দ্য ওয়াল ব্যুরো: জিনের গঠন বদলাচ্ছে করোনাভাইরাস, গবেষণায় এমন দাবি করেছিলেন ভাইরোলজিস্টরা। ২০১৯-এনকভ (2019-nCOV) ভাইরাসের যে গঠন দেখা গিয়েছিল তার থেকে সার্স-কভ-২ ভাইরাল স্ট্রেনের জিনের গঠন অনেকটাই আলাদা। বার বার জিনের গঠন বদলে বা জেনেটিক মিউটেশনের ফলে এই আরএনএ ভাইরাস এখন অনেক বেশি সংক্রামক।
কাউন্সিল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ (সিএসআইআর) জানিয়েছে, যতবার জিনের গঠন বদলাবে ভাইরাস, ততবারই যদি তার জিনোমের সিকুয়েন্স বা জিনের গঠন বিন্যাস চিহ্নিত করে ফেলা যায় তাহলে তার প্রতিরোধের ব্যবস্থা অনেক সহজ হয়ে যায়। এমন ৫৩ রকম জিনোম সিকুয়েন্সের ডেটাবেস বার করেছে সিএসআইআর।
ভাইরাল স্ট্রেনের এই জিনোম সিকুয়েন্স জমা করা হয়েছে
‘গ্লোবাল ইনিসিয়েটিভ অন শেয়ারিং অল ইনফ্লুয়েঞ্জা ডেটা’ (GISAID)-এ । এটি একটি আন্তর্জাতিক রিসার্চ অর্গানাইজেশন যা বিভিন্ন বায়োটেকনোলজি ফার্ম বা সায়েন্স ইনস্টিটিউটের সঙ্গে করে। ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস, কোভিড-১৯ সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য দেয় এই সংস্থা। সিএসআইআরের ডিরেক্টর শেখর সি মান্ডে বলেছেন, “সার্স-কভ-২ ভাইরাসের ৫৩ রকম জিনোম সিকুয়েন্স চিহ্নিত করা হয়েছে। ১৫ মে-র মধ্যে এমন ৪৫০ রকম জিনোম সিকুয়েন্স চিহ্নিত করে ফেলা যাবে।” তিনি জানান, ভাইরাস যতবারই তার জিনের গঠন বদলাক না কেন, এই প্রক্রিয়ায় বারবার তার জেনেটিক মিউটেশন চিহ্নিত করতে পারলে, তাকে রুখে দেওয়ার রাস্তা খুঁজে পাওয়া যাবে।

জিনোম সিকুয়েন্স হল জিনের গঠনকে চিহ্নিত করা। ভাইরাসের জিন কীভাবে সাজানো রয়েছে অর্থাৎ কীভাবে ডিএনএ নিউক্লিওটাইডের বিন্যাস হয়েছে সেটা বার করতে পারলেই বোঝা যাবে এই ভাইরাস কীভাবে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখছে। কীভাবে সংক্রামক হয়ে উঠছে এবং মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ার কৌশল বার করছে।
সিএসআইআর-এর ডিরেক্টর শেখর সি মান্ডে
ডিরেক্টর শেখর মান্ডে বলেছেন, ভাইরাসের জিনোম সিকুয়েন্স চিহ্নিত করার কাজে সিএসআইআরের অধীনস্থ সবকটি প্রতিষ্ঠানই কাজ করছে, যেমন
দিল্লির ইনস্টিটিউট অব জিনোমিক্স অ্যান্ড ইন্টিগ্রেটিভ বায়োলজি (আইজিআইবি), হায়দরাবাদের সেন্টার ফর সেলুলার অ্যান্ড মলিউকিউলার বায়োলজি (সিসিএমবি), চণ্ডীগড়ের ইনস্টিটিউট অব মাইক্রোবিয়াল টেকনোলজি।
