
শেষ আপডেট: 9 September 2020 18:30
গত ২৯ জুলাই উপগ্রহ চিত্রে দেখা গিয়েছিল প্যাঙ্গং হ্রদের উত্তরে সঁজোয়া গাড়ি, ট্রাক নিয়ে চলাফেরা করছে চিনের বাহিনী। ৭ সেপ্টেম্বরের পর থেকে দেখা গেছে, ফিঙ্গার পয়েন্ট ৪ ও ৫ এর কাছে সামরিক কাঠামো তৈরি করছে লাল সেনা। ট্রাকে চাপিয়ে জিনিসপত্র আনানেওয়া করা চলছে। সেনা বহরও আগের থেকে বেড়েছে।
প্যাঙ্গং হ্রদের উত্তর তীরের কোল ঘেঁষেই রয়েছে ফিঙ্গার পয়েন্ট ৪। ভারতীয় সেনা সূত্রে খবর, ১৫ জুন গালওয়ানের ১৪ নম্বর পেট্রোলিং পয়েন্টে দুই দেশের বাহিনীর সংঘাতের পরে ফিঙ্গার পয়েন্ট ৪ থেকে ৮ পর্যন্ত এলাকায় ঢুকে এসেছিল চিনের বাহিনী। ফিঙ্গার পয়েন্ট ৪ ও ফিঙ্গার পয়েন্ট ৫ এর মধ্যবর্তী খাঁজে তাঁবু খাটিয়ে বসে গিয়েছিল লাল ফৌজ। ওই এলাকায় মান্দারিন ভাষায় নিজেদের প্রতীক বানাতেও দেখা গিয়েছিল চিনের বাহিনীকে। প্যাঙ্গং লেকের দক্ষিণ তীরে নতুন করে অশান্তি তৈরির পরেই ভারতীয় বাহিনী আরও সতর্ক হয়ে যায়। উত্তর সীমাতেও যে চিন তাদের সেনা বাড়ানোর চেষ্টা করবে সেই শঙ্কা আগেই ছিল। তাই একটু একটু করেই ফিঙ্গার এলাকাগুলোতে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এগোতে শুরু করে ভারতীয় সেনারা। এই পাহাড়ি খাঁজ এখন ভারতীয় সেনার নিয়ন্ত্রণে। এই মূহূর্তে ওই এলাকায় টহল দিচ্ছে গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ পাওয়া ভারতের দুর্ধর্ষ মাউন্টেন ফোর্স স্পেশাল ফ্রন্টিয়ারের কম্যান্ডোরা।
গত ৩০ অগস্ট থেকেই উত্তর প্যাঙ্গং এলাকায় নতুন করে সেনা মোতায়েন করছিল ভারত। সেনা সূত্র আরও জানিয়েছে, ফিঙ্গার পয়েন্ট ৪ থেকে ফিঙ্গার পয়েন্ট ৮ অবধি এলাকায় আগে ভারতীয় বাহিনীই টহল দিত। চিনের সেনা ঢুকে পড়ার পরে ওই এলাকায় টহলদারি বন্ধ করে দিতে হয়। কিন্তু চিন যবে থেকে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার কাছে নিজেদের সামরিক কাঠামো তৈরি করতে শুরু করে, তবে থেকেই ফিঙ্গার এলাকাগুলো ফের নিজেদের দখলে নেওয়ার কৌশল ঠিক করে ফেলে ভারতের বাহিনী।
১৩ হাজার ৮৬২ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত প্যাঙ্গং সো লেক ভারত, চিন ও তিব্বতের সীমা অবধি বিস্তৃত। উত্তর ও দক্ষিণ ভাগ মিলিয়ে ৬০০ বর্গকিলোমিটারের বেশি এলাকা রয়েছে। হ্রদের উত্তর ভাগে মিশেছে কারাকোরাম পর্বতশ্রেণি। ওই দিকেই রয়েছে ফিঙ্গার পয়েন্ট ৪। প্যাঙ্গং হ্রদের দক্ষিণ ভাগে