দ্য ওয়াল ব্যুরো: কোভিড সংক্রমণে মহিলাদের থেকে পুরুষরাই বেশি আক্রান্ত, এমন তথ্য উঠে এসেছে নানা সমীক্ষায়। পুরুষদের সংক্রমিত হওয়ার হার কেন বেশি, সে নিয়ে নানারকম মতামত দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। সেই প্রসঙ্গে উঠে এসেছে স্ত্রী যৌন হরমোনের বিষয়টিও। ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন—এই দুই স্ত্রী যৌন হরমোনের কারণেই কি মহিলারা পুরুষদের থেকে তুলনামূলকভাবে বেশি সুরক্ষিত? নিশ্চিত না হলেও মার্কিন বিজ্ঞানীদের গবেষণায় অনেকবারই উঠে এসেছে এই তথ্য।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের একটি রিপোর্ট বলেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কোভিড পজিটিভ পুরুষদের শরীরে স্ত্রী হরমোন ঢুকিয়ে পরীক্ষা করছেন বিজ্ঞানীরা। ইস্ট্রোজেন ও প্রোজস্টেরনের প্রভাবে করোনার সংক্রমণ কমতে পারে বলেই দাবি করা হচ্ছে।
মহিলাদের থেকে পুরুষদের সংক্রমণের হার কেন বেশি, তার জন্য উঠে এসেছে দুই সম্ভাব্য তথ্য
মহিলাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পুরুষদের থেকে বেশি এমন দাবি আগেই করেছিলেন বিজ্ঞানীরা। মার্কিন ও ব্রিটিশ গবেষকদের দাবি পুরুষরা কেন বেশি সংক্রমিত হচ্ছেন তার জন্য দুটো কারণ থাকতে পারে।
প্রথমত, দেহকোষের রিসেপটর প্রোটিন যার সঙ্গে ভাইরাসের স্পাইক গ্লাইকোপ্রোটিন জোট বাঁধে। এই রিসেপটর প্রোটিন ‘অ্যাঞ্জিওটেনসিন-কনভার্টিং এনজাইম ২’ তথা ACE-2 বেশিরভাগ অঙ্গের কোষের থাকেই। বিজ্ঞানীরা আগেই বলেছিলেন, সার্স-কভ-২ ভাইরাস মানব শরীরে ঢোকার জন্য নাক, মুখ আর গলার রাস্তাকেই ব্যবহার করে। কারণ এখানেই থাকে তাদের পছন্দের গবলেট ও সিলিয়েটড কোষ। এই কোষের রিসেপটর প্রোটিনের সঙ্গে জুটি বেঁধে সরাসরি কোষে ঢুকে যায় তারা। তারপর নিশানা বানায় ফুসফুস ও শরীরের বাকি অঙ্গকে। ভাইরাসের স্পাইক প্রোটিন হল তাদের চাবি আর মানব শরীরের এই রিসেপটর প্রোটিন হল তাদের প্রবেশের রাস্তা। এই দুই মিলে গেলেই তারা ঝপ করে কোষে ঢুকে পড়তে পারে। গবেষকরা দাবি করছেন, পুরুষদের শরীরে এই রিসেপটর প্রোটিনের সংখ্যা মহিলাদের থেকে বেশি থাকতে পারে। সেই কারণেই পুরুষের শরীরে ভাইরাসের সংক্রমণের হারও অধিক।
দ্বিতীয়ত, যৌন হরমোন। ‘দ্য জার্নাল অব ইমিউনোবায়োলজি’ তেও বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন ল্যাবরেটরিতে ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করেও এই বিষয়টা কিছুটা হলেও নিশ্চিত হওয়া গেছে। গবেষণায় দেখা গেছে স্ত্রী যৌন হরমোন ইস্ট্রোজেন এই ACE-2 রিসেপটর প্রোটিনের উপর প্রভাব খাটাতে পারে। ওয়াশিংটনের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির গবেষক ক্যাথরিন স্যান্ডবার্গ বলেছেন, “দেহকোষের রিসেপটর প্রোটিনের উপর প্রভাব