দ্য ওয়াল ব্যুরো: 'দ্য ওয়াল' অনলাইন নিউজ় পোর্টালের তরফে আত্মপ্রকাশ করল নতুন ডিজিটাল পূর্ণাঙ্গ সাহিত্য পত্রিকা 'সুখপাঠ'। তারই প্রকাশ অনুষ্ঠানে শনিবার উপস্থিত ছিলেন সাংবাদিক চন্দ্রিল ভট্টাচার্য। তিনি ভাগ করে নেন এই পত্রিকা ও এই মাধ্যম সম্পর্কে তাঁর কিছু মতামত।
প্রথমেই চন্দ্রিল বলেন, সুখপাঠ কেমন পত্রিকা হবে সে বিষয়ে আকাঙ্ক্ষা প্রচুর থাকলেও এখনও এ নিয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না। তাই প্রথম সংখ্যার সূচিপত্র দেখে তার ভিত্তিতে তাঁর যা মনে হয়েছে সেটুকুই ভাগ করে নিতে পারেন।
চন্দ্রিল প্রথমেই জানান, পড়শি দেশের গল্প বলে নেপালের একটি গল্প প্রকাশিত হয়েছে সুখপাঠে। বাংলাদেশের গল্প ও কবিতাও প্রকাশিত হয়েছে। এমনটা তাঁর খুব ভাল লেগেছে। তাঁর কথায়, "এ মুহূর্তে আমাদের দেশে তথা বিশ্বে পড়শিদের প্রতি বৈরী মনোভাবাপন্ন হওয়ার একটা অনুশীলন চলছে। সেটা অনেক সমর্থন ও হাততালিও পাচ্ছে। যেন পড়শিকে পেটানো বা হিংসা করাটাই দস্তুর, ভালবাসাটা নয়। সেখানে এই পত্রিকা যে প্রথম থেকেই 'শুধু আমাদের কথা বলব' এই দৃষ্টিভঙ্গি না রেখে পড়শিদেরও সমাদর করে আসন দিচ্ছে, এ আমার খুব ভাল লেগেছে।"
এর পরে চন্দ্রিল উল্লেখ করেন, পুনর্মুদ্রণের বিভাগ, 'ফিরে দেখা'র কথা। এবার সেখানে সুকুমার রায়ের একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। "পরবর্তীকালে আমরা আরও বড় মানুষদের লেখা পাব। আমরা সাধারণত মনে করি, আমাদের সমকালেই সবচেয়ে বড় বড় মানুষরা জন্মেছেন, এবং সে সময়ে আমিই সবচেয়ে বড়, বাকিরা একটু ছোট। এই আমাদের মোটামুটি মানসিকতা। কিন্তু আমাদের আগেও তো ইতিহাস ছিল, মানুষ ছিলেন, তাঁরাও কম চিন্তা করতেন না। এখন হয়তো কেউ দারুণ কিছু চিন্তা করলেন, কিন্তু দেখা যাবে অনেক আগেই সক্রেটিস এ কথা বলে গেছেন, যেগুলো কম মূল্যবান নয়। এই যে ফিরে দেখা, বাংলার যে প্রবন্ধগুলো আমরা আজ বিস্মৃত হয়েছি, কিন্তু হয়তো সেগুলির অনেকটা প্রাসঙ্গিকতা আছে আমাদের জ্ঞানের কাছে, মুক্তচিন্তার কাছে-- তার মূল্য অপরিসীম। সেগুলো যে কোনও ডিজিটাল পত্রিকা নতুন করে উদ্ধার করে আমাদের সামনে আনছে, তা আমার চমৎকার লেগেছে।"-- বলেন চন্দ্রিল।
চন্দ্রিল জানান, এই দু'টি বিষয়ের বাইরেও তাঁর সবচেয়ে যা ভাল লেগেছে, তা হল "এই যে আমরা বহু ক্ষেত্রেই বলি, আজকাল মানুষ আর সাহিত্য পড়ে না, অডিও-ভিজুয়াল মাধ্যম এসে এমন ঘুষি মেরেছে যে সাহিত্যপাঠ আর উঠে দাঁড়াবে না। অথচ বাংলা প্রকাশনা জগতের কোনও কর্ণধার হয়তো বলবেন বাংলা বই বেশ ভালই বিক্রি হচ্ছে। আরও একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে, আমরা যারা সারাদিন মোবাইলে মুখ গুঁজে বসে আছি এই সময়ে, তাঁরা কিন্তু ফেসবুকে বা হোয়াটসঅ্যাপে লিখিত বাক্য পড়ছি অনেকটাই। কেউ হয়তো ছোটবেলার কথা লিখেছেন, কেউ সাম্প্রতিক কোনও বিষয় নিয়ে লিখছেন, কেউ হয়তো রাজনৈতিক কোনও নেতা বা নেত্রীকে খারাপ কথাই লিখছেন, কিন্তু সকলে তাঁর মনের কথা লিখছেন লিখিত বাক্যে। সেটা বইযের পাতায় না পড়ে আমরা মোবাইলে বা ল্যাপটপে পড়ছি।"