রয়েছে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে থাকা পাহাড় যা ধাপে ধাপে নেমে গেছে স্প্যানগুর লেকের দিকে। এই হ্রদ ও তার সংলগ্ন এলাকার দুই তৃতীয়াংশেই নিজেদের অধিকার ফলাবার চেষ্টা করে চিন যা ভারতীয় সেনার তৎপরতায় রুখে দেওয়া গিয়েছে। কালা টপ, হেলমেট, মুখপারি, রেচিন লা এখন ভারতীয় সেনার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
উপগ্রহ চিত্রে দেখা গিয়েছে, কালা টপের নীচেই যুদ্ধট্যাঙ্ক সাজিয়ে বসেছে চিনের সেনা। ভারী ও হাল্কা দু’রকমের যুদ্ধট্যাঙ্কই রয়েছে তাদের সামরিক বহরে। অন্যদিকে, প্যাঙ্গং হ্রদ বরাবর চুসুল ও স্প্যানগুর সো এলাকায় টি-৯০ ভীষ্ম ও টি-৭২ যুদ্ধট্যাঙ্ক সাজিয়ে বসে গেছে ভারতের বাহিনী। তাদের নিশানা চিনের ট্যাঙ্ক রেজিমেন্টের দিকে। সেনা সূত্র জানাচ্ছে, কম পাল্লার মধ্যেই মুখোমুখি যুদ্ধট্যাঙ্ক নিয়ে তৈরি দুই দেশের বাহিনীই। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, প্যাঙ্গং হ্রদের সংলগ্ন পাহাড়ি খাঁজ বা ফিঙ্গার পয়েন্টগুলো চিনের নজরে রয়েছে। পাহাড়ি খাঁজে নিজেদের অধিকার কায়েম করতে পারলে আকসাই চিন থেকে প্যাঙ্গং অবধি এলাকায় তাদের সামরিক পরিকাঠামো গড়ে তুলতে পারবে চিন।
গত ৩০ জুন দুই দেশের সেনা কম্যান্ডার পর্যায়ের বৈঠকের পরে ঠিক হয়েছিল প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার চারটি এলাকা থেকেই নিজেদের বাহিনী সরাবে দুই দেশ। মাঝে তৈরি হবে একটা নিরপেক্ষ এলাকা বা বাফার জ়োন। এই চার এলাকা হল—গোগরা হট স্প্রিং, দেপসাং সমতলভূমি, গালওয়ান উপত্যকা ও প্যাঙ্গং সো লেক। এই চার এলাকার মধ্যে পিপি ১০ থেকে পিপি ১৩ রয়েছে দেপসাং সেক্টরে, পিপি ১৪ রয়েছে গালওয়ানে, পিপি ১৫ রয়েছে হট স্প্রিং এলাকায়, পিপি ১৭ ও পিপি ১৭এ রয়েছে গোগরায়। ভারতীয় সেনা জানায়, গালওয়ান থেকে সামান্য সেনা সরালেও প্যাঙ্গং লেকের দখল ছাড়েনি চিন। কারণ প্যাঙ্গং হ্রদের উত্তর ও দক্ষিণ দুই ভাগই তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড়ি এলাকায় দখল নিতে পারলে সেখান থেকে দৌলত বেগ ওল্ডি ও আকসাই চিন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে থাকবে, অন্যদিকে গালওয়ানে নদীর জল বাড়লে পাহাড়ি খাঁজেই নিরাপদ আশ্রয় মিলবে। প্যাঙ্গং হ্রদের কাছ ঘেঁষেই অবস্থিত ফিঙ্গার পয়েন্ট ৪ তাই পুরোপুরি নিজেদের দখলে নিয়েছিল চিনের সেনা। এবার ওই এলাকাতেই ফের আধিপত্য কায়েম করেছে ভারত।