থাকতে পারে ইস্ট্রোজেনের। এই রিসেপটর প্রোটিন পুরুষ ও স্ত্রীয়ের শরীরে ভিন্ন রকম ভাবে কাজ করে।” সেটা কীভাবে? ক্যাথরিন বলছেন, পরীক্ষা করে দেখা গেছে ইস্ট্রোজেন কিডনিতে এসিই-২ রিসেপটর প্রোটিনের কাজ করার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এই প্রোটিনের প্রকাশ যদি কমে তাহলেই ভাইরাস আর এই রিসেপটরকে চিহ্নিত করতে পারবে না। ফলে কোষে ঢোকার রাস্তাটাই খুঁজে পাবে না।
কিডনি ছাড়াও অন্যান্য অঙ্গের কোষে স্ত্রী যৌন হরমোন কীভাবে রিসেপটর প্রোটিনের উপর কাজ করছে সেটাই পরীক্ষা করে দেখছেন গবেষকরা।
স্ত্রী যৌন হরমোনের ট্রায়াল কীভাবে হচ্ছে পুরুষদের উপর
‘জার্নাল অব আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন’ জানিয়েছে নিই ইয়র্কের প্রতি এক লক্ষ জনের মধ্যে ৩৯ জন মহিলার মৃত্যু হয়েছে কোভিড সংক্রমণে, পুরুষদের ক্ষেত্রে সেই সংখ্যা ৭১ জনের বেশি। অন্যদিকে, ইতালিতে ১৫৯১ সঙ্কটাপন্ন রোগীদের মধ্যে দেখা গেছে ৮২ শতাংশই পুরুষ। ভারতেও কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রকের রিপোর্ট বলছে, আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে ৬০ শতাংশই পুরুষ।
নিউ ইয়র্কের স্টোনি ব্রুক ইউনিভার্সিটির গবেষক ডক্টর শ্যারন ন্যাচম্যান জানিয়েছেন, ১১০ জন কোভিড পজিটিভ রোগীর উপরে পরীক্ষা শুরু হয়েছে। তাঁদের সকলেরই হয় নিউমোনিয়া, বা জ্বর, নয়তো তীব্র শ্বাসের সমস্যা রয়েছে। এই রোগীদের অধিকাংশই পুরুষ। বয় ১৮ বছর থেকে ৬০ বছরের উপরে। তবে ৫৫ বছরের উপরে এমন কয়েকজন মহিলা যাঁদের মেনোপজ হয়ে গেছে এবং ইস্ট্রোজেনের মাত্রা কমতে শুরু করেছে।

গবেষক শ্যারন বলছেন, রোগীদের দুটি দলে ভাগ করা হয়েছে। একটি দলের রোগীদের শরীরে প্রথম এক সপ্তাহ ইস্ট্রোজেন প্যাচ লাগিয়ে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। পরে পাঁচদিনের কোর্সে প্রতিদিন প্রোজেস্টেরনের দুটি ডোজ দেওয়া হয় তাদের। শ্যারন বলছেন, এই ট্রায়ালের পর্যবেক্ষণ চলছে। ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন কীভাবে রোগীদের শরীরে কাজ করবে সেটা সঠিক তথ্য পাওয়ার পরেই জানা যাবে।
যৌন হরমোনের তত্ত্বে যদিও সব বিজ্ঞানীরা সম্মতি দেননি। জন হপকিনস ইউনিভার্সিটির গবেষকদের দাবি, স্ত্রী যৌন হরমোনের কারণেই যদি মহিলারা কম সংক্রমিত হন, তাহলে বয়স্ক মহিলাদের মধ্যেও সংক্রমণের হার কম কেন। মেনোপজ হয়ে গেছে এমন মহিলারাদের থেকে বয়স্ক পুরুষরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন কোভিড সংক্রমণে। অনেক গবেষকেরই তাই দাবি, শুধু স্ত্রী যৌন হরমোন নয়, ধূমপানে আসক্তি, জীবনযাপনের ধরন, পরিচ্ছন্নতা ও নেশার মাত্রা, অনেককিছুই ফ্যাক্টর রয়েছে নারী-পুরুষ সংক্রমণ হারের এই ফারাকের পিছনে। সেটা আরও বিশদে গবেষণার পেই জানা যাবে।