
শেষ আপডেট: 9 February 2020 02:11
সুমিত্র বন্দ্যোপাধ্যায়
সম্পদের মতো আসে নিঃশব্দে, চলেও যায়। বাতাস পর্যন্ত কাঁপে না। নিঃশব্দে তুলে নেয় মেঠো ইঁদুরের প্রাণ। কখনও সম্পদের দেবী লক্ষ্মীর পায়ের নীচে কখনও যুদ্ধের দেবী এথেনার মাথার উপরে। টেট্রাদ্রাখম থেকে নাজকা লাইন, পুরাণ থেকে আধুনিক ইউরো এমনকি কলকাতা বইমেলার প্রথমবারের ম্যাসকট। অন্ধকারে সে কাটায় বিনিদ্র রাত সৌপ্তিকের অপেক্ষায়। রাত জেগে সে আহরণ করে জ্ঞান। প্যাঁচা। দেশবিদেশের পৌরাণিক কাহিনির সঙ্গে যত প্রাণী জুড়ে আছে তার মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি আলোচিত নিশাচর হল প্যাঁচা। বাঘের বীর্য, সিংহের শৌর্য, বাজপাখির রাজসিক ঐশ্বর্য তার নেই তবুও পুরাণ থেকে মহাভারত, গ্রিস থেকে দক্ষিণ আমেরিকা – সর্বত্র নানা ভাবে রয়েছে এই প্রাণীটি। আমাদের লক্ষ্মীপ্যাঁচা মন্দার পর্বতকে ব্যবহার করা হয়েছিল দণ্ড হিসাবে, রজ্জু হয়েছিলেন স্বয়ং অনন্তনাগ। একদিকে দেব আর উল্টোদিকে অসুর – শুরু হল সমুদ্রমন্থন। অমৃতকুম্ভের সন্ধান পাওয়ার আগে সেই মন্থন থেকে উত্থান হয়েছিল দেবী লক্ষ্মীর, একটি পৌরাণিক মত সেকথাই বলে। তাঁর বাহন দুগ্ধফেননিভ প্যাঁচা, যাকে আমরা বলি লক্ষ্মীপেঁচা। মহাভারতের সৌপ্তিক পর্বেও রয়েছে প্যাঁচার কথা। সৌপ্তিক কথার মানে রাতের যুদ্ধ। মহাভারতে তেমন যুদ্ধ হয়েছিল একবারই, রীতি ভেঙে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের অষ্টাদশ রাতে। সেখানে ছিলেন কৌরবপক্ষের কৃপাচার্য, অশ্বত্থামা ও কৃতবর্মা। তাঁরা দেখেছিলেন কেমন ভাবে রাতের অন্ধকারে একটি প্যাঁচা আক্রমণ করেছে ঘুমন্ত কাককে। সেই রাতে একই ভাবে পঞ্চপাণ্ডবকে হত্যার চেষ্টা করেন পরাজিত কৌরবশিবিরের যোদ্ধারা। ঘুমিয়ে থাকা পাঁচজনকে পঞ্চপাণ্ডব মনে করে তাঁদের লক্ষ্য করে বাণ ছোড়েন অশ্বত্থামা। সেই রাতে অবশ্য নির্দিষ্ট শিবিরে ছিলেন না পঞ্চপাণ্ডব। তাঁদের বদলে ছিলেন পঞ্চ উপপাণ্ডব মানে দ্রৌপদীর গর্ভজাত পঞ্চপাণ্ডবের পাঁচ পুত্র। তাঁদের নাম প্রতিবিন্ধ্য, সূতসোম, শ্রুতকর্ম, শতণীক ও শ্রুতসেন। তাঁদের মৃত্যু হয়েছিল সৌপ্তিকপর্বে যার মূলে একটি প্যাঁচা। এথেনার প্যাঁচা গ্রিকদের বিদ্যা থেকে যুদ্ধ – অনেক কিছুরই দেবী এথেনা। কখনও তাঁর মাথার উপরে কখনও তাঁর হাতের উপরে থাকে একটি প্যাঁচা। যাঁরা আইকনোগ্রাফি নিয়ে চর্চা করেন তাঁরা সহজেই চিনে নিতে পারেন দেবী এথেনাকে। চিহ্ন দেখে মূর্তি বোঝাকে বলে আইকনোগ্রাফি। দেবী এথেনা যুদ্ধের দেবী। প্যাঁচার মতো ভাল শিকারি পাখি পাওয়া দুষ্কর। অন্ধকারে সে নজর রাখে শিকারের উপরে। তার নড়াচড়া দেখে নিঃশব্দে নেমে গিয়ে কেড়ে নেয় শিকারের প্রাণ।
আমাদের দেশে বৌদ্ধপণ্ডিতদের কথা বলুন বা মধ্যযুগে ইউরোপের পণ্ডিতরা – তাঁরা প্রদীপের আলোয় জ্ঞানের চর্চা করতেন অন্ধকারে বসে। এথেনা যখন বিদ্যার দেবী তখনও প্যাঁচার এই চারিত্রিক গুণের সঙ্গে তাঁর বাহনটি বেশ খাপ খেয়ে যায়।
টেট্রাদ্রাখম থেকে ইউরো
ইউরো চালু হওয়ার আগে গ্রিসদেশের টাকার নাম ছিল দ্রাখমা। প্রাচীন গ্রিসে সবচেয়ে বেশি যে মুদ্রার চল ছিল সেটি হল চার দ্রাখমা বা টেট্রাদ্রাখম। আমাদের যেমন এখন সবচেয়ে বেশি ব্যববহার করা হয় ১০ টাকার নোট তখন তেমনি ছিল টেট্রাদ্রাখম – সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা মুদ্রা। গ্রিসের টেট্রাদ্রাখমে ছিল বিশেষ ধরনের একটি প্যাঁচার ছবি যেটি দেবী এথেনার বাহন।
