দ্য ওয়াল ব্যুরো: নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সভায় উপস্থিত ছিলেন দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সফুরা জারগর। প্রায় চার মাস পরে সন্ত্রাসবাদী দমন আইন মামলায় গ্রেফতার হলেন সেই সফুরা! তাঁর বিরুদ্ধে দিল্লির দাঙ্গাতে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছে। ২৭ বছরের সফুরা এখন দু'মাসের অন্তঃসত্ত্বা। সেই অবস্থাতেই তাঁকে পাঠানো হয়েছে তিহাড় জেলে।
জামিয়া মিলিয়ার গবেষক সফুরা 'জামিয়া কোঅর্ডিনেশন কমিটি'রও সদস্যা। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে লোকসভায় পাশ হয় নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন। তার পরেই প্রতিবাদে ফেটে পড়ে গোটা দেশ। রাজধানী দিল্লিও বিশাল প্রতিবাদের স্বাক্ষী থাকে। সেই সময়েই প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠেছিল জামিয়া কোঅর্ডিনেশন কমিটির সদস্যরাও। সেই প্রতিবাদেই সামিল ছিলেন সফুরাও।
এর পরেই ফেব্রুয়ারি মাসে হঠাৎই অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে রাজধানী দিল্লি। কার্যত দাঙ্গা বেঁধে যায় বেশ কিছু অঞ্চলে। পুলিশের অভিযোগ, এই দাঙ্গায় একজন ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে অভিযুক্ত সফুরা। এর পরেই দু'মাসের অন্তঃসত্ত্বা সফুরাকে সন্ত্রাসবাদ দমন আইনে গ্রেফতার করা হয়েছে।
প্রতিবাদী এবং দৃঢ়চেতা হিসেবে জামিয়াতে বেশ পরিচিত গবেষক সফুরা। তাঁর গ্রেফতারি প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক জানান, তিনি আশা করেন দেশের বিচারব্যবস্থা সফুরার অ্যাকাডেমিক রেকর্ড এবং তাঁর শারীরিক অবস্থা অবশ্যই বিবেচনা করবে। তিনি বিশ্বাস করেন তাঁর ছাত্রী নির্দোষ এবং মুক্তিও পাবেন আইনি পথেই।
জামিয়া কোঅর্ডিনেশন কমিটির পক্ষ থেকে জানোন হয়েছে, এই মহামারীর সময়ে দেশজুড়ে লকডাউন চলছে। কিন্তু এখনও পুলিশি জুলুমের বিরাম নেই! এই দুঃসময়েও এই অন্তঃসত্ত্বা মেয়েটির গ্রেফতারি আদতে প্রমাণ করছে, সরকার আসলে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকে দমন করতে চায় যে কোনও শর্তে।
কমিটির তরফে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তিহাড় জেলে অসংখ্য বন্দি রয়েছে। জনবহুল এই কারাগারে এই অবস্থায় এক জন অন্তঃসত্ত্বা মহিলার থাকা রীতিমত চিন্তার বিষয়। ইতিমধ্যেই অনেক বন্দিদের মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এমনই অবস্থায় সফুরার বিরুদ্ধে দাঙ্গা, অস্ত্র দখল, হত্যার চেষ্টা, হিংসা ছড়ানো, রাষ্ট্রদ্রোহিতা নিয়ে প্রায় ১৮টি অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে!
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, সফুরার আইনজীবী জানান, কিছুদিন আগে পুলিশ আরও একটি মামলা দায়ের করেছিল তাঁর মক্কেলের বিরুদ্ধে। কিন্তু সেটিতে তিনি জামিন পেয়ে যান। তার পরেই আবার তাঁর নামে এই নতুন একগুচ্ছ অভিযোগ আনা হয়। আইনজীবী দাবি করেছেন, একাধিক অস্পষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে গর্ভাবস্থা থাকায় কোনও মহিলাকে গ্রেফতার করা অন্যায়।
করোনা আতঙ্কে দেশে লকডাউন জারি হওয়ায় এখন সামগ্রিক বিচারব্যবস্থাই খানিক থমকে গেছে। বিচারাধীন বন্দিদের অবস্থাও শোচনীয়। তাঁদের সঙ্গে আইনজীবী এবং পরিবারের লোকজনকে দেখাও করতে দেওয়া হচ্ছে না। সফুরার আইনজীবী আরও জানান, তিনি খবর পেয়েছেন, কোয়ারেন্টাইনের দোহাই দিয়ে নির্জন একটি সেলে রাখা হয়েছে সফুরাকে। একজন অন্তঃসত্ত্বা মহিলার এতে মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে।
শুধু তাই নয়। সফুরা তাঁর স্বামীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার জন্য পাঁচ বার আবেদন করেছিলেন জেল কর্তৃপক্ষের কাছে। প্রত্যেক বারই প্রোটোকলের অজুহাত দেখিয়ে তা বাতিল করা হয়েছে। জেলে সফুরার চিকিৎসাও সঠিক ভাবে হচ্ছে না বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তাঁর আইনজীবী।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বৃন্দা গ্রোভার এই প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে যাঁরা প্রতিবাদ করেছিলেন কয়েক মাস আগে, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এই লকডাউনকে ব্যবহার করছে পুলিশ। যেহেতু সফুরা গর্ভবতী, তাই জেল হেফাজতে তাঁর যেন কোনও ক্ষতি না হয়, সে দায়িত্ব বিচারব্যবস্থাকেই নিতে হবে বলে তিনি জানান।