
শেষ আপডেট: 26 January 2024 19:09
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বৃহস্পতিবার দুই বিচারপতির বেনজির সংঘাতের সাক্ষী থেকেছিল কলকাতা হাইকোর্ট। ডিভিশন বেঞ্চের বিচারপতি সৌমেন সেনের এক নির্দেশ নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষোভের জ্বালামুখ খুলে দিয়েছিলেন সিঙ্গল বেঞ্চের বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়। এ ব্যাপারে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি টিএস শিবজ্ঞানম ও সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন তিনি।
কলকাতা হাইকোর্টে এই বেনজির সংঘাত নিয়ে এবার স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে মামলা শুরু করল সুপ্রিম কোর্ট। শনিবার ছুটির দিনে এ ব্যাপারে পাঁচ জন বিচারপতিকে নিয়ে গঠিত বিশেষ বেঞ্চে জরুরি ভিত্তিতে শুনানি হবে।
সুপ্রিম কোর্টের ওই পাঁচ সদস্যের বেঞ্চে রয়েছেন প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড়, বিচারপতি সঞ্জীব খান্না, বিচারপতি বিআর গাওয়াই, বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি অনিরুদ্ধ বসু। শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় সুপ্রিম কোর্টে এই মামলার শুনানি হবে।
বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় ওই নির্দেশে লিখেছেন, “বিচারপতি সেন খুব পরিষ্কার ভাবে এই রাজ্যের একটি রাজনৈতিক দলের হয়ে কাজ করছেন। তিনি এদিন আদালতে যা করেছেন তা কেবলই তাঁর ব্যক্তিগত স্বার্থে। এই রাজ্যে কিছু রাজনৈতিক দলকে বাঁচানোর জন্য তিনি এটা করেছেন। এটা পেশাগত অসদাচরণ।” বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায় নির্দেশে এও বলেন, সেই কারণেই এই বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের দেখা উচিত।
কলকাতা হাইকোর্টের একজন বিচারপতি উচ্চ আদালতের ডিভিশন বেঞ্চের একজন বিচারপতির বিরুদ্ধে এভাবে রায় দেওয়ায় আন্দোলিত হয়ে উঠেছে বিচারব্যবস্থা। বস্তুত সে জন্যই সুপ্রিম কোর্ট বিষয়টি স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে বিচার করে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আইনজ্ঞদের মতে, যে বেনজির ঘটেছে তার পর বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা টিকিয়ে রাখতে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের তরফে এমন পদক্ষেপ অনিবার্যই ছিল।
বৃহস্পতিবার এজলাসে বসে বিচারপতি সৌমেন সেনের বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ করেছিলেন বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায় তা তিনি সবই নির্দেশেও লিখে যান। সেই রায় তথা নির্দেশ বৃহস্পতিবার রাতে ওয়েবসাইটে আপলোড করা হয়। তার পরই দেখা যায়, বিচারপতি সৌমেন সেনের এজলাস থেকে নিয়োগ সংক্রান্ত সব মামলা সরিয়ে দেন কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি।
বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর নির্দেশে লিখেছেন, বিচারপতি সিনহা (পড়ুন বিচারপতি অমৃতা সিনহা) আদালতে ছুটির সময়ে আমাকে টেলিফোনে জানিয়েছিলেন, আদালতের সাম্প্রতিক ছুটি পড়ার আগে তাঁকে নিজের চেম্বারে ডেকে পাঠিয়েছিলেন বিচারপতি সৌমেন সেন। বিচারপতি সিনহাকে বিচারপতি সেন সেদিন বলেছিলেন, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উজ্জ্বল রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ রয়েছে। তাঁকে যেন বিরক্ত না করা হয়। বিচারপতি সিনহা এখন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি মামলা শুনছেন। অভিষেক হলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাইপো।
নির্দেশে বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায় এও লিখেছেন যে বিচারপতি সিনহা এই ব্যাপারটা কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিকে জানিয়েছেন। আমাকে বলা হয়েছে যে হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টকে জানিয়েছেন।
তা ছাড়া বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায় ডিভিশন বেঞ্চের ওই বিচারপতির বিরুদ্ধে আরও প্রশ্ন তুলেছেন। নির্দেশে তিনি লিখেছেন, দু’বছর আগেই সুপ্রিম কোর্টের কলেজিয়াম বিচারপতি সৌমেন সেনকে ওড়িশা হাইকোর্টে বদলি করার সুপারিশ করেছিল। কিন্তু কোন ক্ষমতা বলে উনি সুপ্রিম কোর্টের কলেজিয়ামের সেই সুপারিশ অগ্রাহ্য করছেন? তাঁর বদলি কে আটকাচ্ছে?
আইনজ্ঞদের অনেকের মতে, বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায় ডিভিশন বেঞ্চের বিচারপতি সৌমেন সেনের বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষোভের কথা শুধু পর্যবেক্ষণে সীমাবদ্ধ না রেখে যেভাবে ধরে ধরে নির্দেশে লিপিবদ্ধ করেছেন তার দৃষ্টান্ত নেই। এ এক অদ্ভূত পরিস্থিতি। এবং এহেন পরিস্থিতিতে সুপ্রিম কোর্টের উপরই এর ব্যাখ্যা এবং পরবর্তী পদক্ষেপের দায় বর্তায়। সেই কারণেই হয়তো দেশের প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড় কোনও কালক্ষেপ করেননি। শনিবার ছুটির দিনেও পাঁচ জন বিচারপতি বেঞ্চ বিষয়টা নিয়ে বিবেচনা করতে বসবেন।