দ্য ওয়াল ব্যুরো: জল্পনা চলছিল অনেক দিন ধরেই। শোনা যাচ্ছিল, অন্তর্দ্বন্দ্বের ছায়া ক্রমে ঘিরে ধরছে ব্রিটিশ রাজপরিবারকে। অবশ্য এমন জল্পনা বা অন্দরমহলের মনকষাকষি এই প্রথম নয়। এর আগেও অনেকবারই প্রকাশ্যে এসেছে এমন ঘটনা। কিন্তু এইবার যেন সব মাত্রা ছাড়িয়ে গেল। নজিরবিহীন ঘটনা ঘটল ব্রিটিশ রাজপরিবারে। বাকিংহাম প্যালেস ছাড়লেন প্রিন্স হ্যারি এবং তার স্ত্রী মেগান মার্কেল। শুধু তাই নয়, সেইসঙ্গে নিজেদের রাজবংশের পরিচয়ও ত্যাগ করলে তাঁরা।
ছুটির পরেই চির-ছুটির ঘোষণা
এ বিষয়ে পরিবারের সর্বজ্যেষ্ঠ সদস্য, অভিভাবকসম রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ কিংবা বাবা প্রিন্স চার্লসের সঙ্গে কোনওরকম আলোচনাও করেননি হ্যারি-মেগান। এ বিষয়ে সরাসরি সংবাদমাধ্যমে বক্তব্য রাখেন ডিউক অ্যান্ড ডাচেস অফ সাসেক্স।
জানা গেছে, বেশ কিছুদিন ধরেই তারা বিষয়টি নিয়ে যুবরাজ চার্লসের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং আলোচনার জন্য রানির সঙ্গে দেখাও করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বড়দিনের আগে সেই সাক্ষাৎ না পেয়ে তাঁরা ক্রিসমাসের ছুটি কাটাতে কানাডা চলে যান। সেখানে বসেই তাঁদের সিদ্ধান্ত জনসমক্ষে প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন। ছুটির পরে ফিরেই ৮ জানুয়ারি এই কথা ঘোষণা করেন তাঁরা। তার পরেই ফের কানাডা চলে যাবেন বলে জানিয়েছেন তাঁরা। মেগান ইতিমধ্যে চলেও গেছেন সেখানে।
প্রচারের আলোয় অতিষ্ঠ
এই ঘটনায় কার্যত স্তম্ভিত সারা বিশ্বের রাজপরিবারের অনুরাগী মহল। ইতিহাসে কখনও এমনটা ঘটেনি। কী এমন হল, যে রাজপরিবার থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে নিলেন হ্যারি-মেগান! এর কারণ হিসেবে অবশ্য তাঁরা জানিয়েছেন, সাংবাদিকদের অতি-উৎসাহই তাঁদের এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ।
বাকিংহাম প্যালেস থেকে একটি বিবৃতি দিয়ে হ্যারি-মেগান জানিয়েছেন যে, প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকার জন্য তাঁদের অনেক লড়তে হচ্ছে। বিয়ের পর থেকেই প্রতিদিন নানা মুখরোচক খবরাখবর হচ্ছে তাঁদের ঘিরে, যা তাঁদের জীবনে প্রভাব ফেলছে। তাঁদের ওই বিবৃতিতে আরও লেখা-- “আমরা আর্থিক ভাবে স্বনির্ভর হতে চাই। এই রাজপরিবারের বাইরে বেরিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মেলামেশার যে পরিবেশ, তা উপভোগ করতে চাই। ভেবেছি, ইংল্যান্ড ও উত্তর আমেরিকায় ঘুরিয়েফিরিয়ে সময় কাটাব। আমরা চাই, রানি নিজের রাজত্ব সামলে শান্তিতে থাকুন।”
গণমাধ্যমের আলো থেকে নিজেদের ও সন্তান আর্চিকে আড়ালে রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন তাঁরা। তার পরে অনেক চিন্তাভাবনা করেই তাঁরা রাজপরিবারের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
বিনা মেঘে বজ্রপাত!
