দ্য ওয়াল ব্যুরো: নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে আঁচ বাড়ছে সারা দেশজুড়ে। দেশের একটা বড় সংখ্যক মানুষ রীতিমতো সিঁটিয়ে আছেন ভয়ে, কারণ তাঁদের আশঙ্কা, তাঁদের ধর্মের কারণেই দেশ ছাড়তে হতে পারে। বিক্ষোভের জেরে সারা দেশ যখন উত্তাল, তখন অন্য সুরে গলা তুললেন দিল্লির জামা মসজিদের ইমাম সইদ আহমেদ বুখারি। নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে বেড়ে ওঠা আন্দোলনকে সংযত করার অনুরোধ করে তাঁর বক্তব্য, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে প্রতিবাদ করা দরকার, আবেগে রাশ টানা দরকার৷
কেন্দ্রের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বলছে, পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে যত অ-মুসলিম ব্যক্তি ধর্মীয় কারণে উৎপীড়িত হয়ে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ভারতে এসেছেন, তাঁরা সকলেই শরণার্থী হিসেবে এ দেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য আবেদন করতে পারবেন। বিরোধীদের দাবি, নাগরিকত্ব পাওয়ার মাপকাঠি কখনওই ধর্ম হতে পারে না। এটা সংবিধান বিরোধী।
নতুন আইনটির মাধ্যমে ধর্মের ভিত্তিতে বিবেচনা করে অবৈধ অভিবাসীদের দেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া সংবিধানের মূল কাঠামোর পরিপন্থী। আবার মুসলিম ব্যক্তিদের শুধু ধর্মের কারণে দেশ ছাড়তে হবে। মামলাকারীদের দাবি, সংবিধান অনুযায়ী ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। যে কোনও ধর্মীয় বিশ্বাসের মানুষের সঙ্গে সমান আচরণ করতে বাধ্য এ দেশের সরকার। নতুন আইন সেই সংবিধানকে আঘাত করছে। এই আইন নাগরিকদের জীবন ও মৌলিক অধিকার তথা সাম্যের অধিকারও লঙ্ঘন করে।
১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইনে ভারতের নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য ১২ মাস টানা ভারতে থাকতে হত৷ একইসঙ্গে গত ১৪ বছরের মধ্যে ১১ বছর ভারতবাস জরুরি ছিল। সংশোধনী বিলে এই দ্বিতীয় নিয়মটিতে পরিবর্তন ঘটানো হচ্ছে। ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে আনা নির্দিষ্ট ছ'টি ধর্মাবলম্বীদের জন্য ১১ বছর সময়কালটিকে নামিয়ে আনা হচ্ছে ৬ বছরে। বেআইনি অভিবাসীরা ভারতের নাগরিক হতে পারে না। এই আইনের আওতায়, যদি পাসপোর্ট বা ভিসা ছাড়া কেউ দেশে প্রবেশ করে থাকেন, বৈধ নথি নিয়ে প্রবেশ করার পর নির্দিষ্ট সময়কালের বেশি এ দেশে বাস করে থাকেন, তা হলে তিনি বিদেশি অবৈধ অভিবাসী বলেই গণ্য হবেন।
কয়েক সপ্তাহ আগে সংসদে এই নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল নিয়ে এসেছিল বিজেপি। গত বুধবার মধ্যরাতে তাতে স্বাক্ষর করেছেন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ, তার পরেই এটি আইনে পরিণত হয়েছে। প্রতিবাদের আগুন জ্বলে উঠেছে সারা দেশ জুড়ে। বিক্ষোভে-বিদ্রোহে পথে নেমেছে সমস্ত বিরোধী দল, ছাত্রসমাজ, সাধারণ মানুষ। অসমে হিংসার বলি হয়েছেন পাঁচ জন। মঙ্গলবার রণক্ষেত্র হয়ে ওঠে পূর্ব দিল্লির সীলামপুর এলাকা। বিক্ষোভকারী প্রতিবাদীদের সঙ্গে পুলিশি সংঘাতে বন্ধ হয়ে যায় রাস্তা, মেট্রো। কাঁদানে গ্যাস ফাটিয়ে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে পুলিশ। লাঠিচার্জও করা হয় নির্বিচারে।
ইমাম আহমেদ বুখারি জানান, এই গোটা পদ্ধতিতে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে তীব্র এক ভয় তৈরি হয়েছে। অনেকেই সবটা না জেনে বা বুঝে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ফেলছেন তাৎক্ষণিক আবেগে। তিনি বলেন, "নাগরিকপঞ্জি আর নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের মধ্যে তফাত রয়েছে। নাগরিকপঞ্জি এখনও আইন হিসেবে ঘোষণা হয়নি। যে আইন ঘোষণা হয়েছে, অর্থাৎ নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন, তাতে পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে আসা মুসলিম শরণার্থীরা ভারতের নাগরিকত্ব পাবে না বলে জানানো হয়েছে৷ এই আইনের সঙ্গে ভারতে বসবাসকারী মুসলিমদের কোনও সম্পর্ক নেই৷"
যদিও ইতিমধ্যেই নয়া নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনকে চ্যালেঞ্জ করে ৬০টি মামলা দায়ের হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টে। বুধবার সেই মামলাগুলির শুনানি শেষে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এসএস বোবদের নেতৃত্বাধীন তিন বিচারপতির বেঞ্চ জানিয়ে দিল, এই আইনে স্থগিতাদেশ দেওয়া হচ্ছে না। তবে এই আইন কতটা বৈধ, তা খতিয়ে দেখবে আদালত। আদালত জানিয়েছে, এই মামলার পরবর্তী শুনানি হবে আগামী ২২ জানুয়ারি।