দ্য ওয়াল ব্যুরো: করোনাভাইরাসের আক্রমণের ধরন হচ্ছে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে আগে ভেঙে দেওয়া। মানুষের শরীরের কোষে নিজেদের পছন্দের প্রোটিনকে বন্ধু বানিয়ে এরা আগে সেই কাজটাই করে। ভাইরাসের সংক্রমণ সারাতে গেলে তাই আগে রোগ প্রতিরোধের ভিতটা মজবুত করতে হয়। তার জন্য দরকার শক্তিশালী অ্যান্টিবডি যা ভাইরাস স্ট্রেনের প্রোটিনগুলোর সঙ্গে জমিয়ে লড়াই করতে পারবে। ভ্যাকসিন বা ড্রাগ বানিয়ে যে কাজ অনেক সময়সাপেক্ষ, সেখানে বিকল্প হতে পারে রক্তরস বা প্লাজমা-থেরাপি। কোভিড-১৯ সারিয়ে সুস্থ হয়ে উঠেছেন যে ব্যক্তি তার প্লাজমা যাকে বলে ‘Convalescent Plasma’, তাই দিয়ে সংক্রামিতকে সারিয়ে তুলে আশার আলো দেখিয়েছেন ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের চিফ কোয়ালিটি অফিসার ফাহিম ইউনুস।
করোনা সংক্রামিতের উপর ‘Convalescent Plasma Therapy’ প্রয়োগ করার সিদ্ধান্ত অনেকদিন আগেই নিয়েছে মার্কিন ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (FDA) । সুস্থ ব্যক্তির রক্তরস দিয়ে আক্রান্তের চিকিৎসাপদ্ধতি নিয়ে গবেষণা চলছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চিনে। করোনা-যুদ্ধ জয় করতে সময়সাপেক্ষ ভ্যাকসিন বা ড্রাগের বদলে এখন প্লাজমাকেই হাতিয়ার করতে চলেছেন ডাক্তার-বিজ্ঞানীরা। সেই পথেই আলো দেখিয়েছেন ডাক্তার ফাহিম। নিজের অফিসিয়াল টুইটার হ্যান্ডেলে তিনি জানিয়েছেন, এই প্লাজমা-থেরাপিতে ইতিমধ্যেই পাঁচজন সঙ্কটজনক রোগীকে সারিয়ে তোলা সম্ভব হয়েছ। তাঁদের মধ্যে তিনজন একদমই সুস্থ, হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বাকি দু’জনের অবস্থা স্থিতিশীল। এই সেরে ওঠাদের মধ্যে একজন তাঁর প্লাজমা দান করতে ইচ্ছুক।
https://twitter.com/FaheemYounus/status/1245547129831067649
করোনা মোকাবিলায় কি হাতিয়ার হতে চলেছে প্লাজমা-থেরাপি?
সুস্থ এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি এমন ব্যক্তির প্লাজমা বা রক্তরস নিয়ে চিকিৎসার পদ্ধতি নতুন নয়। এই প্লাজমা-থেরাপিকেই এবার সার্স-কভ-২ ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে কাজে লাগানো শুরু করেছেন গবেষকরা। শরীরে সংক্রামক জীবাণু ঢুকলে তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে এই রক্তরস। মানুষের শরীরের ৫৫% হল প্লাজমা বা রক্তরস। হালকা হলুদাভ তরল যার ৯৫% জল এবং ৬-৮% বিভিন্ন প্রোটিন (অ্যালবুমিন, গ্লোবিউলিন, ফাইব্রিনোজেন), গ্লুকোজ, ইলেকট্রোপ্লেট, হরমোন ও আরও নানা উপাদান থাকে। এই রক্তরস অ্যান্ডিবডি তৈরি করে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পারে ও যে কোনও সংক্রমণ আটকাতে পারে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, কোভিড-১৯ সংক্রমণ সারিয় সুস্থ হয়ে উঠেছেন যে ব্যক্তি তাঁর রক্তরস ভাইরাস-প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি তৈরিতে সক্ষম হয়েছে। অর্থাৎ সার্স-কভ-২ ভাইরাল স্ট্রেনকে আটকাতে যে ধরনের অ্যান্টিবডি দরকার সেটা তৈরি হয়েছে রক্তরসে। কাজেই সেই সুস্থ হয়ে ওঠা ব্যক্তির রক্তরস যদি প্রয়োগ করা যায় (Blood Plasma Transfution) আক্রান্তের শরীরে, তাহলে সেই অ্যান্টিবডিকে হাতিয়ার করেই রোগীর দেহকোষ লড়াই চালিয়ে যাবে ভাইরাসের বিরুদ্ধে। এই প্লাজমাকেই বলা হচ্ছে convalescent plasma। অর্থাৎ convalescent মানে হল সেরে ওয়া ব্যক্তির রক্তরস (Recovered) ।
