দ্য ওয়াল ব্যুরো: 'হার্ড ইমিউনিটি'। এই শব্দ দু'টির উপরেই ইদানীং বেশি জোর দেওয়া হচ্ছিল করোনা যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে। বিশেষজ্ঞরা যা বলছিলেন, তা সহজ কথায় বোঝায় যে এই করোনাভাইরাসের সংক্রমণের বিরুদ্ধে মানুষের শরীরে প্রাকৃতিক ভাবেই একটি প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্থাৎ অ্যান্টিবডি গড়ে উঠছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সম্প্রতি এ দেশে আইসিএমআর-এর একটি গবেষণা বলেছে, কলকাতা শহরেরই ১৪ শতাংশ উপসর্গহীন মানুষের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই। কিন্তু নতুন এক স্প্যানিশ গবেষণা বলছে, এই হার্ড ইমিউনিটি বিষয়টি প্রশ্নের মুখে।
সম্প্রতি মেডিক্যাল জার্নাল ল্যানসেটে প্রকাশিত হয়েছে ওই স্প্যানিশ গবেষণা। বিজ্ঞানীরা বলছেন, তাঁরা স্পেনের ৬০ হাজারের বেশি মানুষের মধ্যে সমীক্ষা করেছেন। ইউরোপের করোনা পরিস্থিতিতে এটাই সবচেয়ে বড় সমীক্ষা। তার মধ্যে মাত্র ৫ শতাংশ মানুষের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে বলে দেখেছেন। অথচ স্পেনে মোট করোনা আক্রান্তের সংখ্যা কম নয়, প্রায় তিন লক্ষ।
ফলে 'হার্ড ইমিউনিটি'র যে তত্ত্ব-- যথেষ্ট সংখ্যক মানুষ কোনও একটি ভাইরাসে আক্রান্ত হলে, তখন তার সংক্রমণ ঠেকানো যাবে প্রাকৃতিক ভাবেই, অর্থাৎ নিজস্ব প্রতিরোধক্ষমতা অর্জন হবে, তা কিন্তু সর্বত্র খাটছে না। গবেষণা বলছে, যাঁরা সংক্রামিত হননি তাঁদের রক্ষা পেতে হলে, সংশ্লিষ্ট এলাকার অন্তত ৭০-৯০ শতাংশ মানুষ আক্রান্ত হতে হবে।
কিন্তু সাম্প্রতিক স্প্যানিশ রিপোর্টে বলা হয়েছে, কোভিড-১৯ অ্যান্টিবডি তৈরির হার স্পেনের উপকূলীয় এলাকাগুলোতে তিন শতাংশের নীচে। অথচ দেশটির যেসব এলাকায় সংক্রমণের হার বেশি অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়ার হারও সেখানে বেশি হওয়ার কথা ছিল। এই উপকূলীয় এলাকা তার মধ্যেই পড়ে।
ওই গবেষণা দলের একজন সদস্য বলছেন, "আসলে স্পেনে কোভিড-১৯ সংক্রমণের হার অনেক বেশি হলেও, এর বিস্তারের ব্যাপকতা বেশ কম। বড় এলাকায় বেশি সংখ্যক মানুষের মধ্যে একসঙ্গে হয়নি অসুখ। ফলে তা 'হার্ড ইমিউনিটি' তৈরির জন্য পর্যাপ্ত নয়।" আর এখানেই নতুন করে ভাবতে হচ্ছে প্রচলিত হার্ড ইমিউনিটির তত্ত্ব সঠিক কিনা।
ওই গবেষক বলছেন, "যা পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে, তাতে দিনের পর দিন সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা, এবং আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাঁদের সংস্পর্শে যাঁরা এসেছিলেন তাঁদের বাধ্যতামূলকভাবে আইসোলেট করার মাধ্যমেই আগামী দিনে মহামারী নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এই অভ্যাস চালু রাখতে হবে। হার্ড ইমিউনিটির দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না।"
ল্যানসেট পত্রিকায় প্রকাশিত ওই গবেষণার রিপোর্টে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, প্রায় একই ধরনের গবেষণা চিন এবং আমেরিকাতেও হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, যেখানে সংক্রমণের হার ব্যাপক, সেখানেও বহু মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্তই হননি, অ্যান্টিবডিও মেলেনি।
স্পেনে এখনও পর্যন্ত ২ লক্ষ ৯৮ হাজার ৮৬৯ জন আক্রান্ত হয়েছেন করোনা সংক্রমণে। মারা গেছেন ২৮ হাজার ৩৮৮ জন মানুষ। তবে গত তিন সপ্তাহে দৈনিক মৃত্যুর হার অনেকটাই নেমে এসেছে। তিন মাস কঠোর লকডাউনের পরে জুনের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে স্পেনে লকডাউন উঠে গেছে, বেশিরভাগ ইউরোপীয় দেশের জন্য সীমান্তও খুলে দেওয়া হয়েছে।
তবে এই অবস্থায় স্পেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে গালিসিয়া রাজ্যে ফের নতুন করে মহামারী শুরু হয়েছে বলে খবর। তাই সেখানকার ৭০ হাজার মানুষের ওপর নতুন করে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। স্পেনে এখনকার নিয়ম অনুযায়ী, নাইটক্লাব ও রেঁস্তোরায় মোট ধারণক্ষমতার ৫০ শতাংশের বেশি মানুষ যেতে পারবেন না। গালিসিয়ায় সংক্রমণের উৎস একটি নাইটক্লাব বলেই মনে করা হচ্ছে।