
শেষ আপডেট: 10 December 2019 18:30
জয়দেব ঘোষ। বাঘাযতীন, গাঙ্গুলিবাগান এলাকায় বাড়ি। নিজেরই অ্যাম্বাস্যাডর। সকালে কাজ করেন সল্টলেকের জলসম্পদ ভবনে। রাতে গাড়ি ছুটিয়ে বেরিয়ে পড়েন মানুষজনকে নিরাপদে তাদের গন্তব্যে পৌঁছে দিতে। নিজের গন্তব্য কোথায়? তার সঠিক জবাব দিতে পারেননি জয়দেববাবু। ভবিষ্যত অজানা, বর্তমানে মানুষের পাশেই দাঁড়াতে চান নিজের মতো করে। তাতে লাভের অঙ্ক কতটা বাড়ল সেটা হিসাব করেন না তিনি। আতঙ্কমাখা মুখগুলোতে যখন ভরসার হাসি ফুটে ওঠে, সেটাই বিরাট প্রাপ্তি জয়দেববাবুর কাছে। স্বার্থের গন্ধমাখা সমাজে মানুষের উপকার করাটাই লক্ষ্য তাঁর, পেশার থেকেও বড় নেশা।
বাঘাযতীনের ভাড়াবাড়ির দুটো ঘরে তিনজনের টানাটানির সংসার। ছেলে অভিজিৎ বাঘাযতীন বয়েজ স্কুলের ক্লাস নাইনের মেধাবী ছাত্র। ছেলের পড়ার খরচ, সংসার খরচ সামলে উঠতে হিমশিম খেতে হয় জয়দেববাবুকে। বললেন, “সকাল ১০টা থেকে জলসম্পদ ভবনে ডিউটি থাকে। সন্ধ্যে ৭টা অবধি গাড়ি চালাই। তারপর বাড়ি ফিরে কিছু খেয়ে আবার গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। রাত ১০টা থেকে ভোর ৪টে অবধি গোটা শহরের নানা জায়গায় ঘুরি আমি। অত রাতে গাড়ির অভাবে কত মানুষ বিপদে পড়েন। অ্যাপ ক্যাবের মোটা টাকা দিতে পারেন না অনেকেই। সেইসব মানুষের জন্যই আমার গাড়ি। তাঁদের নিরাপদে পৌঁছে দেওয়াই আমার কর্তব্য।”
কোন কর্তব্যের বোঝা নিজের ঘাড়ে নিয়েছেন জয়দেববাবু সেটা মনে হয় তিনি নিজেও জানেন না। বলেছেন, “আমি অত ভেবে কাজ করিনি। এখন যা দিনকাল পড়েছে কিছুটা হলেও যদি মানুষের উপকার করতে পারি সেটাই অনেক। কত মানুষকে বিপদে পড়তে দেখেছি, কত পথ দুর্ঘটনা দেখেছি। আহতকে রাস্তায় পড়ে কাতরাতে দেখেছি। তাই নিজেই ঠিক করেছি সারা রাত যতটা পারব মানুষের পাশে দাঁড়াব।”
২০১৫ সাল থেকে রাত ১০টার পর গাড়ি নিয়ে বেরোচ্ছেন জয়দেববাবু। তবে কখনও তার আগেও বেরোন তিনি। বিশেষত রবিবার। কারণ ছুটির দিনে রাস্তা এমনিতেই ফাঁকা থাকে। একটা ঘটনা মনে খুব দাগ কেটেছিল তাঁর। সেটা ঠিক কোন সময় মনে করতে পারেননি তিনি। বলেছেন, “এক মহিলাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে ফিরছি। সেদিন খুব ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে। বেলঘরিয়া এক্সপ্রেসওয়েতে চোখের সামনে একটা বাইককে জমা জলে ছিটকে পড়তে দেখলাম। সেই বাইকে ছিলেন এক তরুণ দম্পতি ও তাঁদের মাস ছয়েকের ছেলে।” সঙ্গে সঙ্গেই পৌঁছে যান সেখানে। বলেছেন, “মাস ছয়েকের বাচ্চাটাকে নিয়ে জলে পড়ে গিয়েছিলেন তরুণী। বাইকও উল্টে গিয়েছিল। বড় বিপদ হতে পারত। ওই পরিবারকে দমদম পার্কে পৌঁছে দিয়েছিলাম। এই ঘটনা মনে দাগ কেটে যায়। আরও বেশি মানুষের পাশে থাকার অঙ্গীকার করি।”
রাত তখন সাড়ে ১২টা হবে। বলে চললেন জয়দেববাবু। এক বৃদ্ধ দম্পতি অ্যাপোলো হাসপাতাল থেকে বেরোলেন। যে ট্যাক্সিকেই ডাকেন মুখ ফিরিয়ে চলে যায়। বৃদ্ধার ক্লান্ত মুখ। দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলেন না। ছুটে গেলেন জয়দেববাবু। “ওই দম্পতিকে এয়ারপোর্টে ছেড়ে আসি সেদিন। কোনও গাড়ি যেতে চাইছিল না। বয়স্কা মহিলা খুব অসুস্থ ছিলেন। ভদ্রলোক আমাকে অনেক টাকা ভাড়া দিতে চাইলেন, নিলাম না। যতটুকু ভাড়া হয় তাই নিয়েছি। ওঁদের পৌঁছে দিতে পেরেই আমার আনন্দ হয়েছিল,” জয়দেববাবুর গলা সামান্য কেঁপে গেল। হয়তো আবেগতাড়িত হয়ে পড়েছিলেন।
