরে এই ওষুধের প্রভাব কেমন সেটা পরীক্ষা করে দেখা হবে। গবেষকরা বলছেন, বাহ্যিক কোনও লক্ষণ নেই কিন্তু শরীরে সংক্রমণ রয়েছে এমন রোগীরাই চিন্তার কারণ। উপসর্গ দেখা না গেলে সংক্রমিত হয়েছে কিনা সেটা বোঝা যায় না, ফলে ভেতরে ভেতরে ভাইরাসের বাড়বৃদ্ধি হতে থাকে।
দ্বিতীয়ত, করোনার সংক্রমণ সারিয়ে সুস্থ হয়েছেন এমন রোগীকে খাওয়ানো হবে এই ওষুধ। গবেষকরা বলছেন, সংক্রমণ সারলেও শরীরে প্রায় একমাসের মতো ভাইরাস সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে। সেটা রোগীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার উপরেও অনেকটা নির্ভর করে। যদি শরীর ভাইরাস সম্পূর্ণ নির্মূল করতে না পারে তাহলে রোগ ফিরে আসার আশঙ্কা থেকে যায়। তাই সুস্থ হয়ে ওঠাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সেপসিভ্যাকের নির্দিষ্ট ডোজ খাওয়ানো হবে।

তৃতীয়ত, সঙ্কটাপন্ন করোনা রোগীদের উপরে এই ওষুধের প্রভাব কতটা সেটাও যাচাই করা হবে।
কীভাবে কাজ করবে এই সেপসিভ্যাক?
রাম এ বিশ্বকর্মা বলেছেন, সেপসিভ্যাক আসলে ‘
ইমিউনোমডিউলেটর’ (Immunomodulator) । যার কাজ হল শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো। সাধারণত এই ভাইরাসের সঙ্গে লড়তে দু’রকমের পদ্ধতি নেওয়া হচ্ছে। বিশ্বকর্মা বলেছেন, এক হল ভাইরাস প্রতিরোধী ওষুধ বা ভ্যাকসিন বানানো, দুই হল কোনও ইমিউনোমডিউলেটর দিয়ে শরীরের রোগ প্রতিরোধ এমনভাবে বাড়ানো যাতে শরীর ভাইরাসকে হারাতে শক্তিশালী অ্যান্টিবডি তৈরি করতে পারে।
সেপসিভ্যাক মূলত ইমিউনো থেরাপির জন্যই কাজে লাগে। সেপসিস হল গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়াঘটিত এমন এক সংক্রামক রোগ যা শরীরের নানা অঙ্গে প্রদাহ তৈরি করে। কোভিড-১৯ সংক্রমণের ধরনও অনেকটাই তাই। গবেষকরা বলছেন, এই ওষুধ তৈরি করা হয়েছে
মাইকোব্যাকটেরিয়াম ডব্লিউ (Mycobacterium w) নামক ব্যাকটেরিয়াকে কাজে লাগিয়ে। এই ব্যাকটেরিয়াকে অধিক তাপে নিষ্ক্রিয় করে তার প্রোটিনগুলোকে (সারফেস প্রোটিন)কাজে লাগিয়ে এই ওষুধ সংশ্লেষ করা হয়েছে। এই ব্যাকটেরিয়ার প্রোটিন শরীরে এমন এক অ্যান্টিবডি তৈরি করে যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে অনেকটাই বাড়াতে পারে। সেই প্রক্রিয়াকেই কাজে লাগিয়ে সেপসিভ্যাককে ডিজাইন করা হয়েছে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, কোভিড-১৯ সংক্রমণে শরীরে যে
সাইটোকাইন ঝড় (Cytokine Storm) তৈরি হয় তাকে থামাতে পারে এই সেপসিভ্যাক। সাইটোকাইন এমন এক প্রোটিন যার কাজ হল ঝড়ের গতিতে শরীরের কোষে কোষে বিপদ সঙ্কেত পৌঁছে দেওয়া। বাইরে থেকে কোনও সংক্রামক জীবাণু শরীরে প্রবেশ করলে এই সাইটোকাইন সেই বার্তা কোষে পৌঁছে দেয়। এই প্রোটিনের ক্ষরণে তারতম্য হলে উল্টে কোষেরই ক্ষতি হয়। দেখা গেছে সার্স-কভ-২ ভাইরাল স্ট্রেন শরীরে ঢুকলে সাইটোকাইন ক্ষরণ অনেক বেড়ে যায। যার কারণে কোষে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়। প্রদাহ শুরু হয় শরীরে নানা অঙ্গে। সাইটোকাইনের অধিক ক্ষরণ এক্ষেত্রে কোষেরই বিনাশ ডেকে আনে। কোভিড-১৯ পজিটিভ রোগীদের ক্ষেত্রেও এমনটাই হচ্ছে। বিশ্বকর্মা বলেছেন, সেপসিভ্যাক এই সাইটোকাইন স্টর্মকে আটকাতে অনেকটাই সাহায্য করবে।