হ্যারি-মেগানের এই বিবৃতি কার্যত বজ্রপাতের মতোই এসে পৌঁছেছে রাজপরিবারের অন্দরে। তাঁদের এই বক্তব্য রাখার ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই পাল্টা বিবৃতি দিয়ে রানি জানিয়েছেন, “হ্যারি-মেগানের সঙ্গে আমার এই সংক্রান্ত আলোচনা হয়েছিল বহু আগে। আমি জানতাম যে ওরা আলাদা ভাবে কিছু করতে চায়। তবে তা এত তাড়াতাড়ি, সেটা বুঝিনি।”
অনেকেই বলছেন, রানির এই বিবৃতি থেকেই স্পষ্ট, তিনি হতাশ ও আশাহত।
ভাইয়ে-ভাইয়ে মতবিরোধ
রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠ মহল সূত্রের খবর, চার্লস-ডায়নার দুই ছেলে প্রিন্স উইলিয়াম ও প্রিন্স হ্যারির মধ্যে বাইরে থেকে কোনও শত্রুতা চোখে না পড়লেও, সদ্ভাব কোনও দিনই খুব একটা ছিল না। নানা বিষয়েই মতপার্থক্য হতো তাঁদের। প্রিন্স হ্যারির বিয়ের পরে মেগান মার্কেল তাঁদের পরিবারে পা রাখতেই নাকি এই সমস্যা আরও বেড়ে যায়। দু’ভাইয়ের মধ্যে পারিবারিক বিবাদ এমন জায়গায় পৌঁছয়, একসময়ে নাকি মুখ দেখাদেখিও বন্ধ হয়ে যায় তাঁদের।
ভাইয়ে-ভাইয়ে সেই বিবাদ থামাতে আসরে নামেন স্বয়ং রানি এলিজাবেথ। কিন্তু তার পরেও যে শেষরক্ষা হল না, তা বোধহয় স্পষ্ট হয়ে গেল মেগান-হ্যারির ঘোষণায়। বাড়ি থেকে বেরিয়েই গেলেন তাঁরা। রাজপরিবারে ভাঙন ঘটল এই প্রথম।
প্রিন্স হ্যারির এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই তুলনা করছেন অষ্টম এডওয়ার্ডের রাজসিংহাসন ত্যাগের সঙ্গে। ব্রিটিশ রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকার পাওয়ার ক্রমতালিকায় অবশ্য প্রিন্স হ্যারির অবস্থান এখনও অনেক পেছনে, আট নম্বরে।
মা ডায়ানার মতোই রাজকীয়তায় অস্বস্তি
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম সূত্রের খবর, শুধু পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মানিয়ে নিতে অসুবিধা বোধ করাই নয়, পাশাপাশি রাজপরিবারের সিনিয়র সদস্য হিসেবে তাঁদের যেসব ভূমিকা পালন করার কথা, সেগুলোও হ্যারি ও মেগান খুব একটা উপভোগ করছিলেন না। এর কারণও রয়েছে। হ্যারি ও মেগান দু’জনেই সাধারণ মানুষের সঙ্গে বেশ ভাল ভাবে মিশতে পারেন। তাঁরা সারাক্ষণ ক্যামেরার লক্ষ্যবস্তু হয়ে থাকতে মোটেই পছন্দ করেন না। রাজপরিবারের আনুষ্ঠানিকতাও তাঁদের একঘেয়ে লাগত বলে জানা গেছে।
অনেকেই বলছেন, প্রিন্স হ্যারি ও তাঁর স্ত্রী মেগানে এই ধরনের জীবনযাপন করতে চাওয়ার ইচ্ছের তুলনা করা যায় হ্যারির মা প্রিন্সেস ডায়ানার সঙ্গে। সেদিক থেকে দেখতে গেলে, ডায়ানার জীবনও রাজপরিবারের অন্দরে মোটেই সুখের ছিল না। সেই পথ অনুসরণ করেই কি রাজপরিবারের বাইরে সুখের সন্ধান করতে চাইছেন হ্যারি-মেগান?