[caption id="attachment_185123" align="aligncenter" width="452"]
টেট্রাদ্রাখম[/caption]
গ্রিকরা ভারতেও তাদের সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিল। সেই সূত্রে ভারতেও চালু হয়েছিল টেট্রাদ্রাখম তবে তাতে সেই প্যাঁচাটি ছিল না।
ইউরো চালু হওয়ার আগেও গ্রিসের বিভিন্ন দ্রাখমায় দেখা যেত টেট্রাদ্রাখমে ব্যবহার করা সেই প্যাঁচাটিকেই। দেখা যেত না বলে এখনও দেখা যায় বললেই ঠিক হবে।
[caption id="attachment_185124" align="aligncenter" width="570"]
গ্রিসের বিভিন্ন দ্রাখমায় দেখা যেত সেই প্যাঁচা[/caption]
গ্রিসের ইউরোয় এখনও দেখা যায় সেই প্যাঁচা। বলে রাখা ভাল যে ইউরো জোনের যে সব দেশে ইউরো নামে মুদ্রা চালু হয়েছে তাদের মধ্যে বেশির ভাগেরই নিজস্ব ইউরো আছে যদিও সেগুলির এক পিঠ অভিন্ন হওয়ায় যাঁরা জানেন না তাঁরা তফাত করতে পারেন না কোনটি কোন দেশে তৈরি।
[caption id="attachment_185125" align="aligncenter" width="225"]
গ্রিসের ইউরো[/caption]
শুধু গ্রিস কেন, স্লোভেনিয়ার পয়সা ২০ স্টটিনভেও রয়েছে পেঁচার ছবি। আমাদের প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কার একাধিক ব্যাঙ্কনোটেও রয়েছে প্যাঁচা।
নাজকা লাইনে প্যাঁচা
নাজকা লাইনের অতিকায় রেখচিত্রের মধ্যে প্যাঁচাও রয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকার এই লাইন এখন ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের স্মারক। যাঁরা এই লাইন সম্বন্ধে আরও জানতে চান তাঁরা পড়ে নিতে পারেন নীচের লিঙ্কে ক্লিক করেই।
নতুনগ্রামের প্যাঁচা[/caption]
বর্ধমান জেলার নতুনগ্রামের প্যাঁচা অবশ্য বাংলার একেবারে নিজস্ব। এই প্যাঁচার গঠনশৈলী হল মূল আকর্ষণ। বনবাদাড়ে পাওয়া সাধারণ কাঠ কেটে তাতে রং করে এই প্যাঁচা তৈরি করা হয়। কোনও প্যাঁচার মাথা হয় চারকোণা আবার কোণওটির মাথা হয় তিনকোণা।
আগে লক্ষ্মীর ভাঁড়ও অনেক সময় প্যাঁচার আদলে হত। তাতে খুচরো পয়সা জমাতেন গৃহস্থ।
বইমেলায় প্যাঁচা
কলকাতা আন্তর্জাতিক পুস্তক মেলা এবার চুয়াল্লিশ বছরে। এই বইমেলার ইতিহাসে এই প্রথম বার একটি ম্যাসকট ব্যবহার করা হয়েছে। এটি আদতে একটি প্যাঁচা বসে বই পড়ছে। খুব বড় করে কিছু করা হয়নি বলে হয়তো নজর এড়িয়ে গেছে অনেক বইপ্রেমীরই।
পড়ার অভ্যাস যাঁদের রয়েছে তাঁদের বেশিরভাগই রাত জেগে বই পড়েন, অন্ধকারে একা। সে দিক থেকে বিচার করলে এই ম্যাসকটটি বেশ অর্থবহ। ই-বুক বেরিয়েছে, তা পড়ার জন্য আলাদা মোবাইল ডিভাইসও বেরিয়েছে। তা সত্ত্বেও এখনও পাঠকরা যান বইমেলায় বই কিনতে ও দেখতে। বই পড়েন রাত জেগে।
[caption id="attachment_185128" align="aligncenter" width="421"]
বইমেলায় ম্যাসকট প্যাঁচা[/caption]
পত্রভারতীর কর্তা তথা বইমেলার অন্যতম উদ্যোক্তা ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায় বলেন, “প্যাঁচাকে আমরা জ্ঞানী বলেই মনে করি। হ-জ-ব-র-লতেও প্যাঁচা রয়েছে। জ্ঞানবৃদ্ধ প্রাণী বলে তাকে মনে করা হয়। তাই এই ভাবনা আমরা ভেবেছি। ক্যান্ডিড কমিউনিকেশন এটি বানিয়েছে যদিও পরে আমরা তাতে পরিবর্তন করেছি। এর নাম রাখা হয়েছে টিটো। নামটি আমাদেরই দেওয়া।”
মজা করে তিনি বললেন, “প্যাঁচা তো লক্ষ্মীরও বাহন, তাই আমরাও ভাবছি যদি এই ভাবে প্রকাশকদের ঘরেও লক্ষ্মী আসে।”
বইমেলায় থিমসং থাকলেও বাকি ছিল ম্যাসকট। এবার সেটিও হয়ে গেল।