দ্য ওয়াল ব্যুরো: ২০ মার্চ ছিল 'স্প্রিং ইকুইনক্স'। ভূগোলের ব্যাখ্যা, এই দিন নিরক্ষরেখা উপরে সূর্যের উলম্ব অবস্থানের কারণে দিন-রাত সমান হয়। বাংলায় বসন্ত বিষুবও বলা হয় একে। চিন দেশের নিয়ম বলে, এই বসন্ত বিষুবের ১৫ দিন পরে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে খাবার, ওয়াইন ও প্রিয় জিনিস রেখে আসতে হয় কবরে। কবরের আশপাশটা ভাল করে পরিষ্কারও করেন সকলে। কয়েক শতাব্দী ধরে এই নিয়ম চলছে। ২০ মার্চের ১৫ দিন পরে, ৪ এপ্রিল এই বিশেষ দিনটি আসে।
আজ ৪ এপ্রিল। নিয়মমতো আজই সেই বিশেষ দিন। কিন্তু এই বছর সমস্ত আলাদা। অসংখ্য প্রিয়জনকে হারিয়েছেন প্রতিটা মানুষ। করোনাভাইরাস কেড়ে নিয়েছে কয়েক হাজার প্রাণ। শোনা যাচ্ছে, বহু পরিবার এখনও তাঁদের সদস্যের মৃত্যুর পরে কবর দেওয়ার সুযোগও পাননি। কফিনবন্দি হয়ে পড়ে আছে দেহ। যাঁরা সমাহিত হয়েছেন, তাঁদের কবরেও আজ সেই ভিড় কোথায়!
"কোনও কোনও পরিবারে কেউ বেঁচেই নেই। কোনও কোনও পরিবারের সদস্যরা প্রিয়জনের মুখটুকুও দেখতে পাননি মৃত্যুর সময়ে। এই অবস্থায় কে কার কবরে যাবে আজ!"-- বলছিলেন গাও ইংওয়েই। পেশায় তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী গাও-এর দাদু ৭ ফেব্রুয়ারি মারা গেছেন কোভিড ১৯-এ আক্রান্ত হয়ে। নিজের বাড়িতেই প্রাণ হারিয়েছেন ৭৬ বছরের বৃদ্ধ। শেষকৃত্য করতে পারেনি পরিবার, সরকারি সংস্থা থেকে দেহ নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তারা বলেছে যথাযথ নিয়মে দেহ সমাহিত করবে।
"কিন্তু আজ অবধি জানতে পারিনি, সে দেহ কোথায় কীভাবে রাখা হল, আদৌ পোড়ানো হল নাকি কবর দেওয়া হল, পোড়ালে তার ছাই-ই বা কোথায়। জানিই না, দেহটা কারা কোথায় নিয়ে গেল।"-- বললেন গাও।
এই অভিজ্ঞতা একা গাও-এর নয়। অসংখ্য মানুষ এরকমই অবস্থায় কাটাচ্ছেন আজকের দিনটা। তাঁরা জানেনই না, প্রিয়জনেরা কোনখানে সমাহিত হয়েছেন। জানলেও কবর পর্যন্ত যেতে পারছেন না অনেকে। অনেকে আবার মৃতদেহ পোড়ানো হয়েছে খবর পেয়েও এখনও ছাই সংগ্রহ করতে পারেনি। এই সংখ্যাটা অনেকটাই বেশি।

কিন্তু আজকের দিনটায় আরও একটি বিষয় স্পষ্টতর হচ্ছে। চিনের সরকার দাবি করেছে, হুবেই প্রদেশের উহান শহরে ২৫৬৩ জন মারা গেছেন করোনাভাইরাসে। কিন্তু সে শহরের হাহাকার আজ বলছে, সংখ্যাটা সরকারি হিসেবের চেয়ে অনেক বেশি। একটি প্রতিবেদনে এমনটাই জানিয়েছে ওয়াশিংটন পোস্ট।
তাদের প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, গত দু'সপ্তাহ ধরে লম্বা লাইন পড়েছে উহানের সরকারি দফতরে। সকলেই প্রিয়জনদের দাহ করার পরে ছাই সংগ্রহ করতে এসেছেন। কেউ কেউ ছ'ঘণ্টা পর্যন্তও দাঁড়িয়ে থাকছেন। শুধু তাই নয়। এখনও পর্যন্ত দফায় দফায় কবর দেওয়া হচ্ছে অসংখ্য লাশ। ১৯-২০ ঘণ্টা করে কাজ চলছে একটানা। কেইক্সিন ম্যাগাজিনের রিপোর্ট বলছে, শেষ দু'দিনে অন্তত পাঁচ হাজার কফিন এসেছে সেখানে। ওয়াশিংটন পোস্ট প্রশ্ন তুলেছে, চিনের দেওয়া মৃত্যুর পরিসংখ্যান তাহলে কতটা সত্য?