সেই ১৯৯৮ সাল থেকে স্টিয়ারিং ধরেছেন জয়দেববাবু। পেশার বাইরে তখনও অসহায়, আর্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতেন। রাস্তায় অসুস্থ হয়ে পড়া মানুষজনকে দেখলে ছুটে যেত তাঁর গাড়ি। এখন সেই দায়িত্বই পালন করছেন নিয়ম মেনে। বলেছেন, হোটেল, রেস্তোরাঁ বা ক্যাটারিংয়ের কাজ করেন যে তরুণ-তরুণীরা, রাত হলে তাঁদের বাড়ি ফিরতে খুবই অসুবিধা হয়। “মাঝরাতে পার্কস্ট্রিটের কোনও বার বা রেস্তোরাঁ, অথবা বিয়েবাড়ির শেষে ক্যাটারিংয়ের ছেলে, মেয়েদের বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছি অনেক বছর ধরেই। অনেক কমবয়সী ছেলেমেয়েরা রাতের পথে বেরিয়ে বিপদে পড়েন। আমি তাঁদের পাশে আছি,” জয়দেববাবু বললেন,হোটেলে বাসন মাজেন যে মহিলা মাঝরাতে বেরিয়ে তাঁর অসহায় দু’চোখ দেখেছেন। তাতে ভয় আর আসন্ন বিপদের শঙ্কা ছিল। হাতে পয়সাও নেই যে ক্যাব ভাড়া করবেন। সেইসব মানুষদের জন্যই জয়দেববাবুর গাড়ি। বলেছেন, “অনেক আইটি সেক্টরের তরুণীকে রাতে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছি। দেখেছি গাড়িতে উঠতে তাঁরা ভয় পান। নিরাপত্তার অভাব এতটাই চেপে বসেছে রাতের শহরে।“
মল্লিকবাজারের কাছে একটি ব্লাড ব্যাঙ্ক থেকে রক্ত নিয়ে মাঝরাতে ফেরার পথে বিপদে পড়েছিলেন দুই যুবক। জয়দেববাবুর কথায়, তাঁদের গন্তব্য ছিল বারাসতের একটি হাসপাতাল। দ্রুত পৌঁছতে না পারলে রোগীর অবস্থা আরও খারাপ হবে। এদিকে রক্তের আকাল। তাই এত দূরে ছুটে এসেছেন, অথচ আর ফিরে যেতে পারছেন না। রাত তখন আন্দাজ ১টা। সেখানেও ত্রাতা হয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন জয়দেববাবু। সঠিক সময় পৌঁছে দিয়েছিলেন দু’জনকে।
[caption id="attachment_167461" align="aligncenter" width="450"]
ফ্রান্সের সেই যাত্রীর সঙ্গে জয়দেববাবু[/caption]
‘‘ফ্রান্সের দুই যুবককে তাঁদের গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছিলাম মাঝরাতে। দু’জনের চোখে যে কৃতজ্ঞতা দেখেছিলাম কোনওদিন ভুলব না। ভাষা বুঝিনি, শুধু তাঁদের মনের ভাব অনুভব করেছিলাম,’’ বললেন জয়দেববাবু। হাডকো থেকে দু’জনকে পৌঁছে দিয়েছিলেন হাওড়ায়। ১০০ টাকা নাকি বকশিস পেয়েছিলেন। আরও উপরি পাওনা তাঁর হাত ধরে দু’জনের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। এমন ঘটনা অসংখ্য, হয়তো হাজারে হাজারে। সবটা মনেও করতে পারেন না জয়দেববাবু।
জয়দেববাবু ছুটে চলেছেন। তাঁর ছুটি নেই। বরং ছুটির দিনেই দায়িত্ব বেশি। সারারাতের তেলের খরচ তাঁর রোজগারের থেকে অনেক বেশি। লাভের ভাঁড়ার তাই শূন্যই। ছেলেকে উচ্চশিক্ষা দিতে চান। তার জন্য দিনেই পরিশ্রম আরও বাড়াতে চান জয়দেববাবু। কারণ রাতের এই জার্নিটা তাঁর পেশা নয়, তাঁর জীবনের অন্যতম লক্ষ্য। লোভ, স্বার্থপরতা, দলাদলির সমাজে মানুষের ভাল করার এই সুপ্ত বাসনা কোনও প্রচারের আলোর জন্য নয়। মনের তৃপ্তির জন্য, বিবেকের সন্তুষ্টির জন্য। অভাব যদি মুখের গ্রাসও কেড়ে নেয় তাতেও দমবেন না জয়দেববাবু। বলেছেন, ‘‘এ শহরে যদি খেয়েপরে বাঁচতে না পারি, তাহলে অন্য শহরে যাব। যেখানেই যাব সেখানেই এইভাবে মানুষের পাশে দাঁড়াব।’’ জয়দেববাবুর লক্ষ্যের পথ মানুষের মনের দরজা ছুঁয়ে যায়, লোভের কাঁটা সেখানে আঁচড় কাটতে ভয় পায়। এমনই থাকুন জয়দেববাবু, কল্লোলিনী কলকাতা স্যালুট জানায় আপনাকে!