দ্য ওয়াল ব্যুরো: জড়াজড়ি করে ফুঁসে উঠছে। প্রবল তর্জন গর্জন করছে। যেন ফণা তুলে লড়াইয়ে মেতেছে দুটি বিশাল সাপ। কুণ্ডলী পাকাচ্ছে, ধাক্কাধাক্কি করছে। আমাদের ছায়াপথের কাছেই হিমশীতল দুই গ্যাসের স্তরে লড়াই লেগে গেছে।
এ এক বিষম লড়াই। থামার নামই নেই। পাঁচ দিন আগেও যা দেখেছিলেন মহাকাশবিজ্ঞানীরা এখনও ঠিক তাই। ক্ষণে ক্ষণেই একে অপরকে জড়িয়ে ধরছে। তারপরেই বিকট গর্জন। গ্যাসের স্তরের সঙ্গে মহাজাগতিক ধুলোবালি মিশে গিয়ে যেন ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। সে এক বিকট কাণ্ড চলছে ছায়াপথ বা মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কাছেই।
দানব মেঘে লড়াই বেঁধেছে
‘নেচার’ সায়েন্স জার্নালে এই দুই গ্যাসীয় পিণ্ডের বর্ণনা দিয়েছেন মহাকাশবিজ্ঞানীরা। মহাজাগতিক এই গ্যাসের স্তর প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। মেঘের শরীর বরফের মতো শীতল। ঠিক প্লুটোর মতোই। বিজ্ঞানীরা অনুমান করছেন, একটি গ্যাসীয় পিণ্ডের তাপমাত্রা হিমাঙ্কেরও ৪০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড নিচে, অন্যটির মাইনাস ২৫০ ডিগ্রির কাছাকাছি। এই কুণ্ডলীর মাঝে কোনও মহাজাগতিক বস্তু চলে এলে তার হাড়-মজ্জা অবধি শুষে নেবে এই হিমশীতল মেঘ।
মেঘের শরীর তৈরি হয়েছে হাইড্রজেন গ্যাসে। প্রথমে দুটি ছোট গ্যাসের স্তর লড়াইয়ে মেতেছিল। তারপর ধীরে ধীরে মহাজাগতিক গ্যাস, ধুলোবালি জমিয়ে তারা আরও থকথকে ঘন হয়ে জমাট বেঁধেছে। ফুলেফেঁপে এখন দানব মেঘের চেহারা নিয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, গ্যালাক্সি বা নক্ষত্র মণ্ডলের মাঝেই সেই বিষম লড়াই চলছে। ঠিক যেন মনে হচ্ছে বন্দুক থেকে গুলি ছোড়া হচ্ছে। এই গ্যাসের কুণ্ডলীর কেন্দ্রভাগে প্রচণ্ড শক্তি তৈরি হচ্ছে। জোরালো টানে একে অপরকে নিজের দিকে আকর্ষণ করছে।

অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ANU) জ্যোতির্বিজ্ঞানী নাওমি ম্যাকক্লিওর-গ্রিফিথস বলেছেন, এই দুই গ্যাসের মেঘের ভর প্রায় ২০০ সূর্যের সমান। ক্রমশই ঘন হয়ে উঠছে তারা। গ্যাসের খণ্ড জমাট বেঁধে নতুন তারার জন্মের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
গর্ভধারণ করছে কি মেঘ? জন্ম হচ্ছে নতুন তারার?
এই সম্ভাবনাই প্রবল। বিজ্ঞানী নাওমির দাবি, যদি দুই মেঘের টানাটানিতে শক্তিক্ষয় হয় তাহলে তারা জমাট বেঁধে নতুন তারার জন্ম দিতে পারবে না। কিন্তু, যদি আরও ঘন হয়ে কুণ্ডলী পাকায় তাহলেই গর্ভধারণ করতে পারবে দুই মহাজাগতিক মেঘ।
বিজ্ঞানীরা বলেন, গ্যালাক্সির মধ্যে শক্তিশালী অভিকর্ষজ বলের টানে ঘন থকথকে হয়ে জমাট বেঁধে থাকে গ্যাসীয় স্তরেরা। এই ঘন গ্যাসীয় পিণ্ড থেকেই খাবার সংগ্রহ করে কচি তারারা। ঠিক মাতৃগর্ভের মতোই। শিশু তারার জন্মের পরে তাকেও ঘিরে থাকে মেঘের স্তর। গ্যাসের ও জমাট বাঁধা ধুলোর স্তর থেকে পুষ্টি নিয়েই শরীর তৈরি হয় তারাদের।

২০১৫ সালে আমাদের ছায়াপথ বা মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির মাঝে এমন ৩৫টি সদ্যোজাত তারার খোঁজ মিলেছিল। এত দিন মহাকাশবিজ্ঞানীরা ভাবতেন, আমাদের ছায়াপথে নতুন কোনও পড়শি আর আসবে না। যারা মিল্কি ওয়ের বাসিন্দা, তারা কয়েকশো কোটি বছর ধরেই রয়েছে। নতুন তারারা সব ধারণা ভেঙে দেয়। বিজ্ঞানীরা বলেছিলেন, ওই তারাদের বয়স বড়জোর দশ কোটি বছর। তাদের মধ্যে সবচেয়ে সবচেয়ে কচি তারার বয়স আড়াই কোটি বছরের বেশি নয়।
[caption id="attachment_253693" align="aligncenter" width="650"]
ছবি সূত্র: নাসা[/caption]
বিজ্ঞানীরা বলেন, যে কোনও গ্যালাক্সি বুড়ো হলেও সন্তানের জন্ম দিতে পারে। সেক্ষেত্রে কোয়াসার বা কোয়েজারের ভূমিকা থাকে অনেক বেশি। এই কোয়াসার হল সুপার-ম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল যা প্রত্যেক গ্যালাক্সিরই কেন্দ্রে থাকে। এর ভর আমাদের সূর্যের চেয়ে কয়েক লক্ষ কোটি গুণ বেশি। যে কোনও মহাজাগতিক বস্তু এই দৈত্যাকার ব্ল্যাকহোলের কাছে চলে এলে জোরালো অভিকর্ষজ বলের টানে তাকে কেন্দ্রের দিকে টেনে নেয়। তারপর গপাগপ চলে ভুরিভোজ। সেই সময় প্রচুর গ্যাসীয় কণা ও পদার্থ ছিটকে বেরোয়। প্রচণ্ড শক্তিশালী বিকিরণের জন্ম হয়। গরম জমাট বাঁধা গ্যাসের অত্যন্ত পুরু মেঘ তৈরি হয়। আর কোনও গ্যালাক্সিতে নতুন নতুন তারার জন্ম হওয়ার জন্য প্রয়োজন হয় হিমশীতল গ্যাস বা গ্যাসের মেঘ। কোনও পদার্থ যত ঠান্ডা হয়, ততই তা জমাট বাঁধতে থাকে। আর গ্যাসের পুরু মেঘ জমাট বেঁধেই জন্ম দেয় নতুন নতুন তারাদের।