কণ্ঠরোধ না-পসন্দ
মেগান মার্কেল রাজপরিবারের বধূ হলেও, তার আগে থেকেই অভিনেত্রী হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি চাননি, রাজপরিবারের হাজারো বিধিনিষেধের মধ্যে নিজের কন্ঠস্বর হারিয়ে ফেলতে। এর আগেও তিনি নানা বিষয়ে তাঁর সোজাসাপ্টা মত প্রকাশ করে বিরূপ সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছেন।
একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে মেগান খোলাখুলি স্বীকারও করেছিলেন, রাজপরিবারের জীবনযাপন তাঁদের উপর চাপ তৈরি করেছে। এক জন রাজপুত্রকে বিয়ে করলে তাঁর জীবন যে কতখানি কঠিন হয়ে পড়বে, সে সম্পর্কে কোনও আগাম ধারণা ছিল না বলেও তিনি স্বীকার করেছিলেন। এই সবকিছুই হয়তো তাঁদের এই সিদ্ধান্তের কারণ হয়ে উঠেছে।
এবার কী হবে? শাস্তি!
কিন্তু এই সিদ্ধান্তের পাশাপাশি উঠেছে একাধিক প্রশ্ন। রাজপরিবার ছাড়ার পরে, হ্যারি ও মেগানের নতুন ভূমিকা কী হবে? তাঁরা কোথায় থাকবেন? তাঁদের খরচ কীভাবে চলবে? কীভাবে রোজগার করবেন তাঁরা? তাঁদের নিরাপত্তাই বা কীভাবে সুনিশ্চিত হবে?
হ্যারি ও মেগান অবশ্য এরই মধ্যে একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছেন, যেটি উত্তর আমেরিকা এবং আফ্রিকায় নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে কাজ করবে।
আজ, সোমবার তার সান্ড্রিংহ্যাম রাজপ্রাসাদে রাজপরিবারের সিনিয়র সদস্যদের ডেকেছিলেন রানি। সেখানে এই সমস্ত বিষয়ে আলোচনা করেন তিনি। হ্যারি-মেগানের সঙ্গে রাজপরিবারের সম্পর্ক এখন কী দাঁড়াবে, সেটা নিয়েই মূলত কথা হয়েছে বলে জানা গেছে। এ-ও জানা গেছে, আলোচনায় রানি জানিয়েছেন, রাজপরিবার ছাড়ার জন্য শাস্তি পেতে হবে হ্যারি-মেগানকে। এর প্রথম ধাপ হিসেবে ইতিমধ্যেই মাদাম তুঁসো জাদুঘর থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে হ্যারি ও মেগানের প্রতিমূর্তি।
'মেক্সিট'-এ অসুবিধা কী!
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম মজা করে এই ঘটনার নাম দিয়েছে ‘মেক্সিট’। অর্থাৎ মেগানের এক্সিট। মূলত মেগানের প্ররোচনাতেই হ্যারি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলেও ইঙ্গিত করা হয়েছে নানা মহলে।
তবে অনেকেই বলছেন, মেগান ও হ্যারি চাইলে অবশ্যই তাঁদের ইচ্ছেমতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আছে। নিজেদের জীবিকা খুঁজে নিয়ে স্বাধীন ভাবে বেঁচে থাকতে চাওয়া কোনও অপরাধ নয়, তা তাঁরা যে পরিবারেরই সদস্য হোন না কেন। তাছাড়া রাজপরিবার কে ছাড়ল বা কে রইল, তা নিয়ে দেশের-দশের কিছু যাবে-আসবে না বলেই মনে করছেন ব্রিটেনবাসীর একাংশ।