দ্য ওয়াল ব্যুরো: মোবাইল কেনার বায়না করেছিল সন্তান। না পেয়ে আত্মহত্যার মতো চরম কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছে। এই ধরনের খবর গত কয়েক বছরে বারবারই ঘুরে ফিরে এসেছে সংবাদমাধ্যমে। শুধু এসেছে নয়, বলা যায়, এই ধরনের খবর বেড়েওছে বেশ কিছু। আর বলাই বাহুল্য, মোবাইলের জন্য এই তীব্র বায়না বা আসক্তির মূল বিষয়বস্তু ইন্টারনেট।
হাতের মুঠোয় গোটা পৃথিবীকে বেঁধে ফেলার আকাঙ্ক্ষা মানুষের নতুন নয়। কিন্তু নতুন হল, যে কোনও সময়ে, যে কোনও বয়সে, যে কোনও বিষয়কে হাতে পেয়ে যাওয়া। শুধু নতুন নয়, খানিকটা বিড়ম্বনা বা বিভ্রান্তিরও। আর সে বিভ্রান্তি এড়ানো বয়সকালে যতটা সম্ভব, কমবয়সে ততটা নয়। ঠিক এই জায়গা থেকেই যথেচ্ছ ইন্টারনেটের ব্যবহার ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে ছোটদের জন্য।
এমনটাই জানাচ্ছে ক্রাই, 'চাইল্ড রাইটস অ্যান্ড ইউ'। সম্প্রতি দিল্লিতে তাদের বার্ষিক সেমিনারে এই বিষয়টিই আলোচিত হল বিস্তারিত ভাবে। তারা বলছে, ছোটদের মধ্যে এবং বয়ঃসন্ধিকালে মোবাইল ও ইন্টারনেটের ব্যবহার এত বেশি বাড়ছে, তা রীতিমতো মনিটর করা প্রয়োজন বলে মনে করছে ক্রাই।
তাদের রিপোর্ট বলছে, সমীক্ষা করে জানা গেছে, বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছনো ৯৩% বাচ্চাই বাড়িতে ইন্টারনেট ব্যবহার করার সুযোগ পায় শুধু দিল্লি ও তৎসংলগ্ন এলাকায়। তাদের মধ্যে প্রতি তিন জনের মধ্যে এক জন ইন্টারনেট জগতে খারাপ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হচ্ছে।
শুধু তাই নয়, বয়ঃসন্ধি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে ৪৮% বাচ্চাই ভোগে গুরুতর নেয়-আসক্তিতে। ৯০% শতাংশ ক্ষেত্রেই সিম কার্ড পাওয়ার ন্যূনতম বয়সের তোয়াকক্কা না করেই সিমকার্ড জোগাড় করে ফেলে কিশোর-কিশোরীরা। ৭৫% বাচ্চা ন্যূনতম বয়সে পৌঁছনোর আগেই সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যাকাউন্ট খুলে ফেলে। তাদের মধ্যে প্রতি পাঁচ জনের মধ্যে দু'জন 'বন্ধুর বন্ধু' কিনা দেখে অচেনা মানুষের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট করে নেয় নির্বিচারে। যা বিপদের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলে।
দিল্লি ও আশপাশের ৬৩০ জন কিশোর-কিশোরীর মধ্যে এই সমীক্ষা চালানো হয়। ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সের এই ছেলে-মেয়েদের মধ্যে আবার ৪০% ছেলেমেয়েই নিজেরা নিজেদের মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। তার মধ্যে অর্ধেক জনের আবার দুটো করে বা তার বেশি ফোনও আছে।
ক্রাই-এর রিজিওনাল ডিরেক্টর (নর্থ) সোহা মৈত্র এই প্রসঙ্গে বলেন, "এখনকার সময়ে বাচ্চাদের বড় করে তোলার ক্ষেত্রে অনলাইন নিরাপত্তা একটা জরুরিতম বিষয় হয়ে উঠেছে। 'ক্রাই' দেখেছে, একটি বাচ্চা ইন্টারনেট জগৎকে ঠিক ভাবে ব্যবহার করছে কিনা, কোনও বিপদে পড়ছে কিনা, নিজেকে সঠিক ভাবে প্রকাশ করছে কিনা, তা ভাল করে নজরে রাখার দায়িত্ব বাবা-মায়ের তো বটেই, সেই সঙ্গে সমাজ, প্রতিবেশী, রাষ্ট্রেরও। বাচ্চাদের অনলাই-জগৎকে খতিয়ে দেখতে গিয়ে এমনটাই বারবার মনে হয়েছে আমাদের।"
সোহা আরও জানান, বয়সের আগেই সাইবার স্পেসের নানা জায়গায় ঢুকে পড়ার সুযোগ পাওয়াটা রীতিমতো ভয়প্রদ হয়ে উঠছে। "ভারতীয় সামাজিক কাঠামোয় ছোট-বড় সকলের মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহার করাটা গত দশকে গুণিতক হারে বেড়েছে। এই বেড়ে ওঠা একদিক থেকে দুর্দান্ত। মানুষ অনেক কিছু জানতে পারছে, সুযোগ পাচ্ছে নতুন নতুন ভাবে নিজেকে এক্সপ্লোর করার। কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গেই অনলাই সেফটির নিয়ে চিন্তাও বেড়েই উঠছে প্রতিনিয়ত।"-- বলেন সোহা।
তিনি আরও বলেন, "সচেতনতা ছাড়া এ পথ এড়ানোর উপায় নেই। নিজে সচেতন হওয়া এবং অন্যকে সচেতন করার মধ্যেই একটা নিরাপদ নেট-দুনিয়া গড়ে উঠতে পারে। ইন্টারনেট-নীতির ক্ষেত্রেও কিছু কঠোরতা আনতে হবে। আইনি শক্তি আরও জোরদার করা দরকার। নইলে সাইবার অপরাধ বেড়েই চলবে, আর তার সহজ শিকার হবে শিশুরা।"
'ক্রাই' মনে করে, প্রতিটি শিশুরই শৈশব কাটানোর অধিকার রয়েছে। আর সে শৈশবের মূল উপাদান বাঁচা, শেখা, বড় হওয়া, খেলাধুলো করা। বিগত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে এই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে ক্রাই। দেশের ১৯টি রাজ্যে ৩০ লক্ষেরও বেশি শিশুর জীবনে পরিবর্তন আনতে পেরেছে তারা। এই চেষ্টা ভবিষ্যতেও চলবে।