
শেষ আপডেট: 21 October 2018 18:30
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ঘুষ কাণ্ডের অভিযোগে গত মঙ্গলবার সিবিআইয়ের সেকেন্ড ম্যান রাকেশ আস্থানার বিরুদ্ধে এফআইআর করেছে খোদ সিবিআই-ই। এ বার ওই একই দুর্নীতির ঘটনায় সোমবার গ্রেফতার করা হলো সিবিআইয়ের ডেপুটি সুপার মর্যাদার কর্তা দেবেন্দ্র কুমারকে। অভিযোগ, ব্যবসায়ীদের বার বার জেরায় ডেকে হেনস্থা করতেন এই সিবিআই কর্তা। তার পর রেহাই দিতে তোলা আদায়ের মতো মোটা টাকা দাবি করতেন। গ্রেফতার হওয়া দেবেন্দ্র কুমারের সঙ্গে সিবিআই স্পেশাল ডিরেক্টর রাকেশ আস্থানার এ ব্যাপারে আঁতাত ছিল বলে অভিযোগ। তা ছাড়া সিবিআই প্রধান অলোক ভার্মার বিরুদ্ধে তিনি মিথ্যা বিবৃতি দিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ।
গুরুতর ব্যাপার হল, এ দিন দেবেন্দ্র কুমারকে গ্রেফতারের পর সিবিআই দফতরে সিবিআই-ই অফিসাররাই তল্লাশি চালান। যে সব অফিসার রাকেশ আস্থানার ঘনিষ্ঠ ছিলেন অলোক ভার্মার নির্দেশে তাঁদের টেবিলে, দেরাজে কাগজপত্র, দস্তাবেজ ঘেঁটে দেখেন সিবিআইয়ের দুঁদে কয়েকজন অফিসার। [caption id="attachment_44530" align="alignleft" width="414"]
রাকেশ আস্থানা[/caption]
সার্বিক এই পরিস্থিতিকে অনেকেই সিবিআইয়ের মধ্যে এ হেন লড়াইকে 'গ্যাং ওয়ার' বলে মন্তব্য করতে শুরু করেছেন। যা নিয়ে কেন্দ্রে মোদী সরকারের বিরুদ্ধে আঙুল তুলেছেন রাহুল গান্ধীও। নয়াদিল্লির ক্ষমতার করিডরে রাকেশ আস্থানা প্রধানমন্ত্রীর আস্থাভাজন বলেই পরিচিত। গুজরাত ক্যাডারের এই পুলিশ কর্তার সিবিআই-তে নিয়োগও হয়েছে মোদী জমানাতেই। তাই আস্থানা-বিতর্কে বিরোধীরা টেনে আনছেন প্রধানমন্ত্রীর নামও। অবস্থা বেগতিক দেখে রবিবার বিকেলে তাই সিবিআই ডিরেক্টর অলোক ভার্মাকে ডেকে পাঠান প্রধানমন্ত্রী।
কিন্তু প্রশ্ন হল, তাতেও কি সংঘাত থামবে? তা ছাড়া আস্থানার বিরুদ্ধে অভিযোগ যে ভাবে চাউর হয়েছে তার পর কি তা লঘু করা সম্ভব!
গোটা বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে মাস খানেক আগে। যখন সিবিআই ডিরেক্টর অলোক ভার্মার বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় ভিজিল্যান্স কমিশনে নালিশ ঠুকেছিলেন আস্থানা। সিবিআইয়ের অনেকের মতে, এজেন্সির শীর্ষ পদের জন্য দাবিদার হয়ে উঠতেই এ কাজ করেছিলেন আস্থানা। কিন্তু আস্থানার ওই নালিশের বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপ করেন সিবিআই ডিরেক্টর। ভিজিল্যান্স কমিশনকে চিঠি লিখে সিবিআইয়ের তরফে বলা হয়, অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এই অভিযোগ করা হয়েছে। তা ছাড়া এমন একজন এই অভিযোগ করেছেন যাঁর বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি দুর্নীতি মামলা রয়েছে।
এর পরেই ঝুলি থেকে বেরিয়ে পড়তে থাকে বেড়াল। সতীশ বাবু আস্থানা নামে হায়দরাবাদের গাচ্ছিবাউলির এক ব্যবসায়ী ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে জবানবন্দী দিয়ে অভিযোগ করেন, মঈন কুরেশি মামলায় তাঁকে বার বার জেরা করার জন্য ডেকে বিরক্ত করছিলেন সিবিআইয়ের দিল্লিস্থিত দফতরের এক ডিএসপি। যাঁর নাম দেবেন্দ্র কুমার। তাঁকে অন্তত পাঁচ বার জেরার জন্য ডাকা হয়েছিল। কিন্তু প্রতিবারই তাঁকে এক প্রশ্ন করা হয়। এক বার তাঁকে মঈন কুরেশির সঙ্গে মুখোমুখিও বসানো হয়েছিল। তখনও তাঁর ও মঈন কুরেশির বক্তব্যের মধ্যে কোনও ফারাক ছিল না। তা সত্ত্বেও তাঁকে হেনস্থা করা থামাননি দেবেন্দ্র কুমার। এর পরেই এক ব্যবসায়ী মারফত রাকেশ আস্থানা তাঁর কাছে ৫ কোটি টাকা দাবি করেন। বিনিময়ে তাঁকে মামলা থেকে রেহাই দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু টাকা দিলেও তাঁরা তাঁকে রেহাই দেননি।
সতীশবাবুর ওই জবানবন্দির ভিত্তিতেই এফআইআর দায়ের হয়েছে রাকেশ আস্থানার বিরুদ্ধে। একই মামলাতেই সোমবার গ্রেফতার করা হয় দেবেন্দ্র কুমারকে।
আইনজীবীদের একাংশের মতে, আস্থানার বিরুদ্ধে যে মামলায় এফআইআর করা হয়েছে তাতে তাঁকে এক্ষুণি গ্রেফতার করা উচিত। তা ছাড়া যেহেতু তাঁর বিরুদ্ধে ১৬৪ ধারায় ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে সাক্ষ্য দিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে তাই জামিন পাওয়াও তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু হতে পারে রাজনৈতিক কারণেই তাঁকে গ্রেফতার করা হচ্ছে না।
অতীতে ইউপিএ জমানায় সিবিআই প্রধান রণজিত সিংহের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। তখন মনমোহন সরকারের বিরুদ্ধে ঝাঁঝালো আক্রমণ শানিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদী। এখন সেই একই ঝঞ্ঝাট ব্যুমেরাং হয়ে মোদীর দিকে ফিরছে। বড় বিড়ম্বনার বিষয় হল, সিবিআইয়ের স্পেশাল ডিরেক্টর পদে প্রধানমন্ত্রীই যে তাঁকে বসিয়েছেন তা দুনিয়া জানে। ফলে গোটা ঘটনা নিয়ে বিরোধীদের সমালোচনা এড়ানো এবং সিবিআই-য়ে গৃহযুদ্ধ থামানো এখন মহা চ্যালেঞ্জ মোদীর সামনে। বিজেপি-র অনেকে আশঙ্কা করছেন, এই গ্যাং ওয়ার স্রেফ অলোক ভার্মা ও রাকেশ আস্থানার লড়াই নয়। এর পিছনে বড় মাথা রয়েছে। হতে পারে রসদও রয়েছে। কেঁচো খুড়তে গিয়ে কিলবিল করে সাপ বেরিয়ে পড়ার আশঙ্কা তাই উড়িয়ে দেওয়া যায় না।