
শেষ আপডেট: 4 May 2023 11:35
দ্য ওয়াল ব্যুরো: যুদ্ধের অন্ধকারের গল্প আমরা কমবেশি জানি। কিন্তু এ' যেন মিত্রতার আড়ালে আর এক অন্ধকারের গল্প।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ঠান্ডা যুদ্ধের যে মেঘ ঘনিয়ে এসেছিল, কোরীয় উপদ্বীপ (Korean war) তার মধ্যে ছিল অন্যতম। ১৯১০ সাল থেকে কোরিয়া ছিল জাপানের অধীনে। জাপানি সাম্রাজ্যের সূর্য তখন পূর্বগগনে, ক্রমশ নগরায়ণ ও শিল্পায়নে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শক্তি হিসেবে নিজেদের পাকাপোক্ত করতে চাইছে জাপান। যার অন্তিম ফলশ্রুতি একের পর এক যুদ্ধ এবং জাপানি আগ্রাসনের সাখালিন থেকে প্রশান্ত মহাসাগর অবধি নাগালে আনা।

সেই জাপানি দখলদারি থেকেই কোরিয়ায় শুরু হয় এক ভয়াবহ প্রথা। পোশাকি নাম—'কমফোর্ট উইমেন' (Comfort Women)। আদতে তারা কোরিয়া ও পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশ থেকে আসা অল্পবয়সি মেয়ের দল, যাদের জাপানি সামরিক কর্তারা নিয়োগ করতেন কর্তব্যরত সেনাবাহিনীর মনোরঞ্জনে। অর্থাৎ— নামানো হত দেহব্যবসায়। সৈনিক থেকে পদস্থ সেনাকর্তা— এমনকি প্রভাবশালী আমজনতার থেকেও ছাড় পেত না তারা।
১৯৪৫ সালে হিরোশিমা ও নাগাসাকি ধ্বংসের মধ্যে দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়। আত্মসমর্পণ করে জাপান। স্বাধীন হয় কোরিয়া। যদিও স্বাধীনতা বেশিদিন টেকেনি। বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী কোরিয়ার দখল কার আঙুলের নিচে থাকবে, সেই নিয়ে শুরু হয় সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রেষারেষি। ফলশ্রুতি— ১৯৫০ সালের জুন মাসে চিন ও সোভিয়েত সমর্থনে বলীয়ান উত্তর কোরিয়া আক্রমণ করে দক্ষিণকে, শুরু হয় কোরীয় যুদ্ধ। যাতে দক্ষিণ কোরিয়ার সহযোগী হয় আমেরিকা।

কিন্তু স্বরাজ পেয়েও সেই মেয়েদের কোনও বদল হয়নি। এবার তাদের নিয়োগকর্তা হয়ে দাঁড়ায় খোদ স্বাধীন দক্ষিণ কোরিয়া সরকার।
এবারের 'ক্রেতা' দক্ষিণ কোরিয়ায় কর্তব্যরত মার্কিন সেনাবাহিনী। দক্ষিণ কোরিয়া সরকার ও সেদেশের সেনাবাহিনীর তরফে রীতিমত তাদের মনোরঞ্জনের জন্য বানানো হয় 'স্পেশ্যাল কমফোর্ট উইমেন ইউনিটস'। মাত্র ১৬-১৭ বছর বয়সি মেয়েদের জোর করে তুলে নিয়ে যাওয়া হত, তারপর পাঠানো হত সেইসব ইউনিটে। তাদের 'কাজ' নির্বিঘ্নে করার জন্য সেনাছাউনির কাছেই বানানো হত 'কমফোর্ট স্টেশন' বা মনোরঞ্জন কেন্দ্র। এই মেয়েদের বেশিরভাগ ছিলেন কোরিয়ার স্থানীয়, এছাড়াও ফিলিপিন, চিন, ভিয়েতনাম, কাম্বোডিয়া, নেপাল, তাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া-সহ বিভিন্ন দেশের মেয়েদেরও এতে সামিল করা হত। ভোগ করত মার্কিন সেনা থেকে রাষ্ট্রপুঞ্জের শান্তিবাহিনী এমনকি সাধারণ মানুষও।

'নিউ ইয়র্ক টাইমস' কাগজের এক প্রতিবেদনে প্রকাশ, গত সেপ্টেম্বরে এরকম ১০০ জন নিপীড়িতার আবেদনে সাড়া দিয়েছে সেদেশের সুপ্রিম কোর্ট। এক যুগান্তকারী রায়ে আদালত জানিয়েছে, তাঁরা যে ভয়ানক যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে গিয়েছেন, সেটি কোনওভাবেই অগ্রাহ্য করা যাবে না। দক্ষিণ কোরিয়া সরকার তাদের ওপর অত্যাচার চালিয়েছে, আমেরিকার সঙ্গে সেনা-মৈত্রী বজায় রাখতে তাদের ব্যবহার করেছে, আর্থিক লাভও করেছে। অথচ বিনিময়ে নিপীড়িতারা কিছুই পাননি। এমনকি যৌন রোগে যারা আক্রান্ত হয়েছেন, চিকিৎসার নামে তাদের সঙ্গেও বলপ্রয়োগ করেছে সরকার। অথচ আজও দক্ষিণ কোরিয়াতে দেহব্যবসা আইনত নিষিদ্ধ।
যদিও সরকার সরাসরি এই মেয়েদের দেহব্যবসায় নামিয়েছে, এরূপ প্রামাণ্য নথি এখনও মেলেনি। তবে আদালতের রায়ে এবার আশায় বুক বাঁধছেন নিগৃহীতাদের একাংশ। তাঁরা চাইছেন, এবার মার্কিন আদালতেও এই মামলাকে নিয়ে যেতে। যাতে সেদেশেও লোকে জানতে পারে, কী ভয়াবহ এক অধ্যায়কে মৈত্রীর আড়ালে চালিয়ে নিয়ে গিয়েছে দুই দেশ।
অবশেষে ৭৪ বছর বয়সে মিলল ‘প্রোমোশন’, যুবরাজ থেকে রাজা হলেন চার্লস: একনজরে কিছু অজানা তথ্য