দ্য ওয়াল ব্যুরো: কোথায় খিদের জ্বালায় কাঁদছে শিশু, কোথায় লকডাউনে কাজ হারিয়ে নিঃস্ব পরিবার, কোথায় অসুস্থ মাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পয়সা নেই ছেলের, সেখানেই ছুটে যাচ্ছেন আর অজিত কুমার। চোখের জল মোছাচ্ছেন নিজের হাতে। অভুক্তের মুখে গরম খাবার তুলে দিচ্ছেন। যেখানেই সমস্যা সেখানেই পৌঁছে যাচ্ছেন অজিত। সুপারহিরোর মতোই। আর এই কাজে তাকে সাহায্য করছে খবরের কাগজ।
অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যি। খবর পড়েই সাহায্যপ্রার্থীদের ঠিকানা খুঁজে বের করছেন অজিত। তারপর বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে পৌঁছে যাচ্ছেন সেখানে। সে পথের দূরত্ব যতই হোক না কেন। এটা শুনতে যতটা সহজ, কাজে ততটাই কঠিন। অজিত বলেছেন, রোজ সকালে তিনটে খবরের কাগ খুঁটিয়ে পড়েন তিনি। একটা ইংরেজি ও দুটো তামিল। রোজকার খবরেই থাকে কোভিড মৃত্যু, হাসপাতালর বাইরে স্ট্রেচারে পড়ে রয়েছে রোগী বা লকডাউনে অমুক জায়গায় আত্মাঘাতী হয়েছেন একজন অথবা খাবার-চিকিৎসা পরিষেবা পাচ্ছে না তমুক গ্রামের লোকজন। এইসব খবরের কাটিং নিজের কাছে রেখে দেন অজিত। তারপরই শুরু হয় তাঁর অ্যাকশন।
কোভিড আক্রান্তের নাম থাকে না সবসময়। তাই কোন এলাকায় মানুষজন বিপর্যস্ত সেখানকার নাম বের করে ঠিকানা জোগাড়ের চেষ্টা করেন অজিত। যে রিপোর্টার বা যে সংবাদপত্রে খবরটা বেরিয়ে সেখানে যোগাযোগ করে নাম-ঠিকানা বের করে নেন। তারপরেই ছুটে যান। অজিত বলেছেন, বেশিরভাগ সময়ে একাই যেতে হয় তাঁকে। কারণ করোনা আতঙ্কের এই পরিস্থিতিতে বেশিরভাগ মানুষই বাইরে পা রাখতে ভয় পাচ্ছেন। আর আক্রান্ত এলাকায় তো যেতেই চাইছেন না কেউ। তাই সব কাজ নিজের হাতেই গুছিয়ে করেন অজিত।
কোভিড সংক্রমণে মৃতের পরিবারের কাছে গিয়ে তাঁদের সমস্যা শোনেন। প্রয়োজন মতো সাহায্য করেন। লকডাউনে কাজ হারানো দুঃস্থ শ্রমিক-মজুরদের কাছে পৌঁছে যান খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে। রোজগার নেই অসহায় প্রতিবন্ধী মানুষজন যাঁদের দু’বেলা খাওয়া জুটছে না, সেখানেও হাজির হয়ে যান সুপারহিরোর মতোই। অজিত বলেছন, এই চরম স্বাস্থ্য বিপর্যের সময় প্রত্যন্ত এলাকায় শিশুরা ঠিকমতো খাবার পাচ্ছে না। সরকারি ত্রাণ ঠিকমতো পাচ্ছে না অনেকেই। তাছাড়া দিনমজুর বা ঠিকা শ্রমিকরা কাজ হারিয়ে চরম বিপদের মুখে পড়েছেন। তাঁদের পরিবার প্রায় নিঃস্ব। এই মানুষগুলোর কাছেই নিজের সামর্থ্য মতো সাহায্য পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি।
লকডাউনে খাবার জুটছিল না প্রতিবন্ধী এস কনকরাজের। তামিলনাড়ুর বাসিন্দা। তাঁর ৭২ বছরের বাবাও রোগে প্রায় মৃতপ্রায় ছিলেন। খবরের কাগজ দেখে এই পরিবারের কাছে পৌঁছে যান অজিত। সাধ্যমতো টাকা ঢুকিয়ে দেন কনকরাজের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে।
গরিব হকার, ছোটখাটো দোকান-রেস্তোরাঁ এই লকডাউনে বিপন্ন। অজিত বলেছেন, এই পরিবারগুলো চরম সঙ্কটে রয়েছে। সকলের কাছে সাহায্য পৌঁছে দেওয়া সম্ভব নয়। তবে যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন তিনি। প্রয়োজন হলে সরকারি ত্রাণ ও সুবিধার ব্যবস্থাও করে দিচ্ছেন।
পেট ভরালেই শুধু চলবে না, গরিব বাচ্চাদের শিক্ষাও দরকার। প্রাথমিক স্কুলগুলো এখন বন্ধ। প্রত্যন্ত এলাকায় মোবাইল বা নেটওয়ার্কের সুবিধা সব ঘরে নেই। ডিজিটাল পরিষেবায় পড়াশোনা করার সামর্থ্যও নেই। সেইসব এলাকায় গরিব বাচ্চাদের পড়াশোনা করানোর ব্যবস্থা করছেন তিনি। অজিত বলেছেন, এলাকার উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোকে গিয়ে অনুরোধ করছেন তাঁরা যেন খাবার, পোশাক দিয়ে সাহায্য করেন। যাঁরা নিঃস্বার্থভাবে দান করছেন সেই জিনিসপত্র পৌঁছে দিচ্ছেন গরিব পরিবারগুলোর কাছে। চেন্নাইয়ে দুটো দোকান খুলেছেন অজিত। সেখানে বিনামূল্যে খাবার ও পোশাক বিতরণ করা হচ্ছে দুঃস্থদের। বলেছেন, তিনি নিজে যেখানে যেতে পারছেন না, সেখানেও ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
লকডাউনে কাজ হারিয়ে আত্মহত্যা করেন এক তরুণ। সেলুন ছিল তাঁর। রোজগারের রাস্তা একেবারেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অজিত বলেছেন, কাগজ দেখে এই পরিবারের ঠিকানা জোগাড় করে সেখানে পৌঁছে যান তিনি। এখন ওই পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব তাঁর। আরও কয়েকটি অসহায় পরিবারের দায়িত্বও নিয়েছেন তিনি।