সার্স-মার্স-ইনফ্লুয়েঞ্জা রুখতে কাজে দিয়েছিল, এবার করোনা সারাতে প্রয়োগ হতে পারে প্লাজমা-থেরাপি
জন হপকিনস ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথের মলিকিউলার বাযোলজির প্রধান আরতুরো ক্যাসাডাভেল বলেছেন, প্লাজমা থেরাপিতে সংক্রমণ সারানোর উপায় আছে। সেরে ওঠা ব্যক্তিরা যদি প্লাজমা দান করতে এগিয়ে আসেন, তাহলে বাঁচানো যাবে বহু মানুষকে।
নিউ ইয়র্কের মাউন্ট সিনাই হাসপাতালের ডাক্তার অ্যানিয়া ওয়াজানবার্গ বলেছেন, সেরাম-অ্যান্টিবডি প্রোগ্রাম শুরু হয়েছে। হিউস্টনের মেথডিস্ট হাসপাতালে প্লাজমা দান করেছেন দাতারা। ওই হাসপাতালে প্রথম একজন কোভিড-১৯ পজিটিভ রোগীর উপরে সুস্থ ব্যক্তির প্লাজমা প্রয়োগ করা হয়েছে। তাঁর অবস্থা অনেকটা স্থিতিশীল।
convalescent plasma থেরাপির প্রয়োগ হয়েছইল ২০০৩ সালে যখন সার্স মহামারী হয়েছিল। ২০০৯-২০ ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের সংক্রমণের সময়েও এই থেরাপির প্রয়োগ করেছিলেন ডাক্তাররা। ২০১২ সালে মার্স ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতেও কোথাও কোথাও এই প্লাজমা থেরাপির প্রয়োগ হয়েছিল। সব সংক্রমণ সারাতে পারবে এই থেরাপি এমনটা নয়, তবে অনেক সংক্রামক রোগ প্রতিরোধেই এই চিকিৎসাপদ্ধতির প্রয়োগ করা হয়েছে।
ইউনিভার্সিটির অব গ্লাসগোর বিজ্ঞানী ডেভিড তাপ্পিন বলেছেন, প্লাজমা-থেরাপির ক্লিনিকাল ট্রায়াল নিয়ে অনুমোদন চাওয়া হয়েছে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথের থেকে। অ্যাকাডেমি অব মেডিক্যাল সায়েন্স ও কিংস হেলথ পার্টনারের একজিকিউটিভ ডিরেক্টর অধ্যাপক রবার্ট লেচলারের মতও তেমনটাই। আমেরিকা, ব্রিটেন, চিনে এই থেরাপি নিয়ে জোরদার গবেষণা চলছে।
প্লাজমা-থেরাপির অনুমোদন দিয়েছে এফডিএ (FDA), তবে রয়েছে জরুরি নির্দেশিকাও
গত ২৪ মার্চ কোভিড-১৯ সংক্রমণের সারাতে প্লাজমা-থেরাপির অনুমোদন দিয়েছে ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যানমিনিস্ট্রেশন। রয়েছে জরুরি নির্দেশিকাও-
কোভিড-১৯ পজিটিভ কিনা আগে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে দেখতে হবে।
করোনার সংক্রমণ সারলেও সেই রোগীকে আরও ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনে রেখে পরীক্ষা করতে হবে। তারপর তার প্লাজমা নিতে হবে।
মহিলা দাতাদের ক্ষেত্রে এইচএলএ অ্যান্টিবডি নেগেটিভ হওয়া দরকার।
সুস্থ ব্যক্তির প্লাজমা আক্রান্তের উপর প্রয়োগ করার আগে বহুবার পরীক্ষা করে দেখে নিতে হবে।
তথ্যসূত্র:
মার্কিন ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন
ল্যানসেট মেডিক্যাল জার্নাল
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)