
জ্যোতি বসুর প্রয়াণে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য।
শেষ আপডেট: 8 August 2024 13:12
‘তোমাদের নিয়ে সমস্যা কী জানো? এখনও তোমাদের মধ্যে প্রমোদ দাশগুপ্ত ভর করে আছেন।’ খানিক ক্ষোভের সঙ্গেই বললেন জ্যোতি বসু।
‘ইয়েস, আই অ্যাম প্রাউড অব হিম’, ততোধিক অসন্তোষের সঙ্গে কথাটি বলে ঘর থেকে হন হন করে বেরিয়ে গেলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য।
রাইটার্স বিল্ডিংস থেকে সোজা নন্দন। সেখান থেকে আলিমুদ্দিন স্ট্রিট। কেউই তেমন নজর করলেন না, রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রীর গাড়ি বদল হয়ে গেল নন্দনে। লালবাতি দেওয়া সরকারি গাড়ির পরিবর্তে পরিচিত একজনের অ্যাম্বাসডরে চেপে নন্দন ছাড়লেন বুদ্ধদেব।
দিন কয়েক পর খবরের কাগজে ফাঁস হল, মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেছেন বুদ্ধদেব। জ্যোতিবাবুর সঙ্গে মনোমালিন্যের কারণেই পদত্যাগ, চাপা থাকল না সে কথাও। তাহলে কি ‘দুঃসময়’ ঘিরেই বিবাদ দু’জনের। পদত্যাগের দিন কয়েক আগেই, ১৫ আগস্টের সন্ধ্যায় রবীন্দ্রসদনে প্রথম মঞ্চস্থ হয় মন্ত্রী বুদ্ধদেবের নাটক ‘দুঃসময়’। দর্শকাসনে সেদিন প্রথমসারিতে সপরিবারে জ্যোতি বসু। নাটক শেষে নাট্যকার বুদ্ধদেবের প্রসংশা করে রবীন্দ্রসদন ছাড়েন মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু নাটকের বিষয় যেখানে প্রশাসনের অনাচার, আলোচনা অন্যমাত্রা নিতে সময় লাগেনি বুদ্ধদেবের পদত্যাগ ঘিরে। যদিও বাবরি মসজিদ ধ্বংস পরবর্তী দাঙ্গা এবং প্রশাসনের ভূমিকা, নাটকের প্রেক্ষাপটে ছিল গোটা দেশের পরিস্থিতিই।
কেন তবে মন্ত্রিসভা ছেড়েছিলেন বুদ্ধদেব? পরোক্ষভাবে সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম। ১৯৯৩-এর ৭ জানুয়ারি রাইটার্স বিল্ডিংসে জ্যোতি বসুর ঘরের সামনে বসে পড়লেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি তখন কেন্দ্রে নরসিংহ রাও সরকারের মন্ত্রী। এক ধর্ষিতার বিচার চেয়ে ধরণায় বসেছিলেন মমতা। রাতে পুলিশ তাঁকে বলপ্রয়োগ করে তুলে নিয়ে যায়। সেই ঘটনায় অদূরে থাকা প্রেস কর্নারের কতিপয় সাংবাদিকের ভূমিকা ভালো ছিল না, এই অভিযোগে ক’দিন পরেই সেটি সরিয়ে দেওয়া হয়।
কলকাতার সাংবাদিকেরা প্রেস কর্নার ভাঙার তীব্র নিন্দা করে পথে নামেন। সেই ঘটনা নিয়ে গোটা দেশে মিডিয়ার কাঠগড়ায় বামফ্রন্ট সরকার। বিষয়টি প্রেস কাউন্সিল পর্যন্ত গড়ায়। কাউন্সিল রাজ্য সরকারের রিপোর্ট তলব করে। রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি সচিব অরুণ ভট্টাচার্য সেই চিঠির জবাব পাঠিয়ে দেন। কিন্তু তা জানতেন না বিভাগীয়মন্ত্রী বুদ্ধদেব। মন্ত্রীকে অন্ধকারে রেখে সচিবের এমন পদক্ষেপ ভালভাবে নেননি তিনি। তাঁর নির্দেশে সংশ্লিষ্ট ফাইল হাতে বুদ্ধদেবের সামনে হাজির হন অরুণ। অভিযোগ, ফাইলে চোখ বুলিয়ে সেটি ছুঁড়ে ফেলে দেন ক্ষুব্ধ বুদ্ধদেব। অপমানিত অরুণ মুখ্যসচিব নারায়ণ কৃষ্ণমূর্তির কাছে মন্ত্রীর নামে নালিশ ঠোকেন। কৃষ্ণমূর্তি বিষয়টি জ্যোতিবাবুর কানে তোলেন। তারপরই বুদ্ধদেবকে ডেকে জ্যোতি বসুর ওই মন্তব্য, ‘এখনও তোমাদের মধ্যে প্রমোদ দাশগুপ্ত...।’
একদা সিপিএমের দৌর্দণ্ডপ্রতাপ রাজ্য সম্পাদক প্রমোদ দাশগুপ্ত আর জ্যোতি বসু ছিলেন মানসিকভাবে ভিন্ন মেরুর বাসিন্দা। আমলাদের স্বাধিকার এবং অতিসক্রিয়তায় ঘোরতর আপত্তি ছিল প্রমোদ দাশগুপ্তর। বুদ্ধদেবের আচরণে তাই প্রমোদবাবুর প্রসঙ্গে পেরেছিলেন জ্যোতি বসু।
মন্ত্রিসভা ছাড়ার কয়েক মাসের মাথায় নভেম্বর বিপ্লব বার্ষিকীতে ধর্মতলায় লেনিন মূর্তিতে মালা দেওয়ার পর পাঞ্জাবির আস্তিন গুটিয়ে বুদ্ধদেব বলেছিলেন, ‘এই বার মিশে যাব জনতার মাঝে’। তা যদিও সম্ভব হয়নি। এক বছর পরই মন্ত্রিসভার ফেরেন। পার্টি চাইলে দল সরকার, দু-জায়গাতেই বুদ্ধদেবের দরজা বন্ধ করে দিতে পারত। কিন্তু জ্যোতি বসু তা হতে দেননি। অরুণ ভট্টাচার্যর উপর রাগ পুষে রাখেননি বুদ্ধদেবও। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর অরুণকেই তাঁর সচিব করেন।