অমিতাভের পোস্টে চাসনালা, কালা পাত্থরের ৪২ বছর
দ্য ওয়াল ব্যুরো: হঠাৎ বিস্ফোরণের বিকট শব্দ। এক একজন এক এক দিকে ছিটকে পড়ে। কেউ জ্ঞান হারিয়েছিল, আবার কেউ তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল। প্রাণ বাঁচাতে হলে এক্ষুনি পালাতে হবে যে। কিন্তু কল কল করে কোথা থেকে শব্দ আসছে? কি সর্বনাশ, খনির
শেষ আপডেট: 30 August 2021 10:48
দ্য ওয়াল ব্যুরো: হঠাৎ বিস্ফোরণের বিকট শব্দ। এক একজন এক এক দিকে ছিটকে পড়ে। কেউ জ্ঞান হারিয়েছিল, আবার কেউ তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল। প্রাণ বাঁচাতে হলে এক্ষুনি পালাতে হবে যে। কিন্তু কল কল করে কোথা থেকে শব্দ আসছে? কি সর্বনাশ, খনির (coal mine) ভিতরে জল ঢুকছে যে!
হ্যাঁ, খনির ভিতরে জলই ঢুকেছিল। একটু-আধটু নয়, সেদিন হাজার হাজার গ্যালন জল ঢুকে গিয়েছিল চাসনালা (Chasnala) কয়লা খনিতে। দিনটা ছিল ২৭ ডিসেম্বর ১৯৭৫। প্রায় শতাধিক শ্রমিক ওই সময় খনিতে কয়লা কাটছিল। দুপুর ১ টা ৩৫ মিনিট নাগাদ বিস্ফোরণ ঘটে। এরপরই কয়লাখনির পাতলা দেওয়াল ভেঙে হু হু করে জল ঢুকতে শুরু করে। গোটা চাসনালা কয়লা খনি জলে তলিয়ে যায়। জলে ডুবে মৃত্যু হয় ৩৭৫ জন শ্রমিকের। পরে অনেক শ্রমিকের গলা পচা মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।
আরও পড়ুন:
ফুটবল কুড়োতে গিয়ে মাঠে নরকঙ্কাল দেখল শিশুরা, আতঙ্ক শ্যামনগরে
ঝাড়খণ্ডের ধানবাদের ঝরিয়া কয়লা খনি অঞ্চলে অবস্থিত চাসনালা খনি। এই কয়লা খনি দুর্ঘটনার সত্যি কাহিনীর উপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছিল বিখ্যাত সিনেমা কালা পাত্থর। ভারতীয় চলচ্চিত্রের মহাতারকা অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে এই সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন 'বিহারীবাবু' শত্রুঘ্ন সিনহা ও শশী কাপুর। ২৪ অগস্ট ১৯৭৯ সালে এই সিনেমাটি মুক্তি পায়।
বক্স অফিসে ঝড় তোলা কালা পাত্থর (Kala Patthar) সিনেমার ৪২ বছর পূর্তি উপলক্ষে সম্প্রতি অমিতাভ বচ্চন সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি স্মৃতিমেদুর লেখা পোস্ট করেন। তাতে কালা পাত্থর সিনেমার পোস্টারের ছবিও তিনি নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরেন।
অমিতাভ বচ্চনের (Amitabh Bachchan) পোষ্টের কথা জানতে পেরে স্মৃতির সরণিতে পাড়ি দেন ধানবাদের অসংখ্য মানুষ। তাঁদের মধ্যে অনেকেই চাসনালা খনিতে কাজ করতেন। কেউ আবার এই খনি দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকাজে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়েছিলেন।
এই প্রাক্তন কর্মীরাই জানিয়েছেন সেকালের থেকে এখনের পরিস্থিতি অনেকটাই আলাদা। এখন প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির ফলে খনিতে নিরাপত্তা অনেক বেড়েছে। আজ আর আগের মত যখন-তখন দুর্ঘটনা ঘটে না।
চাসনালা খনির আরেক প্রাক্তন কর্মী রমাপ্রসাদ নিজের হাতেই প্রায় ২০০ কর্মীর পচা-গলা দেহ উদ্ধার করেছিলেন।
চাসনালা খনির মহাবিপর্যয় নিয়ে ধানবাদের মানুষ আজও শোকে বিহ্বল হয়ে পড়েন। তাঁদের অনেকেরই পরিজন ওই দুর্ঘটনার বলি হয়েছেন। তবে ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৈরি সিনেমা কালা পাত্থরের সঙ্গেও তাঁদের অনেক মধুর স্মৃতি জড়িয়ে আছে। একসময় রাখি উৎসবের দিন নিয়ম করে ধানবাদে আসতেন শত্রুঘ্ন সিনহা, অমিতাভ বচ্চনরা। সেই স্মৃতিও সেখানকার মানুষের মনে অক্ষয় হয়ে আছে।
পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা 'সুখপাঠ'
তবে চাসনালা খনির যে দুর্ভাগা শ্রমিকরা সেদিন মারা গিয়েছিলেন তাঁরা আদৌ সঠিক বিচার পেয়েছেন কিনা তা নিয়ে বিতর্ক আছে। কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ সংস্থা ইস্কো এই কয়লা খনির মালিক ছিল। কার বা কাদের গাফিলতিতে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে তা জানার জন্য পাটনা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি উজ্জল নারায়ণ সিনহার নেতৃত্বে বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠিত হয়েছিল। সেই কমিশন ওই কয়লা খনির চার উচ্চপদস্থ কর্মীকে দোষী সাব্যস্ত করে। কিন্তু তাদের মধ্যে দু'জন আগেই মারা গিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত রামানুজ ভট্টাচার্য ও দীপক সরকারকে আদালত ১ বছরের জেল এবং মাত্র ৫ হাজার টাকা জরিমানা করে। তবে উচ্চতর আদালতে আপিল করে একমাস পরেই জেল থেকে মুক্তি পেয়ে যান এই দুই বাঙালি আধিকারিক।
১৯৯৭ সালে চাসনালা খনির সামনে মৃত শ্রমিকদের স্মৃতিতে একটি শহীদ স্মারক নির্মাণ করা হয়। মৃত শ্রমিকদের পরিজনদের কাছে সান্তনা বলতে এটুকুই!