চিনের নিজস্ব সোশ্যাল সাইটে যা তথ্য পাওয়া গেছে তাতে জানা যাচ্ছে, গত দেড় সপ্তাহ ধরে উহানের ফিউনেরাল হোমগুলি থেকে তিন-সাড়ে তিন হাজার দেহ ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে প্রতি দিন। ওয়াশিংটন পোস্টের দাবি, সমস্তটা যাচাই করে ধারণা করা যায়, উহানের মৃতের সংখ্যা কম করে ৪২ হাজার। সরকার যা বলেছে, তার ১৬ গুণ বেশি।
উহানের সাধারণ মানুষও বলছেন, সরকারি তথ্যে বড় গাফিলতি রয়েছে। কারণ কবরস্থানগুলি উপচে পড়েছিল। মাত্র আড়াই হাজার মৃত্যুতে এমনটা হওয়ার কথা নয় মোটেই। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টও একই কথা বলছে বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটন পোস্ট।
৪৯ বছরের লিউ চেং মারা গেছিলেন ১২ ফেব্রুয়ারি। হাসপাতালে সামান্যই চিকিৎসা হয়েছিল তাঁর। অফিসিয়ালি তাঁর মৃত্যুর কারণ, ফুসফুসে মারাত্মক সংক্রমণ। তাঁর দেহও হাতে পায়নি পরিবার। জানেই না, কোথায় সমাহিত হলেন মানুষটি। তাঁর ভাইয়ের কথায়, "আমার দাদা হয়তো বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে পড়ে রয়েছে কোনও স্তূপে। জানতেই পারব না কখনও, কোথায় ঘুমিয়ে থাকবে ও।"

এরকম হাজারও ক্ষোভের মধ্যে চিন সরকার জানিয়েছে, হুবেই প্রদেশের কবরগুলি আজকের বিশেষ দিনে সরকারি উদ্যোগেই পরিষ্কার করা হবে। কোনও কোনও সংস্থা কবরে গিয়ে খাবারদাবার দেওয়ার কাজটাও করবেন। মৃতের পরিবার চাইলে লাইভ ভিডিও দেখতে পাবে গণমাধ্যমে।
শুধু তাই নয়, কেউ কোনও কবরে বিশেষ কিছু দিতে চাইলে, কোনও খাদ্য বা পানীয় বা মৃতের প্রিয় সিগারেট ইত্যাদি-- তাহলে ওই সংস্থাগুলির সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকাও পাঠাতে পারে তারা। কিন্তু শহর থেকে কয়েক ঘণ্টার পথ পেরিয়ে কবরস্থানে এসে ভিড় করুক মৃতের পরিবার, এমনটার অনুমতি নেই। কারণ আবেগের সুযোগে কোনও রকম বিপর্যয় চায় না সরকার।
চাইনিজ় ইউনিভার্সিটি অফ হংকং-এর নৃতত্ত্ববিদ্যার অধ্যাপক অ্যান্ড্রু কিপনিস এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন, "যে কোনও মৃত্যুর পরবর্তী শেষকৃত্য খুবই দুঃখের একটা পর্ব। তা দুর্ঘটনাতেই হোক বা মহামারীতে, প্রিয়জনের মৃত্যুর ভার সমান সকলের জন্যই। তাই আজকের এই পরিস্থিতি, কবরে পৌঁছতে না পারা-- সকলেরই মন খারাপ করবে।"