
শেষ আপডেট: 13 May 2022 15:29
নিজের বাড়ি ছেড়ে কে হোটেলে থাকতে যেতে চায়? কিন্তু উপায় নেই। প্রাণ বাঁচাতে একে একে বিদায় নিয়েছেন ৩০টি পরিবার। আজ সকাল থেকেই বাকি জিনিসপত্র গোছগাছের পালা চলেছে। হোটেলের ঘরে কোথায় ঠাকুর পুজো হবে, কোথায় বাচ্চাদের পড়ার জায়গা, ভেবে কুল পাচ্ছেন না মানুষগুলো। দুর্গা পিতুরি লেনের (Bowbazar) এখনও অক্ষত বাড়ির লোকজনেরা হতাশ চোখে দীর্ঘদিনের পড়শিদের চলে যাওয়া দেখছেন। একসময় যে এলাকা গমগম করত, তা এখন থমথমে। আশঙ্কা এই বুঝি আবার অন্য কোনওখানের বাড়ি বসে গিয়ে ফাটল ধরে। আবার হয়ত তাঁদেরও তল্পি-তল্পা গুটিয়ে হোটেলে আশ্রয় নিতে হয়।
পুরনো কলকাতা (kolkata) শহরের সবথেকে পুরনো বাড়ি যেসব এলাকায়, তারমধ্যে অন্যতম বউবাজার। এখানে রয়েছে বাবু বিশ্বনাথ মতিলালের মামার বাড়ি। দুর্গা পিটুরি লেনের ১/এ। বাড়ির প্রৌঢ় বাসিন্দা বললেন, 'যেখানেই মেট্রোর টানেল হয়েছে, সেখানেই পুরনো বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এটা নতুন কিছু না। আমাদের এই এলাকা শহরের মধ্যে পুরনো। অনেক ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু কালের নিয়ম। আধুনিকতার জোয়ারে আমরা ঘরছাড়া হচ্ছি। আমার বাড়ি ছেড়ে আমি যাব না। অনেকেই বোঝানোর চেষ্টা করেছে। আমি শুনব না। আমি এখানেই থাকব।'

আশঙ্কা দানা বেঁধেছে সংলগ্ন স্যাকরা পাড়া, গৌর দে লেন, নির্মলচন্দ্র স্ট্রিট, হিদারাম ব্যানার্জি লেনেও। গৌর দে লেনে আড়াইশো বছরের পুরনো বাড়িতে এখনও থাকেন প্রৌঢ় শিশির কুমার দত্ত। কলকাতার পরিচিত পরিবার। বিদেশ থেকে বেলোয়ারি কাচ আমদানির ব্যবসা ছিল তাঁদের। যেকারণে স্থানীয়দের কাছে লাল রঙের ওই বাড়ির নাম বেলুবাড়ি। বিরাট কাঠের দরজা ঠেলে ঢুকলেই চোখে পড়বে বাঁধানো বিরাট খোলা উঠোন। যাকে ঘিরে ঘর। বারান্দা। সামনেই রাধাগোবিন্দের মন্দির।

শিশিরবাবু বললেন, "করোনা, আর বউবাজারের (Bowbazar) ফাটল, এই দুইকে সঙ্গী করেই আমাদের বাঁচতে হবে। আমাদের বাড়ির নীচ দিয়ে মেট্রোর টানেল গেছে। আমাদের অনুমতি নেয়নি। এসংক্রান্ত আইনও নেই। থাকলে বারণ করতাম। আমরা পূর্বপুরুষের ভিটে ছেড়ে যেতে পারব না। মেট্রো সবাইকে জোড় করে উৎখাত করছে। এখন আমরাও ভয়ে আছি।"

মাঝবয়সি শোভা জয়সওয়াল বললেন, "প্রথমবারের বিপর্যয়ে আমাদের বাড়ি গেছে। হোটেলে উঠেছিলাম। ভাল লাগছিল না। আমাদের সোনা-রুপোর ব্যবসা। এই পাড়াতেই জীবন কেটেছে। তাই এখানেই একটা ঘর ভাড়া নিয়ে আছি।"

৫/২ পরমেশ্বর লেনের বাড়িতে নীচে স্বর্ণশিল্পীদের কারখানা। ওপরে ভাড়াটে। তিনতলায় থাকেন মালিক ব্রজগোপাল শীল। তাঁর বাড়ির বারান্দা থেকে মেট্রোর সাইট দেখা যায়। দেখা যাচ্ছে বড় ক্রেন উঠছে-নামছে। সেদিকে তাকিয়েই বললেন, "আমাদের জীবনে শান্তি নেই। রাতে ঘুমতে পারিনা। জানিনা এই আতঙ্কের শেষ কোথায়।"

বউবাজারে (Bowbazar) যেখানে মেট্রোর টানেল তৈরি হচ্ছে, তার চারশো মিটারের মধ্যেই রামকানাই অধিকারীর বাড়ি। ওই বাড়িতে একটা ঝুলন্ত আকাশপথ আছে। যেকারণে বাড়িটি পরিচিত ঝুলনবাড়ি হিসেবে। বাড়ির ছোটছেলে রাজা অধিকারী বললেন, "যেখানে জল লিক করেছে, সেখানে থাকলে আমাদের বাড়িরও সর্বনাশ হত। তবে ভবিষ্যতে কী হবে জানিনা। বউবাজারের এই পুরনো এলাকা আজ বিপদগ্রস্থ।"