চন্দ্রিল মনে করিয়ে দেন, এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠতে পারে, এই লেখাগুলি কি সাহিত্যপদবাচ্য? তাঁর কথায়, "এ তর্ক কোনও দিন শেষ হবে না। যা কিছু ছাপা হয় কাগজে সে সবও সাহিত্যপদবাচ্য নাও হতে পারে। কিন্তু কথা হল, বাঙালির লিখিত বাক্য পড়ার যে অভ্যেস, তা পুরোপুরি চলে গেছে, তা হয়তো নয়। যদি ধরে নিই লোকে পড়ছে না, তাহলে পড়ানোর জন্য বা পড়লে আরও বেশি পড়ানোর জন্য-- সব দিক থেকেই সাহিত্য পত্রিকার প্রয়োজনীয়তা আছে।"
এর পরেই চন্দ্রিল বই ও অডিও-ভিস্যুয়ালের দ্বন্দ্ব নিয়ে খুব জরুরি একটা কথা বলেন। তাঁর মতে, "এই যে একটা ধারণা, লোকে অডিও-ভিজুয়াল দেখছে বলে একেবারে সাহিত্য পড়ছে না, এই যে বনামবাদ-- এর বিরুদ্ধে চমৎকার এক উত্তর দিয়েছে সুখপাঠ। এরা প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, সহযোগী। এখানে যেমন লিখিত বাক্য হিসেবে প্রবন্ধ, গল্প, কবিতা থাকবে, তেমনই চলচ্চিত্রও থাকবে।"
চন্দ্রিল উল্লেখ করেন, ইদানীং বিদেশে অডিও বুক অত্যন্ত জনপ্রিয়। "আমাদের হাসি পেতে পারে, কিন্তু ক্ষতি কী আছে! কেউ বলতে পারেন, কেউ পাঠ করলে আর নিজে পড়ায় তফাত থেকে যেতে পারে। দৃষ্টিভঙ্গি প্রভাবিত হতে পারে। তা হোক, সব একসঙ্গে পাওয়া যায় না। এটা সূক্ষ্ম তর্কের বিষয়। কিন্তু বিদেশে সাহিত্য অনুধাবনের বড় মাধ্যম অডিও বুক। সুখপাঠেও শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্প দেবশঙ্কর হালদার পড়ছেন, আমি শুনছি, এটা বিশাল প্রাপ্তি। গল্পটা শুনে কেউ যদি শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটা বই কিনে আনে, তাতে তার সাহিত্যপাঠ বর্ধিত হল।"
চন্দ্রিল সুখপাঠ প্রসঙ্গে সবশেষে বলেন, এই যে একটা ডিজিটাল পত্রিকা কোনও গোঁড়ামিতে না গিয়ে সহযোগী হিসেবে গ্রহণ করছে সকলকে, সাহিত্য বলতে এত দিন যা বুঝে এসেছি তাও দিচ্ছে, সারা বিশ্বের মতো করে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করছে, বাংলা সাহিত্যপত্রিকা এগিয়ে এসে বলছে 'অডিও-ভিজুয়ালের পাশাপাশি চিরকালীন সাহিত্য নেব, সুকুমার রায়ের বিস্মৃত প্রবন্ধও উদ্ধার করে আনব, একদম নবীন লেখককেও সুযোগ দেব, যে লিখতে পারে না, শর্টফিল্ম করে, তাকেও সাহিত্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেব'-- এই যে সংমিশ্রণের ভাবনা তা তাঁর চমৎকার লেগেছে।
চন্দ্রিলের অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা সুখপাঠের পথচলা শুরু করার পাথেয়।