দ্য ওয়াল ব্যুরো: আরও অনেক শ্রমিকের মতোই পথে নেমেছিলেন ২৩ বছরের লোগেশ বালাসুব্রমনিয়াম। নাগপুরে কাজ করতেন তিনি, বাড়ি তামিলনাড়ু নামাক্কালে। লকডাউনের পরে আচমকা কাজ হারায়, বন্ধ হয়ে যায় রোজগার। তার পরেই আতঙ্কে ও অসহায়তায় বাড়ির পথ ধরেছিলেন তিনি। ৫০০ কিলোমিটার দূরত্ব পেরোতে গিয়ে পথেই প্রাণ হারালেন তরুণ লোগেশ।
জানা গেছে, অনেকক্ষণ হেঁটে কোনও রকমে সেকেন্দ্রাবাদে পৌঁছে, সেখানকারই একটি আশ্রয় শিবিরে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। কিছুক্ষণের মধ্যেই কার্যত বিনা চিকিৎসায় মারা যান এই শ্রমিক।
কয়েক দিন ধরেই ভিন্ রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকদের দলে দলে ফিরতে দেখা গেছে নানা শহর থেকে। কেউ লুকিয়ে লুকিয়ে মালবাহী ট্রাকে চেপে বসেছেন, কেউ বা মাইলের পর মাইল পথ হেঁটেছেন। কোনও হবু মায়ের পেটে সন্তান, কোনও বাবার কাঁধে চড়ে আছে ছোট্ট শিশু। কারও সঙ্গে বা বৃদ্ধা মা। সঙ্গে সকলেরই বাক্স-পুঁটুলি। চোখেমুখে অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক। পেটে খিদে। সারা শরীরে ক্লান্তি। আচমকা লকডাউনে তাঁদের রোজগার বন্ধ, থাকার জায়গা নেই, তাই তাঁরা কাতারে কাতারে ফিরে যাচ্ছেন তাঁদের গ্রাম-দেহাতের বাড়িতে।
করোনাভাইরাস সংক্রমণ যাতে না বাড়ে, সে জন্য দেশব্যাপী লকডাউন জারি হয়েছে ২৪ মার্ত থেকে। আপাতত ২১ দিনের লকডাউন শুরু হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে। কারণ বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন সংক্রামক করোনাভাইরাসতে স্টেজ থ্রি-তে পৌঁছনো থেকে রুখতে পারে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা। সেই কারণেই এই আপৎকালীন লকডাউন। সমস্ত অফিস, কলকারখানা, দোকানপাট, নির্মাণকাজ বন্ধ হয়েছে রাতারাতি।
এই অবস্থায় ভিন্ রাজ্যে থাকা শ্রমিকরা কী করবেন, কোথায় যাবেন, কেউ বলে দেয়নি। ফলে অভাবে হোক বা আতঙ্কেই হোক, বাড়ি ফেরার কথাই ভেবেছেন সকলে। কাজ না থাকলে অচেনা রাজ্যে জীবনধারণ করাই কঠিন। আবার ফেরার পথও কার্যত বন্ধ। এই অবস্থাতে অনেককেই কাজের জায়গা থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। তাই বাড়ি ফেরার পথ ধরেছেন তাঁরা। অনেকেই পার করেছেন দীর্ঘপথ, অনেকেই আটকে গেছেন মাঝপথে।
এই অবস্থায় দেশের নানা প্রান্তে অভিবাসী শ্রমিকদের দলে দলে পথে নামার এ দৃশ্য নিয়ে বিতর্ক বেড়েছে। বারবার অভিযোগ উঠেছে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার নিয়ম একেবারেই মানছেন না তাঁরা, সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াচ্ছেন। আচমকা বিপদে পড়া এই শ্রমিকদের পাশে দাঁড়াতে একগুচ্ছ পরামর্শও দিয়েছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক।
কিন্তু আদতে যে পরিস্থিতি একেবারই অনুকূল নয়, তারই প্রমাণ যেন লোগেশের এই মৃত্যু। লোগেশের সঙ্গেই হাঁটছিলেন সত্যা নামের এক শ্রমিক। তিনি বলেন, "তিন দিন ধরে হেঁটেছি আমরা। কিছুই চলছিল না। কয়েকটা ট্রাক অল্প করে পথ এগিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু পুলিশ খুব হেনস্থা করেছে। কেউ কেউ খেতে দিলে খেতে পেয়েছি।"
সোমবার থেকে এভাবেই চলতে থাকেন লোগেশ ও তাঁর কয়েক জন সহ-শ্রমিক। বুধবার বিকেলে শেষ হয়ে যায় প্রাণ। আতঙ্ক আর অসহায়তায় আক্রান্ত এই শ্রমিকদেরই মুখ মৃত লোগেশ।