আইজিআইবি-র ডিরেক্টর অনুরাগ আগরওয়াল বলেছেন, জিনোম সিকুয়েন্স ভাইরাসের উৎস খুঁজে পাওয়ার সহায়ক হবে। ধরা যাক কোনও নির্দিষ্ট এলাকা বা ক্লাস্টারের কোভিড রোগীদের শরীর থেকে নেওয়া নমুনায় যে ভাইরাল স্ট্রেন পাওয়া যাচ্ছে তার জিনোম সিকুয়েন্স বার করে ডেটা অ্যানালিসিস করা হল। আবার অন্য এলাকায় ঠিক এভাবেই ভাইরাল স্ট্রেনের জিনোম সিকুয়েন্স করা হল। এই প্রক্রিয়া চলতে থাকলে বোঝা যাবে ভাইরাস কোন জায়গায় কতটা সংক্রামক হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। বারেবারে জিনের গঠন বদলাতে বদলাতে একটা পর্যায়ের পরে আর এই বদল ঘটাতে পারে না ভাইরাস। তখন সে দুর্বল হতে থাকে। সেই পয়েন্টটা চিহ্নিত করতে পারলে বোঝা যাবে, ঠিক কখন ও কোন পর্যায়ে গিয়ে ভাইরাস দুর্বল হয়ে পড়ছে। সেটাই হবে তাকে প্রতিরোধ করার মোক্ষম কৌশল।

সিএসআইআরের মতো ঠিক এভাবেই সার্স-কভ-২ ভাইরাল স্ট্রেনের জিনের গঠন চিহ্নিত করছে
অ্যারিজোনা ইউনিভার্সিটি। গবেষকরা ৩৮২ জন কোভিড রোগীর শরীর থেকে ভাইরাসের নমুনা নিয়ে তার জিনের গঠন বার করেছেন। দেখা গেছে একজন রোগীর শরীরে যে ভাইরাল স্ট্রেন মিলেছে তার গঠন কিছুটা আলাদা। সেই ভাইরাল স্ট্রেনে বদল হয়নি, অর্থাৎ নির্দিষ্ট সেই রোগীর শরীরে গিয়ে ভাইরাস দুর্বল হয়েছে। গবেষকরা বলছেন, ২০০৩ সালে সার্স-ভাইরাসের সময়তেও এই পর্যায়টাকে চিহ্নিত করা গিয়েছিল যখন ভাইরাস তার জিনের গঠন বদলানো বন্ধ করতে শুরু করেছিল। এই পর্যায়টাকে ধরেই সার্স ভাইরাসের প্রতিষেধক বার করার চেষ্টা করেছিলেন গবেষকরা।
মোহালির ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ’ (আইআইএসইআর)-এর ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক-বিজ্ঞানী ইন্দ্রনীল বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, যে কোনও সাধারণ ভাইরাস ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে যদি তার ভিতরে একাধিক
মিউটেশন (Genetic Mutation) হয়। অর্থাৎ বদলে যায় জিনের গঠন। সাধারণ ফ্লু-এর ভাইরাসও তখন হযে উঠতে পারে প্রাণঘাতী। তেমনই কিছু ঘটে চলেছে করোনাভাইরাসের সঙ্গেও। এতবার সে নিজেকে বদলে ফেলছে যে এখন থেমে যাওয়ার ক্ষমতা তার নিজেরও নেই। এমনকি এই ‘মডিফায়েড’ ভাইরাসকে রোখার দাওয়াইও গবেষকদের অজানা। কারণ যে ওষুধ বা ভ্যাকসিনই দেওয়া হোক না কেন, ভাইরাস তার ধরন বদলে ফেললে সেই ভ্যাকসিন নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে। তবে বিজ্ঞানীরা এখন বলছেন, এই জেনেটিক মিউটেশনকে ধরতে গেলে বারেবারেই জিনোম সিকুয়েন্স করতে হবে, তাহলেই এই ভাইরাসের চিত্র আরও ভালভাবে বোঝা যাবে। এর প্রতিরোধী ভ্যাকসিন ও ড্রাগ তৈরির কাজ অনেকটাই সহজ হবে।